মাদক

বিষণ্ন সভ্যতা বিপন্ন মানবতা

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

ইয়াসমিন রিমা

‘থাকবে পাশে সুরার পাত্র/অল্প কিছু আহার মাত্র/এইখানে এই তরুর তলে, তোমায় আমায় কৌতূহলে।’-সে সুধা গাঁজা, আফিম, এলএসডি, হেরোইন, কোকেন ম্যাসকালিন যাই হোক না কেন। এ সুধাপাত্রের মাদকতায় কবি কমলকান্ত চক্রবর্তী থেকে শুরু করে কোলরিজ, বোদলেয়ার, আর্থার কোনান ডয়েল, অ্যালেন গিনস বার্গ ও মাদক সেবনে বুঁদ হয়ে উচ্ছ্বাসময় কবিতা, গান ও শিল্পচিত্রের উদ্দীপনা পেতেন। একদিন যে অপিয়েট ড্রাগের ব্যবহার ছিল নিছক জরা-ব্যাধি ও বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক যন্ত্রণা উপশম ও প্রেরণার জন্য। আজ তার নবতর সংস্করণ ব্যবহার হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী ছেলেমেয়েদের থেকে শুরু করে অন্যান্য নানা বৃত্তীয় এবং বয়সীদের ফ্যাশন সখ বা আত্মহননের উপায় হিসেবে। গত শতাব্দীতে ড্রাগ কারো মাথা ব্যথার কারণ ছিল না। বরং অভিজাত ও বিত্তবানদের বিলাসের প্রতীকী উপকরণই ছিল। শুধু তা-ই নয়, ইংল্যান্ড রাজ-পরিবারের ভরণ-পোষণ ও পুরো রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা ব্যয়ের অর্ধেক খরচ আসত ব্রিটিশদের আফিম ব্যবসার লভ্যাংশ থেকে; কিন্তু যেদিন ব্রিটেনের হেরোইন আসক্ত মাতার গর্ভ থেকে হেরোইন আসক্তির অভিশাপ নিয়ে নবজাতক জন্ম লাভ করে এবং ব্রিটেনের ‘সেক্রেটারি অব ট্রেড ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর অক্সফোর্ডপড়–য়া ছাত্রী পরীক্ষা সমাপ্তির আনন্দে আত্মহারা হয়ে হেরোইনের ককটেল পার্টিতে হেরোইন গ্রহণের ফলে মৃত্যুবরণ করে। সেদিন ড্রাগ সম্পর্কে সমগ্র পশ্চিমা দুনিয়ার মানবিক মূল্যবোধ এক ‘নাজুক ও সংকটাপন্ন’ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়। নতুন শতাব্দী প্রান্তে এসে আমরা মুখোমুখি হই গাইবান্ধা ও নরসিংদী ট্র্যাজেডির। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের বিয়োগান্ত ঘটনা একটি গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটল ফেনীতে।

ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, ইতোমধ্যে মাদকদ্রব্যের সর্বনাশা বাঁধনে জড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের ৯৬ লাখ লোক। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই কমপক্ষে ১ দশমিক ৭৫ লাখ লোক মাদকাসক্ত। বর্তমানে আর দশটা জাতীয় সমস্যাকে টেক্কা মারতে চাইছে-নিষিদ্ধ নেশা। মাদকদ্রব্যের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ও বে-আইনি ব্যবসা আজ একটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পর্যবসিত। এ-প্রবণতা বহু দেশের অর্থনীতি ভাঙন সৃষ্টি করেছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ধ্বংস করছে। পৃথিবীর সর্বত্রই তরুণদের কাছে মাদকাশক্তি একই ধরনের আনন্দদায়ক ও উত্তেজনাকর ব্যাপার। বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন থিয়েটার অ্যান্ড আটস ফর লেস ফরচুনেটের (টালফ) উদ্যোগে নিয়মিত মাদকসেবীদের ওপর তিন মাসব্যাপী চট্টগ্রামের মাদক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে এক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছাত্র, ড্রাইভার বেকারসহ ১০টি পেশার ৪১২ মাদকসেবী জরিপে মতামত দেন করেন। এত ১৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী মাদকসেবীরা টালফের ১২টি প্রশ্নের ওপর মতামত দেন। জরিপে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ‘১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী মাদকসেবীর সংখ্যা ৩৪.৯৬ ভাগ। মাদকসেবীদের মধ্যে শতকরা ১১.৬৫ ভাগ অশিক্ষিত। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া জানে ১৫.২৯ ভাগ মাদকসেবী। এ ছাড়া অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শতকরা ১০ দশমিক ৯২ ভাগ এসএসসি পাস ২২.৮২ ভাগ, এইচএসসি পাস ১৯.৬৬ ভাগ এবং ডিগ্রি থেকে ওপরে ১৯.৬৬ ভাগ মাদকসেবী। যাদের মধ্যে ৫৪.৮৫ ভাগ অবিবাহিত এবং ৪৪.৬৬ ভাগ বিবাহিত।

