মতামত

শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের অবদান

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

শরীফুর রহমান আদিল

বই পুস্তকে কতগুলো মুখস্থ বাক্য দিয়ে শুরু করি; যেগুলো বাস্তবে নেই তা হলোÑ শিক্ষাই জাতির মেরুদ-, যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত! যদিও এসব বাক্য অন্যান্য দেশে বাস্তবায়িত হলেও বাংলাদেশে এসব কেবল বই-পুস্তকে মানায়। বাস্তবে একেবারে বেমানান! শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানে একটি সেøাগান প্রচলিত রয়েছে আর সেটি হলোÑ ‘শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ।’ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে শিক্ষকদের রাস্তায় নামতে হবে কেন? শিক্ষা দিতে গিয়ে অভুক্ত থেকে শিক্ষকের মৃত্যু হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী, আপনি তো ভিশন ২০২১ ঘোষণা করেছেনÑযার মূল লক্ষ্য হলো দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা। ভিশন পূরণে আর মাত্র তিন বছর বাকি। এর মধ্যে চাকরিপ্রাপ্ত শিক্ষকরাই ন্যূনতম বেতনই পাচ্ছেন না, মধ্যম আয় হবে কীভাবে? মধ্যম আয়ের দেশের প্রায় আটানব্বই শতাংশ শিক্ষক কি বিনা বেতনে চাকরি করবে? প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধু মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে যদি প্রাথমিক শিক্ষার জাতীয়করণ করতে পারেন, তবে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট দিয়েও কেন শিক্ষার জাতীয়করণ সম্ভব হচ্ছে না? অনেক হেভিওয়েট নেতাই ৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে বেশ ধস্তাধস্তি করছেন; কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানে শিক্ষাকে যে অগ্রাধিকার দিয়েছিল এবং শিক্ষাকে জাতীয়করণ করার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু করেছিলেন সেটি বাস্তবায়নে নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ থাকছে না কেন? ২০০৮ সালে চার্টার অব চেঞ্জ বা দিনবদলের সনদ নিয়ে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখালেও সবচেয়ে বড় পেশাজীবী মানুষ গড়ার কারিগররা কেন অভুক্ত? কেন তাদের দাবি আদায়ে শহীদ মিনারে গিয়ে পুলিশের বুটের আঘাত আর পিপার স্প্রে সহ্য করতে হবে? যে শিক্ষকের ছাত্ররা দালানকোঠা করে উঁচুস্তরের মানুষ পরিগণিত হয়, সেই শিক্ষক কেন অভুক্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবেন?

