বিশ্লেষণ

একটি সাজা ও বিএনপির গতি প্রকৃতি

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

আল হেলাল শুভ

১. দুর্নীতির কলঙ্ক মাথায় নিয়ে গত বৃহস্পতিবার আদালতের রায়ে জেলে যেতে হয়েছে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। তবে জেলে যাওয়ার আগে তিনি নেতাকর্মীদের দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এমন কোনো কিছু না করার আহ্বান জানিয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, খালেদা জিয়ার নির্দেশে বিএনপি ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে, যা বেশ প্রশংসার দাবি রাখে। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের যা করণীয় তিনি তাই করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন দল বিএনপিও যথেষ্ট সংযম রেখেই ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে দূরে থেকে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে যাবে বলেই তারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছে, যা বিএনপি তথা দেশের রাজনীতির জন্য যথেষ্ট ইতিবাচক বলা চলে।

জেলে যাওয়ার আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি, শনিবার ঢাকার লা মেরিডিয়ান হোটেলে দলের নির্বাহী কমিটির সঙ্গে প্রথম সভা করেন খালেদা জিয়া। সেখানে দলীয় নেতাদের উদ্দেশে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যারা বেইমানি করবে, এক পা এদিকে, আরেক পা ওদিকে রাখবেÑতাদের কোনো মূল্যায়নের জায়গা নেই। তিনি আরো বলেছেন, ক্ষমা একবার হয়, বারবার হয় না। তখন অনেকের মনেই এমন প্রশ্ন এসে থাকে, নিজ দলীয় নেতাকর্মীদেরই কেন এমন হুশিয়ারি দিচ্ছেন খালেদা জিয়া? তবে কি খালেদা জিয়ার নির্দেশে বিএনপি যে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে তার অন্যতম কারণ এই সুযোগে যেন কেউ দলে ভাঙন না ধরাতে পারে? এই প্রশ্ন ২০০৭ সালের এক-এগারো প্রেক্ষাপটের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তখনো খালেদা জিয়াকে জেলে ঢোকানো হয়। পরে বিএনপিতে সংস্কারপন্থি নামে পরিচিত এক গ্রুপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। যার ফলে ভাঙনের কবলে পড়েছিল দলটি। সেই অবস্থা আবারও হতে পারে বলে দলীয় নেত্রী হিসেবে শঙ্কা থেকেই হয়তো খালেদা জিয়া বিএনপিকে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করতে বলছেন। এক-এগারো প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়া ও তার দল যে অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন, তা থেকে শিক্ষা নিয়েই হয়তো জেলে যাওয়ার আগে দলীয় নির্বাহী কমিটির ‘বৈঠকে বেইমানি করলে ক্ষমা হবে না’Ñএটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তবে খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার আগে বেশ হুঙ্কার দিতে দেখা যায় বিএনপি নেতাদের। বিএনপি নেতারা অবশ্য বলছেন, খালেদা জিয়ার নির্দেশেই তারা ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে যাননি। কিন্তু বিএনপি এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের হুঙ্কার দিয়ে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি ছাড়া নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে সুবিধা করতে পারেনি।

২. সম্প্রতি দেশের একট জাতীয় দৈনিকের খবরের তথ্য, বিএনপি তড়িঘড়ি করে তাদের গঠনতন্ত্রের ৭ নম্বর ধারাটি বাতিল করেছে। এই ৭ নম্বর ধারায় দলের কমিটির সদস্য হওয়ার অযোগ্যতার যেসব কারণ দর্শানো হয়েছে, তার মধ্যে ‘সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ ও কুখ্যাত’ বলে পরিচিত ব্যক্তিদের বর্জন করার কথা ছিল। এই বিষয়ে বিএনপির একজন উচ্চপর্যায়ের নেতা তথ্য দিয়েছেন বলে জানানো হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধারাটি বাতিলের একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বিএনপির নির্বাচনী ট্রেনে উঠতে চাওয়ার বহিঃপ্রকাশ বলেও মনে করেন কেউ কেউ। বিএনপি যে আগামী নির্বাচনে যাবে তার অনেকগুলো ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। দল গোছাতে এমন মরিয়াভাব বিএনপির মধ্যে কিন্তু গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দেখা যায়নি। গঠনতন্ত্রের ওই ধারাটি বাতিলের বিষয়ে বিএনপি নেতারা তখন বলেছিলেন, তাদের কাছে তথ্য আছে, সংসদের আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিতে ভাঙন ধরানোর জন্য সরকারের একটি মহল থেকে চেষ্টা-তদবির চালানো হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তা নাকচ করা হয়েছে। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার আগে থেকেই বিএনপি নেতারা বলতে শুরু করেন, ‘বিএনপি ভাঙতে সরকার সক্রিয় রয়েছে। খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের পরই এই বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।’ এ নিয়ে পত্রপত্রিকাও বেশ সরব ছিল। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার আগে বিএনপি নেতারা বলতে শুরু করেন, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ভাঙতে চায়। যদি আওয়ামী লীগই বিএনপিকে ভাঙতে চায় তবে বিএনপি নেত্রী কেন নিজ দলের নেতাদের হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘বেইমানি করলে মূল্যায়নের জায়গা নেই।’ কয়েক বছর আগে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আওয়ামী লীগে পচন ধরেছে। তার এই বক্তব্যের জবাবে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেছিলেন, বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

