ধর্ম

বাবা-মা আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠ নিয়ামত

প্রকাশ | ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

এস আর শানু খান

নবযুগের নবীন প্রভাবে একদিকে যেমন চারদিকে নানা উন্নতির জয়ধ্বনি বিকশিত হচ্ছে। মানুষের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা যত না সম্প্রসারিত হচ্ছে; ঠিক একইভাবে ততটাই মানুষ আত্মকেন্দ্রিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও স্ত্রী-সন্তানকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনায় আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই মানুষগুলো যে যত বেশি নিজেকে উন্নতির সোপানে পৌঁছাতে পারছে সে ঠিক তত বেশিই নিজের শিকড়কে, নিজের অস্তিত্বকে ভুলছে। যার বাস্তব প্রমাণ আমাদের আজকের সমাজের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সীমাহীন অবহেলার প্রতিচ্ছবি। শুধু আমাদের দেশ কিংবা পাশের দেশেই এটা সীমাবদ্ধ নয়। পুরো বিশ্বেই আজ বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা বোঝা হয়ে পড়েছে। নিদারুণ সব অবহেলা, লাঞ্ছনা, গঞ্জনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বাবা-মাদের। অথচ এই পৃথিবীতে একটা মানুষের অস্তিত্বের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার পরপরই তার বাবা-মায়ের কাছে সে ঋণী। যে ঋণ কখনো কোনো দিন শোধ হওয়ার নয়। মহান সৃষ্টিকর্তা কোরআন ও হাদিসে বারবার তার ইবাদতের পরই বাবা-মায়ের খেদমতের কথা বলেছেন এবং বাবা-মায়ের খেদমত করাকে ফরজে আইন ইবাদত বলে ঘোষণা করেছেন।

আমরা যদি একটু গভীরভাবে ভাবি তাহলে দেখব একটা শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তার থেকে এই পৃথিবীতে অসহায় কেউ থাকে না। কেননা তখন সে অনেক ছোট থাকে, হাঁটতে পারে না, চলতে পারে না, কথা বলতে পারে না। সেই সময় তার পাশে বাবা-মাই ঢাল হয়ে এসে দাঁড়ায়। কোলে নিয়ে তিল তিল করে নিজেদের রক্ত পানি করে নিজেদের পেটে ক্ষুধা পুষে রেখে সন্তানের ক্ষুধা মেটান। একদম নিঃস্বার্থভাবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ সব চাহিদা মেটান। মানুষের মতো মানুষ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের এক সফল তরুণ সোলাইমানের একটা ভিডিওতে তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে প্রতিটির সম্পর্কই ট্যানজেকশনাল।’ কথাটার তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। কেননা মানুষ তখনই কিছু করে বা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, যখন সেটা থেকে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু পৃথিবীতে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা একদম তার ভিন্ন। কেননা একটা সন্তানকে বাবা-মা কখনো পুঁজি হিসেবে চিহ্নিত করেন।

ইতিহাস সাক্ষী। আমরা এমনও অনেক বাবা-মায়ের গল্প জানি যিনি ভিক্ষাবৃত্তি করে তার সন্তানদের মানুষ করেছেন। পড়াশোনা শিখিয়েছেন। চাকরি ধরিয়ে দিয়েছেন। জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। অবশেষে তারাই বৃদ্ধ বয়সে সেই সন্তানদের কাছে চরম অভক্তি ও অবহেলা, যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সেই বৃৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঠাঁয় মেলেনি তার সন্তানের কাছে। রক্ত পানি করে বড় করে তোলা সেই সন্তানের কাছের থেকে ছিটকে পড়তে হয় বাবা-মাকে। চরম পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অবশেষে বৃদ্ধ বাবা-মাকে যখন বৃদ্ধাশ্রম কিংবা রাস্তায় ঠেলে দেওয়া হয়, তখনো সেই বাবা-মা তার অবাধ্য সন্তানের জন্য অভিশাপ বা বদদোয়া করেন। দোয়া করেন সন্তানের জন্য। সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। এটা থেকে আমার মনে হয় বাবা-মা কখনোই সন্তানের কাছে প্রতি প্রাপ্তির আশা করেন। তাহলে কত না মহিমা নিয়ে আল্লাহ সুবানহুতায়ালা এই বাবা-মাকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু সন্তান হিসেবে সন্তানের কিছু দায়িত্ব রয়েছে যেগুলোকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। রাসুল (সা.) বলেছেন, কঠিনতম কবিরা গোনাহ, শিরক করা, এরপর বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া। এটা থেকেই বোঝা যায় বাবা-মায়ের প্রতি একটা সন্তানের দায়িত্ব কতটুকু। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার উল্টো। পবিত্র কোরআনপাকে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। বাবা-মা কিংবা তাদের একজন যদি তোমাদের জীবদ্দশায় বার্ধ্যকে উপনীত হয় তাহলে তাদের প্রতি সামান্য বিরক্তিও প্রকাশ করবে না। তাদের কোনো আচরণে উফ বলেও শব্দ করবে না। তাদের ধমক দেবে না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক ও বিনম্র ভাষায় কথা বলবে।’