সত্যিই খুব অবাক লাগে এসব বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা মন্ত্রী হয়, আমলা হয়, হয় ডিসি, এসপি, ইউএনও, যাদের বেতন এই শিক্ষকদের থেকে অনেক বেশি; কিন্তু শিক্ষকরা দেশের সিনিয়র চাকরিজীবী হয়েও তার বেতন আর বৃদ্ধি পায় না! তারা তাদের যে ছাত্রকে ২০ বছর পড়িয়ে বড় করেছে তাদের আর তারা যখন চাকরিতে যোগদান করে ২০ বছর পরও তাদের প্রারম্ভিক বেতন থেকেও কম বেতন থাকে এইসব এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতন! এখানে নেই কোনো পদোন্নতির ব্যবস্থা, নেই বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, কিংবা বৈশাখী ভাতা, নেই বাড়ি ভাতা, নেই চিকিৎসা ভাতা, আছে কেবল সিকিভাগ উৎসব ভাতা! সরকার প্রতি বছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ফলাফল প্রকাশিত হলে পাসের হার বৃদ্ধিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে কিন্তু প্রশ্ন হলো এই পাস কিংবা এই উচ্ছ্বাসের কারিগরদের বিনিময়ে কী দিয়েছেন? যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত কিংবা এমপিওভুক্ত না সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি শতভাগ পাস করে কিংবা ৫০ শতাংশ এ+ পায় তবে সেই কৃতিত্ব শিক্ষামন্ত্রী কিংবা সরকার কেন নেবে? শতভাগ প্রতিষ্ঠানের পাসের পেছনে সরকারের অবদান কতটুকু? পাসের হার বৃদ্ধির যে উচ্ছ্বাস সরকার নিচ্ছে তার পেছনে সরকারের যৌক্তিকতা কোথায়? সরকার কি নিজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দিয়েছে, নাকি সরকার শিক্ষকদের বেতন ভাতা দিয়েছে? যেসব প্রতিষ্ঠানের এমপিও নেই সেসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাসের শতকরা হিসাব ও জিপিএ হিসাব ভালো, সেখান থেকে প্রতি বছর উপহার হিসেবে কয়েকটাকে প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দিয়ে দিতে কিংবা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভালো ফলাফল উপহার দেওয়ায় উপহারস্বরূপ ৫০ শতাংশ উৎসব বোনাস ঘোষণা করতে পারত না সরকার? মনে রাখতে হবে, গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয় একেবারে দুর্বল, অসচেতন ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা এসব দুর্বল শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে পাস করাচ্ছেন এইসব এমপিও বা নন- এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। তবু কেন তাদের কর্মের কোনো বেতন কিংবা ভাতা নেই? শিক্ষকরা কি শ্রমঘণ্টা হিসাব করে তার মূল্যও পাবেন না? মর্যাদার কথা বাদই দিলাম, শ্রমিক হিসেব কাজ করলে যে টাকা পাওয়া যেত তাও কি দেবে না সরকার? আর যদি সরকার এই শিক্ষকদের শ্রমিকের মূল্য হিসেব করেও বেতন না দিতে পারবে, তবে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি কিংবা বিষয়গুলোর স্বীকৃতি দিল?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার কী হাল তা সাম্প্রতিক আন্দোলন দেখলেই বোঝা যায়, শিক্ষকদের একটি অংশ নন-এমপিওভুক্ত তারা তাদের প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন করল! শিক্ষকদের আরেক অংশ যাদের এমপিও আছে, তারা জাতীয়কারণ চায়, আবার স্বতন্ত্র রেজিস্টার্ড ইবতেদায়ি শিক্ষকরা আমরণ অনশন করলেন তাদের চাকরি জাতীয়করণ করার জন্য। তাদের দাবি, ২৬ হাজার প্রাথমিক রেজিস্টার্ড স্কুল জাতীয়করণ হলে একই মানের রেজিস্টার্ড ইবতেদায়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন জাতীয়করণ হবে না? শিক্ষকদের আরেক অংশ যারা অনার্স-মাস্টার্সে পাঠদান করাচ্ছেন তারা চাচ্ছেন তাদের এমপিওভুক্ত করানো হোক। আর সবশেষ সরকার আত্তীকরণকৃত শিক্ষকরা ক্যাডার না নন-ক্যাডার হবে তা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছেন! এ যদি একটি দেশের শিক্ষা কিংবা শিক্ষকদের কাঠামো হয় তবে বুঝতে বাকি থাকে না সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কী হাল কিংবা সে দেশের সরকার তাদের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে কতটা আন্তরিক। উন্নয়নের রোল মডেল হয়েও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এ হাল কেন? কেন এ পেশাজীবীদের প্রতি সরকারের এমন উদাসীনতা? এ খাতকে সরকার যে অবহেলা করছে তা বোঝা যায় গত কয়েক বছরের বাজেটের দিকে তাকালে গত কয়েক বছরের বাজেটে শিক্ষায় টাকার অঙ্ক বাড়লেও শতকরা হিসাবে এ বাজেট কমছে ১-৩ শতাংশ। অন্যদিকে শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তিকে যোগ করে অধিকাংশ অর্থপ্রযুক্তি খাতে ব্যয় হচ্ছে!

এক পরিসংখ্যান মতে, দেশের ৯৭.৫৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই হলো বেসরকারি আর বাকি ২.৪৬ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি। এই যদি পরিসংখ্যান হয় তবে দেশে সরকারের শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান কতটুকু? প্রতি বছর ১৮-২০ লাখ শিক্ষার্থী যেকোনো স্তরের পড়াশোনা করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে; কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের কিংবা ১৭ কোটি মানুষের জন্য সরকার কতটা স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে? দেশ জাতি উন্নয়নের প্রথম শর্ত শিক্ষিত জাতি তৈরি করা। সেই শিক্ষিত জাতি তৈরি করতে সরকার কতটুকু ব্যয় নির্বাহ করে? কেবল কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেছে বেছে কিছু অর্থ সহায়তা দিলেই কি সরকারের অবদান আছে তা স্বীকার করা যায়? অন্যদিকে আবার বলা যায়, যে পরিমাণ অর্থ শিক্ষা সহায়তা হিসেবে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বলে দেওয়া হয় তার সমষ্টি মোট শিক্ষার্থীর ২.৫০ শতাংশের ওপরে নয়! সরকার বিভিন্ন সময় দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জন ৭ কখনো ৭.৫ হয়েছে বলে প্রচার করে, কিন্তু বলতে পারবেন শিক্ষার ক্ষেত্রে কি প্রবৃদ্ধি হয়েছে? কেবল স্থানীয় কিছু শিক্ষানুরাগী কিংবা দানশীল ব্যক্তিদের দ্বারা গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানকে কিছু অনুদান দিয়ে উন্নয়ন করা কিংবা বিদেশি অনুদানে শিক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্প আর প্রশিক্ষণ ছাড়া সরকার বলার মতো কী করেছে এ খাতে? সবার জন্য বিনামূল্যে বই দিয়ে শিক্ষা সংকট দূর করা যাবে না। শিক্ষা সংকট দূর করতে হলে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া বিরত থাকতে হবে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান অপ্রয়োজনীয় সেগুলোকে কাছাকাছি অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে পুরো শিক্ষাকে জাতীয়করণ করলে এ ধরনের অভিযোগ আর সংকট আর থাকবে না।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক

adil_jnu@yahoo.com

 

"