৩. এক-এগারোর প্রেক্ষাপটে তখনকার সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুই নেত্রীকেই রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এতে তাদের দুজনের জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছিল। এবার দেখা যাক ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করে খালেদা জিয়া ও তার দল কতটুকু সফল হয়। কারণ খালেদা জিয়া তার অনুপস্থিতিতে যাকে দলের দায়িত্ব দিয়েছেন সেই তারেক রহমান বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে একই মামলায় দশ বছরের দ-প্রাপ্ত। খালেদা জিয়ার জেলকে পুঁজি করে বিএনপি তাদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে চাইবেÑএটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপি আগামীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে কতটুকু সফলতা পায়, হয়তো তার ওপর ভিত্তি করেই দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। বিএনপি গত কয়েক বছরে কর্মসূচি পালনে বাধা পেয়েছে এটা সত্যি। বাধা তো তারা ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগকেও দিয়েছিল। তাতে তো সে সময় আওয়ামী লীগের জয়প্রিয়তা কমেনি বরং আরো বেড়েছিল। সত্যি কথা বলতে, বাংলাদেশে বিরোধী দলে কীভাবে আন্দোলন করতে হয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ আওয়ামী লীগ। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকেও শিক্ষা নেয়নি। বিএনপি যদি সঠিক বিরোধী দল হিসেবে তাদের ভূমিকা রাখতে পারত তাহলে দলটির সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ আরো বাড়ত। সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা সরকারবিরোধী এত এত ইস্যু পেয়েও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে সাধারণ মানুষকে তাদের কাতারে আনতে। উপরন্তু আওয়ামী লীগ বর্তমান সরকার গঠনের পর বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে রাজনীতির মাঠে কি যেন কি খুঁজতে থাকে। যার ফল হলো তাদের গত ২০১৪ ও ১৫ সালের আন্দোলন। কিন্তু দলটি গত ২০১৪ ও ১৫ সালে যেভাবে দেশবাসীকে আন্দোলনের নামে বিপদে ফেলছিলেন তা এ দেশের মানুষ আবার দেখতে চায় না। খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার পরে বিএনপি থেকে বলা হয়েছে তার জামিনের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সত্যিই যদি জনপ্রিয় হয়ে থাকেন এই ইস্যুটিই হবে বিএনপির আগামীর রাজনীতির মূল চাবিকাঠি। কারণ পৃথিবীতে শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের কারাবরণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার জনমানুষের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, পাশের দেশ মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে একসময় সরকারের রোশানলের কবলে পড়ে জেলে যেতে হয়েছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা ও জনগণের প্রতি তাদের কমিটমেন্ট থাকায় তা তাদের আরো মহান করেছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও যদি তেমন ব্যাপক পাহাড়সম জনপ্রিয়তা থেকে থাকে তাহলে তো তার জেলে যাওয়া বিএনপির জন্য ‘সাপে বর’ও হতে পারে, যা সরকারের জন্য সত্যিই চ্যালেঞ্জের। বিএনপি দেশের একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। দলটি তার জন্মের পর থেকেই ক্ষমতায় থেকেছে। কিন্তু বিরোধী দলে এসে তারা তেমন সুবিধা করতে কখনোই পারেনি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দলটির এখনো ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে, এটা তো আওয়ামী লীগের নেতারা মুখে না হলেও অন্তরে ঠিকই স্বীকার করেন। এর আগে দেখা গেছে, বিএনপি নেতারা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের জনপ্রিয়তার উদাহরণ তুলে ধরতে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে বলেছেন। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হবে বলেও বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু দলটির নেতাদের কাছে প্রশ্নÑ তারা কেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে দলের আন্দোলন জনসাধারণের কাছে নিয়ে যেতে পারলেন না? বিএনপি যদি এতই জনপ্রিয় তবে জনগণ কেন তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অতীতে রাজপথে নামল না? কেনই বা গত নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করল না? বিএনপি এ জন্যও আওয়ামী লীগকে দায়ী করতে পারেন। কিন্তু বিএনপিদলীয় নেতাদের গা-ছাড়া ভাবের কারণেই তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে বলে খোদ দলটির তৃণমূলই মনে করে। সম্প্রতি বিএনপির এক নেতা এবার আন্দোলন ব্যর্থ হলে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের চুড়ি পরতে বলেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, বিএনপির নেতার মধ্যে কত মতের পার্থক্য। সত্যি কথা বলতে, আওয়ামী লীগের ভুল কিংবা দোষের কারণে বিএনপির ভোট বাড়তে পারে। কিন্তু তাই বলে এ দেশে বিএনপির এমন জনপ্রিয়তা নেই যাতে তারা সরকার পতন ঘটাতে পারে। অতীতে তারা আন্দোলনেও ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বিএনপির রাজনীতি সবার কাছে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার আগেই গ্রহণযোগ্য ছিল। এ নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহল বিভিন্ন সময়ে দলের নেতাদের বললেও জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া ভাঙেনি বিএনপি। জামায়াতকে নিয়েই আগামী নির্বাচনে যেতে চায় দলটি। একই সঙ্গে নির্বাচন বৈতরণী পার করার কৌশল হিসেবেই আন্দোলন ও নির্বাচন এই দুই প্রস্তুতির কথা বিভিন্ন সময়ে বলে থাকেন বিএনপির নেতারা, যা নিজেদের অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ। তবে সরকারবিরোধী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন বিএনপি কতটা করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মী

"