ধর্ম

চরিত্র গঠনে মায়ের ভূমিকা

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

জাহাঙ্গীর আলম জাবির

শিশুর চরিত্র গঠনে মায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পারিবারিক জীবনে বাবা-মায়ের দায়িত্ব দ্বৈত হলেও মায়ের ভূমিকা বিশেষভাবে স্বীকৃত। মানবজীবনে পরিপূর্ণতা দানের উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ আদি মানব হজরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করে উভয়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছেন। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। শান্তিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই হলো পারিবারিক জীবনের উদ্দেশ্য। একটি সুখী, সমৃদ্ধিশালী আদর্শ পরিবার গড়ে তুলতে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার পরিজনদের সেই (দোজখের) আগুন থেকে রক্ষা কর’ (আল কোরআন)। এ সম্পর্কে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘সাবধান! তোমাদের অধীনদের রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্ব তোমাদের ওপর এবং তাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত দায়িত্বকে তুমি যেভাবে ব্যবহার করেছ সে সম্পর্কে তোমাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।’ এ দায়িত্ব পালনের যে নীতিমালা তা হলো ইসলামী বিধান মতে।

ইসলামী সমাজব্যবস্থায় পারিবারিক দায়দায়িত্ব বাবা-মা উভয়েরই। তবে সন্তান লালনপালন ও শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে মায়ের প্রভাব ও ভূমিকা বেশি। কেননা, বাবা বা অন্য কারো পক্ষে এসব দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। কারণ, মাকে একাধারে গর্ভধারণী, স্তন্যদায়িনী, সেবিকা, ধাত্রী, শিক্ষায়িত্রী এবং অভিভাবিকা প্রভৃতির ন্যায় বহুমুখী ভূমিকা পালন করতে হয়। শিশুর দৈহিক গঠনের সঙ্গে সঙ্গে তার চরিত্র গঠনও নির্ভর করে একজন মায়ের সঠিক কর্তব্য পালনের ওপর। মাকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয় যেন, তার অসতর্কতা কিংবা শৈথিল্যের কারণে তার সন্তান বা পরিবারের কেউ বিপদগামী হতে না পারে। পারিবারিক দায়িত্ব পালনে ইসলামে মায়ের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দান করেছে। মায়ের এ দায়িত্বকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। (১) গর্ভধারিণী অবস্থা, (২) শৈশব অবস্থা ও (৩) যৌবন অবস্থা।

এক. দীর্ঘ ১০ মাস একজন মাকে অপরিসীম ধৈর্য ও কষ্টের মধ্যে কালাতিপাত করতে হয়। সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে মাকে শারীরিক ও মানসিক অসুবিধাকে তুচ্ছ মনে করে তার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। গর্ভস্থ সন্তানের নিরাপত্তার জন্য সর্বক্ষণ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সে সময়ে মাকে উন্নত চরিত্রের অধিকারিণীও হতে হয়। অর্থাৎ মায়ের দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক পরিচ্ছন্নতার দিকেও দৃষ্টি রাখতে হয়। কেননা, এ সময় সতর্কতা না থাকলে সন্তানের দৈহিক বিকৃতি, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। গর্ভাবস্থায় একজন মাকে সদাপ্রফুল্ল ও সৎচিন্তামগ্ন অবস্থায় সাংসারিক কর্মকা-ের মধ্যে লিপ্ত থাকতে হয় এবং দুশ্চিন্তা, বিমর্ষতা বা কুচিন্তা মনের ওপর না আসে। বরং এ সময়ে অলি-আউলিয়াদের জীবনী, চরিত্র গঠনমূলক ধর্মীয় বই-পুস্তক এবং কোরআন-হাদিস শরিফ পাঠ করা আবশ্যক। কারণ, সন্তানের ওপর মায়ের প্রভাব অনস্বীকার্য। বাস্তব জীবনে অসংখ্য দৃষ্টান্ত দিতে পারি। প্রাসঙ্গিকভাবে হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর কথা বলা যায়। হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) যখন মাতৃগর্ভে ছিলেন তখন তাঁর মা নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াতসহ ইসলামের বিধিবিধান মতে ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে মশগুল থাকতেন। ফলে আমরা হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আঠারো পারা কোরআনে হাফেজ হয়ে জন্ম নেওয়ার কথা শোনা যায়। পক্ষান্তরে, বিমর্ষ, কর্কশ, কুচিন্তামগ্ন দেহ থেকে জন্মপ্রাপ্ত সন্তান হয় ওই ছাঁচেরই অর্থাৎ বিবেক বুদ্ধিহীন, চরিত্রহীন, বাবা-মায়ের অবাধ্য। বখাটে, স্বার্থপর ও পশুসুলভ স্বভাবের।