প্রতিটি মানুষের জীবনই একটা নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। মানুষ যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে অনেক ছোট থাকে। আস্তে আস্তে একটু একটু করে বেড়ে ওঠে। আর তার ভেতরে শিশুসুলভ নানা আচার-আচরণ ও কথাবার্তা লক্ষ করা যায়। তারপর কিছু সময় পেরিয়ে সে কৈশোরে প্রবেশ করে। তারপরে যৌবনে, তারপরে প্রাপ্তবয়স্ক ও একটা নির্দিষ্ট ছকের পরে বৃদ্ধ হতে শুরু করেন। এই বৃদ্ধ বয়সটা আবার ঠিক শিশুকালের মতোই। কেননা মানুষ যখন একদম প্রাপ্ত বয়স্ক থেকে ক্রমে বৃদ্ধ বয়সে প্রবেশ করেন, ঠিক তখনই ক্রমে ক্রমে তার ভেতরে শিশুসুলভ নানা আচরণ লক্ষ করা যায়। যে সময়টাতে তাদের অনেক যতœ ও খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ হয়। শিশুরা যেমন মানুষের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করে। একাকিত্ব জীবন পছন্দ করে না, ঠিক বৃদ্ধরাও সেটাই বোধ করেন। যে বয়সে ঠিক শিশুদের মতোই অসহায়ত্ব বোধ করেন। যে সময়টাতে তাদের একটু কথাবার্তা বলার মতো সঙ্গী-সাথি দরকার, সেই সময় যদি তাকে সবার থেকে ছিটকে পড়তে হয়, তাহলে তাদের মনের অবস্থাটা কেমন হতে পারে। তাই তাদের নিরাশার আঁধারের ভেতরে ঠেলে না দিয়ে কাছে টেনে নিলে তাদের কত না তৃপ্তি লাগে।

শুধু ইসলাম ধর্মেই নয়, সব ধর্মেই বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া ও খেদমতের কথা বলা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে যেমন মহানবী (সা.) বলেছেন-বাবা-মায়ের সন্তুষ্টির ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি নির্ভর করে। আবার বাবা-মায়ের অসন্তুষ্টির ওপর আল্লাহ্র অসন্তুষ্টি নির্ভর করে।’

হিন্দু ধর্মের বিখ্যাত পন্ডিত স্বামী বিবেকান্দ বলেছেন-মনে রাখবে, বাবা-মা হচ্ছের স্রষ্টার প্রতিরূপ। তাই যেকোনো উপায়ে মা-বাবাকে খুশি রাখবে। মা-বাব খুশি হলে স্রষ্টাও তোমার ওপর খুশি হবেন।’

খ্রিস্টান ধর্মে বলা হয়েছে-বাচ্চারা মা-বাবার কথা শোনো। তাদের সম্মান করো। তাইলেই তোমাদের ভালো হবে। আর অনেক দিন বাঁচবে।’

আমাদের প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। অর্থাৎ যারা মায়ের সেবা করবে তারা বেহেশতে যাবে।’

হিন্দু ধর্ম গ্রন্থে বলা হয়েছে-‘পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম’। অর্থাৎ বাবার সেবা করলে অনেক পূর্ণ হবে, আর স্বর্গে যাওয়া যাবে।

তাই শেষ বয়সে কোনো বাবা-মায়ের ঠিকানা যেন বৃদ্ধাশ্রম কিংবা রাস্তায় না হয়। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, দিন বদলাচ্ছে। একসময় হয়তো আমরাও বাবা-মা হবো। আমি এখন যে সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে অসদাচরণ করছি, সেই সময়ের সন্তানরা হয়তো তার থেকে অনেক আগেভাগেই আমাদের সঙ্গে অসদাচরণ ও নানা রকম অবাধ্যতা করবে। কেননা পরের জন্য পুকুর কাটলে সেই পুুকুরে নিজে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই আসুন আমরা সবাই বাবা-মায়ের খেদমত করি। বৃদ্ধ বয়সে তাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করি যেটা তারা আমাদের ছোটবেলায়, শৈশবে আমাদের সঙ্গে করেছেন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"