বৃক্ষ

অক্সিজেন ফ্যাক্টরি

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

মোস্তফা কামাল গাজী

বৃক্ষ আমাদের পরম উপকারী বন্ধু। যুগের পর যুগ নিঃস্বার্থভাবে বৃক্ষ আমাদের উপকার করে যায়। বিজ্ঞান বলে, বৃক্ষ আমাদের অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। বিষাক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে পরিবেশকে রাখে প্রাণবন্ত। এ ছাড়া প্রচ- রোদ্দুরে বৃক্ষ আমাদের শীতল ছায়া দেয়, জমির উর্বরতা বাড়ায়, বন্যায় জমির ক্ষয়রোধ করে, ঝড়ঝাপটা থেকে রক্ষা করে, ফল দেয়, ফুলের সুবাস ছড়ায়, পশুপাখিদের আবাস ও আহার দেয়, অভাব-অনটনে অর্থের জোগান দেয়, অসুখ-বিসুখে ওষুধ ও পথ্য দেয়, আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখে। বৃক্ষ আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারণ, গৃহস্থালি, আসবাবপত্র, যানবাহন, শিল্প-কারখানা, কৃষি যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক শোভাবর্ধন ইত্যাদির জোগান দিয়ে অনেক উপকার করে। বৃক্ষ থেকেই তৈরি হয় লঞ্চ-স্টিমার-ট্রাকের প্রয়োজনীয় কাঠামো। কাগজ, রেয়ন, দিয়াশলাই, প্যাকিংবক্স ইত্যাদি শিল্পের কাঁচামালের জোগান আসে পরমবন্ধু বৃক্ষের কাছ থেকে। এ ছাড়া বৃক্ষ আমাদের বিভিন্ন আর্থিক জোগান দিয়ে থাকে। ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি বৃক্ষ মানবসমাজকে কতটা আর্থিক সুবিধা দিয়ে তার একটা হিসাব তুলে ধরেনÑ‘বায়ুদূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে ১০ লাখ টাকার, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয় পাঁচ লাখ টাকার, বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে বাঁচায় পাঁচ লাখ টাকা, মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরাশক্তি বাড়িয়ে বাঁচায় পাঁচ লাখ টাকা, বৃক্ষে বসবাসকারী প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচায় পাঁচ লাখ টাকা, আসবাবপত্র, জ্বালানি কাঠসহ ফল সরবরাহ করে পাঁচ লাখ টাকার এবং বিভিন্ন জীবজন্তুর খাদ্য জোগান দিয়ে বাঁচায় আরো ৪০ হাজার টাকা।’ কিন্তু এত উপকারের পরও অর্থলিপ্সায় পড়ে আমরা উজাড় করে ফেলি হাজার হাজার বৃক্ষ। নিষ্প্রাণ কংক্রিটের প্রাসাদ গড়তে হত্যা করে ফেলি প্রাণবন্ত বৃক্ষকে। রাজনৈতিক ক্ষোভ নিবারণ করি বৃক্ষনিধন করে। রাস্তা ও গৃহনির্মাণেও প্রতিনিয়ত করাত চালানো হচ্ছে বৃক্ষের শেকড়ে। এ কারণে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃক্ষের হ্রাস ঘটছে। প্রকৃতির ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য কোনো দেশের মোট ভূমির ৩৩ শতাংশ বনভূমি থাকা উচিত। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৯৪৭ সালে দেশের আয়তনের ২৪ শতাংশ বনভূমি ছিল। ১৯৮০-৮১ সালে তা কমে হয় ১৭.২২ শতাংশ এবং বর্তমানে মাত্র ১৭.৫ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। বৃক্ষরাজির এমন নিধনের ফলে প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বাড়ছে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যেমন : বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস।

একটি কিংবা দুটি নয়; যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ঐতিহাসিক যশোর রোডের শতবর্ষী প্রায় আড়াই হাজার গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বৃক্ষ অপসারণবিষয়ক কমিটি। এও কি সম্ভব? আসলে উন্নতির ধূম্র্রজাল অন্ধ করে দিয়েছে আমাদের চোখকে। আমরা ভুলে গেছি কালী পোদ্দারের শ্রম আর কষ্টের কথা। যে মানুষটি ১৮৪২ সালে মাকে সোজা পথ দিয়ে গঙ্গাস্নানে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ৫৮ হাজার কড়ি ব্যয়ে যশোর শহরের বকচর থেকে ভারতের নদীয়ার গঙ্গাঘাট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করেছিলেন। আর ৮০ কিলোমিটার জুড়ে মাকে ছায়া দেওয়ার আশায় লাগিয়েছিলেন দ্রুতবর্ধনশীল বৃক্ষ রেইনট্রি। বৃক্ষগুলো তো কেবল তার মাকেই নয়; বরং সে রাস্তা ধরে যাতায়াতকারী প্রত্যেককেই দিয়েছে শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাস। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃক্ষগুলোর ছায়া ধরেই ভারতে পাড়ি দিয়েছিলেন হাজার হাজার শরণার্থী। সুতরাং একদিক দিয়ে বৃক্ষগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহ্য বহন করে। তাহলে বৃক্ষগুলোর প্রতি কেন এই চরম শত্রুতা? কালী পোদ্দার আজ বেঁচে নেই। বেঁচে নেই তার মাও। এত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা বৃক্ষগুলোকেও হয়তো তারা বাঁচতে দেবে না। গাছগুলো বাঁচিয়ে রেখে অন্যভাবেও রাস্তা সম্প্রসারণ করা যায়। সেটা হয়তো মাথামোটা ইঞ্জিনিয়াররা বুঝতে চাইবে না। নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া যথার্থই বলেছেন, ‘যিনি গাছ বাঁচিয়ে রাস্তা বানানোর রাস্তা খুঁজে পান না, তিনি আবার কেমন ইঞ্জিনিয়ার?’

দিন দিন আমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। মানবতার জায়গাটা দখল করে নিচ্ছে বর্বরতা। মানুষ হয়েও আমাদের মধ্যে পশুর স্বভাব বিরাজমান। সে মানবতার জায়গাটা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের। প্রবল শক্তি নিয়ে জাগতে হবে। সোচ্চার হতে হবে। যুগ যুগ ধরে যে বৃক্ষগুলো আমাদের উপকারী বন্ধু হয়ে আগলে রেখেছে, আজ সময় এসেছে তাদের আগলে রাখার। কোনো কুঠার নয়, কোনো করাত নয়, মানুষ হয়ে উপকারীর উপকারিতা স্বীকার করে বৃক্ষগুলোকে বাঁচাতে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

"