দুই. সন্তান জন্মের সংকটময় সময় থেকে সন্তানের স্তন্যপান কাল পর্যন্ত সময়টা একজন মায়ের জন্য এক বিশেষ অধ্যায়। এ সময় একজন মাকে শিশুর খাওয়া-দাওয়া, সেবা-শুশ্রুষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুবিধা-অসুবিধা ইত্যদির প্রতি সদা সতর্ক থাকতে হয়। এ সময় মাকে নিজের সুখ-শান্তি, আহার, নিদ্রা ইত্যাদি বিসর্জন দিয়ে সন্তানের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হয়। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজনÑঅজ্ঞতার কারণে আমাদের সমাজের মায়েরা ‘শালদুধ’ (ঘন ও হলুদ রঙের দুধ) শিশুর জন্য ক্ষতিকর মনে করেন, যা কিনা শিশুর দৈহিক গঠন, শক্তিবৃদ্ধি ও রোগ প্রতিষেধকের জন্য অপরিহার্য। সাধারণ দুধ অপেক্ষা ‘শালদুধ’ রোগ প্রতিরোধক উপাদান অনেক বেশি থাকে। ‘শালদুধ’ হচ্ছে শিশুর প্রথম টিকা। মায়ের দুধে বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখের হাত থেকে শিশু রক্ষা পায়, ফলে সে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। এ ছাড়া মায়ের বুকের শিশু ও মায়ের মধ্যে ভালোবাসার সেতুবন্ধ সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে বোতলের দুধ খেলে শিশু মায়ের স্পর্শ পায় না। শিশু ও মায়ের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হয় ও স্নেহ ভালোবাসা থেকে কিছুটা হলেও বঞ্চিত হয়। আর এ ধরনের শিশুরা পরে প্রায় দেখা যায় নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর হয়। শিশুকে বুকের দুধপানের বিষয়ে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন, ‘মায়েরা তাদের সন্তানকে পূর্ণ দুবছর দুধপান করাবে’ (সুরা-বাকারা ২৩৩)।

প্রকৃতিগতভাবে মায়ের দুধে যে রোগ প্রতিরোধক উপাদান বিদ্যমান এবং শিশুদের প্রধান খাদ্য তা বর্তমান বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক যুগে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে প্রমাণিত। মায়ের স্তনে প্রকৃতিগতভাবে যে দুধ প্রস্তুত হয় তা মহান আল্লাহপাকেরই দান, যা দ্বারা শিশুর দৈহিক গঠনের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক ও চারিত্রিক গঠনও গড়ে ওঠে। কাজেই একজন মাকে গর্ভাবস্থায় হালাল-হারামের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। যেন শিশুর দৈহিক মানসিক ও চারিত্রিক গঠনে হারাম খাদ্যের কোনোরূপ প্রভাব পড়তে না পারে। সন্তানের বয়স যখন দুবছর পূর্ণ হবে তখন থেকেই সন্তানকে নির্মল চরিত্রে গড়ে তোলার সময়। এ সময় শিশু মায়ের একান্ত সান্নিধ্যে থাকে। শিশুমুখের প্রথম বুলি, ভাবের আদান-প্রদান, মান-অভিমান এবং মায়ের সবকিছু অনুকরণ করে থাকে। মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো মানুষ অনুকরণপ্রিয়, আর এ ক্ষেত্রে বড়দের চেয়ে শিশুরা অগ্রগামী অর্থাৎ শিশুরা অতি সহজেই যেকোনো কিছু অনুকরণ করে থাকে। মজার ব্যাপার, শিশুরা কিন্তু এ সময় অপরের সংস্রবে যেতে দ্বিধাবোধ করে। কাজেই এ সময় একজন মা যত সহজে তার শিশুকে শিক্ষাদান করতে পারে অন্য কেউ তা পারে না।