জরিপে অংশগ্রহণকারী মাদকসেবীদের মধ্যে শতকরা ৭২.০৯ ভাগ মাদকসেবী ১১ থেকে ২০ বছর বয়সে মাদকাসক্ত হন। যার মধ্যে শতকরা ১৫.২৯ ভাগ মাদকাসক্ত হন ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সে এবং ১৬ থকে ২০ বছর বয়সে ৫৬.৮০ ভাগ। জরিপে অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে জানা যায়, শতকরা ২৬.৪৬ ভাগ মাদকসেবী ৫ বছর পর্যন্ত মাদক সেবন করেছেন এবং ৬ থেকে ১০ বছর ৩৭.১৪ ভাগ ও ১১ থেকে ১৫ বছর যাবৎ মাদক সেবন করেছেন ২২.৩৩ ভাগ। প্রাপ্ত তথ্য মতে, শতকরা ৭৬.৯৪ ভাগ মাদকসেবী মাদকাসক্ত হয়েছেন বন্ধুর প্রভাব এবং মাদকের প্রতি কৌতূহলের কারণে। প্রতিকূল পারিবারিক পরিবেশ ও পারিবারিক বিশৃঙ্খলার কারণে ১৪.৫৬ ভাগ এবং বেকারত্ব হতাশা ও আর্থিক অনটনের কারণে শতকরা ৬.৫৫ ভাগ মাদকসেবী মাদকাসক্ত হয়েছেন। মাদকসেবীদের মধ্যে শতকরা ৬৭.৪১ ভাগ হেরোইন সেবন করেন এবং ১১.৪১ ভাগ মাদকসেবী নিয়মিত ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, অনেক হেরোইনসেবী হেরোইনের চেয়েও স্বল্পমূল্যের কারণে মাঝেমধ্যে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে থাকেন। সবচেয়ে আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, ইনজেকশনের সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদকসেবীর মধ্যে শতকরা ২২.৮২ ভাগ মাদকসেবী একই সিরিঞ্জে কয়েকজন মিলে মাদক গ্রহণ করেন এবং জরিপে অংশগ্রহনকারী সব মাদকসেবীর মধ্যে শতকরা ৩২.০৪ ভাগ মাদকসেবীই জানেন না যে, একই সিরিঞ্জে একাধিক ব্যক্তি মাদক গ্রহণ করায় এইচআইভি/এইডস বা বিভিন্ন ধরনের যৌনরোগে আক্রান্ত হতে পারেন। সিরিঞ্জে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা যে হারে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে তাতে করে চট্টগ্রাম শহরকে এইচআইভি/এইডস হেপাটাইটিস বি এবং সিসহ বিভিন্ন ধরনেরর যৌনরোগের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কেননা মাদকসেবীদের মধ্যে শতকরা ৭৩.০৬ ভাগ মাদকসেবী যৌনকর্মীর সঙ্গে যৌনমিলনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধকর্মে জড়িত। মাদক সেবনে ব্যয় নির্বাহের জন্য শতকরা ৫৭.৫২ ভাগ মাদকসেবী নিজস্ব পেশার আয়ের ওপর নির্ভরশীল এবং শতকরা ২৭.১৮ ভাগ পরিবার থেকে ও শতকরা ১৫.৩০ ভাগ প্রতারণা চাঁদাবাজি ছিনতাইয়ের মাধ্যমে ব্যয় নির্বাহ করে থাকেন। প্রাপ্ত তথ্য মতে, মাদকের পেছনে মাথাপিছু দৈনিক গড় ব্যয়ের পরিমাণ ২১০ টাকা হিসাবে ৪১২ জনের প্রতিদিনের মাদক সেবনে ব্যয়ের পরিমাণ ৮৬ হাজার ৫২০ টাকা মাসে ২৫ লাখ ৯৫ হাজার ৬০০ টাকা এবং বছরে ৩ কোটি ১১ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা।

জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তৈরি ৩৩২ পৃষ্ঠার দীর্ঘ এক গবেষণা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, একমাত্র এশিয়া মহাদেশই ৬ লাখ ৯১ হাজার একর জমিতে নিয়মিতভাবে ৩০০ টন হেরোইন উৎপাদন করা হয়। ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশে হেরোইন এবং উত্তর আমেরিকায় কোকেন অধিক ব্যবহৃত নেশাজাত দ্রব্য। বেশ কয়েকটি দেশ বর্তমানে তাদের জাতীয় বাজটের শতকরা পাঁচ থেকে দশ ভাগ অর্থাৎ সমপরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকে এ অবৈধ ড্রাগ ব্যবসায় বিভিন্ন চ্যানেলে রেভিনিউ হিসেবে। বর্তমানে যুগে বিভিন্ন নেশাজাত দ্রব্যের অবৈধ কোটি কোটি ডলার সহজেই উপার্জন হওয়ার কারণে অনেক সরকারি-বেসরকারি এবং প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ পরোক্ষভাবে এ ড্রাগ ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েছে। গত ২৫ জুন জাতিসংঘ সদর দফতর থেকে ‘ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট’ শিরোনামে প্রদত্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বের কমপক্ষে ১৩ মিলিয়ন লোক বর্তমানে নিয়মিতভাবে কোকেন নেশাজাত দ্রব্য, ৩০ মিলিয়ন অ্যাসফোটামাইন এবং প্রায় ৮ মিলিয়ন হেরোইন গ্রহণ করে থাকে। এ রিপোর্ট আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান বিশ্বে অবৈধ ড্রাগ অর্থাৎ বিভিন্ন নেশাজাত দ্রব্যের ব্যবসায় প্রতি বছর লেনদেন হয়ে থাকে কমপক্ষে ৪০ হাজার কোটি ডলার। বিশ্বের মোট ব্যবসা-বাণিজ্যের শতকরা ৮ শতাংশ বর্তমানে ড্রাগ ব্যবসায় জড়িত, যা বিশ্বের মোট টেক্সটাইল ব্যবসার সমপরিমাণ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"