গৃহ হচ্ছে একটা পরিবারের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর মা হলো সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষায়িত্রী। কাজেই পরিবারের সংশ্লিষ্ট সব সদস্যের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তার কাছ থেকেই। পুঁথিগত বিদ্যাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে থেকে তারা গ্রহণ করে গুরুজনদের মেনে চলার শিক্ষা, আনুগত্য আইনশৃঙ্খলা ও শিষ্টাচারিতার শিক্ষা। বিশেষ করে এ সময়ে মায়ের স্নেহ, ভালোবাসায় লালিতপালিত শিশুরা আদব-কায়দা, দয়ামায়া, শ্রদ্ধাবোধ, নিয়ম-শৃঙ্খলা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি গুণের অনুশীলন করে থাকে, যা সামাজিক মূল্যবোধের মৌলিক উপাদান। এ ক্ষেত্রে একজন মা-ই পারেন তার গুণে-গুণান্বিত করে নিজ সন্তানকে সত্যিকারের মানুষরূপে গড়ে তুলতে। আদর্শ পরিবারের শিশুরা বাবা-মায়ের ভদ্র, অমায়িক ও ধার্মিক আচরণ অনুসরণ করে হয় সত্যিকারের মানুষ আর বিকৃত পরিবারের শিশুরা অকাজ-কুকাজ অনুসরণ করে হয় লম্পট ও সন্ত্রাসী।

তিন. এ সময়টা সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনের উত্থান ও পতনের অধ্যায়। কেননা, এ সময় সে এমন এক মেরুতে অবস্থান করে সেখান থেকে পদস্খলন হলে তার অপমৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। কাজেই মাকে এ সময় খুব সজাগ দৃষ্টি রেখেই সন্তানদের পরিচালনা করতে হয়। এ সময়টা আসলে খুব মারাত্মক। হঠাৎ করে সন্তানের দৈহিক পরিবর্তন। বেড়ে ওঠা ও স্বর পরিবর্তন। এ সময় তার মধ্যে মুরব্বিয়ানার স্বভাব সৃষ্টি হয়। তখন সে ছোট-বড়, বাছ-বিচার না করে সবখানেই নিজের কর্তৃত্বটাকে বজায় রাখার প্রয়াস পায়। আর তাই, না পারে সে বড়দের সঙ্গে খাপ খেয়ে চলতে, না পারে ছোটদের পরিবেশে মিশতে। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির কারণে এ সময় একজনের জীবনে সবচেয়ে ক্ষতিকর যে দিকটার পূর্বাভাস সূচিত হয় তা হলো, মনের মধ্যে জৈবিক কামনা-বাসনার একটা প্রবণতা জাগ্রত হয়। সংগত কারণে কৈশর-যৌবনের এ সন্ধিক্ষণে চারিত্রিক অধঃপতন ঘটার সমূহ-সম্ভাবনা থাকে। তাই একজন আদর্শ মাকে এ সময় সন্তান পরিচালনায় দায়িত্ব শক্তভাবে ধারণ করে চলতে হয়। আর এটাই হলো একজন আদর্শ মায়ের সফলতা। ইসলামী জীবনাদর্শের আলোকে একজন আদর্শ মা-ই পারেন তার সন্তানকে নির্মল চরিত্রের অধিকারী করে গড়ে তুলতে। এ ক্ষেত্রে আমরা মহান আল্লাহতায়ালার বাণী স্মরণ করতে পারি। সুরা লোকমানে সন্তানদের যে আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে তার একটা রূপ রেখা দিয়েছেন। তা হলো, ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের আল্লাহ সম্পর্কে, শিরক-বিদআত সম্পর্কে ধারণা দান, বিনয়ী, নম্র, ভদ্র হতে শেখানো, দান-খয়রাতে উদ্বুদ্ধ করা, ভালো কাজে আদেশ ও খারাপ কাজে বাধাদানে উদ্বুদ্ধ করা। এ বিষয়গুলো অনুধাবন করে চলা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারণ, আজকের শিশুরাই আগামী দিনে দেশ ও জাতির ভবিষৎ।

লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক

jahangirjabir5@gmail. com

"