মতামত

জালনোট এবং আমরা

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

জালনোট দেশের অর্থনীতির জন্য বিসংবাদ ডেকে আনছে। জালনোটের কারণে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক ভারত সফরকালে বিপাকে পড়ছে। ভারত সফরকালে সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতীয় রুপি কিনে সে রুপি ব্যবহার করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে আইনি ঝামেলায়। দেশের অর্থনীতির জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পরও জালনোট চক্রের সদস্যদের সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। গ্রেফতারের পরও তারা কীভাবে পার পায় তাও একটি বড় মাপের প্রশ্ন। আইনের ফাঁক দিয়ে এ অপরাধের সঙ্গে যুক্তরা বারবার গ্রেফতারের পরও বেরিয়ে আসছে। আবার তারা যুক্ত হচ্ছে জালনোটের ব্যবসায়। তাদেরই একজন লিয়াকত আলী। তিনি তার ঘরে বসিয়েছিলেন ভারতীয় জাল রুপি তৈরির টাকশাল। প্রতি মাসে ৫০-৬০ লাখ রুপি তৈরি করে তা বাজারে ছেড়ে মাসিক আয় হতো দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এভাবেই রুপি তৈরি করে আসছিলেন এই জালিয়াত। জাল রুপি তৈরি করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হন তিনি।

সর্বশেষ বুধবার রাতে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা উত্তরপাড়ার একটি বাড়ি থেকে লিয়াকতকে গ্রেফতার করেন র‌্যাব সদস্যরা। এ সময় তার কাছ থেকে ভারতীয় ১০ লাখ জালনোটসহ রুপি তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। জালনোট তৈরিকারী চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়। কিন্তু মামলার দুর্বলতায় জালিয়াতরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। পুলিশ এ ব্যাপারে যাদের সাক্ষী করে প্রায়ই তাদের খোঁজ পাওয়া যায় না। ফলে মামলার নিষ্পত্তি অসম্ভব হয়ে পড়ে। জালনোট ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে কারণে তাদের জামিন দেওয়ার জন্য আইনি তৎপরতা চালাতে আইনজীবীদের কেউ কেউ মুখিয়ে থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে তারা জামিন পায় আইনের ফাঁক গলিয়ে। স্মর্তব্য, জালনোট ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মৃত্যুদ-ের বিধান ছিল। ১৯৮৭ সালে তা রহিত করে যাবজ্জীবন কারাদ- করা হয়। মৃত্যুদ-ের পুনঃপ্রবর্তন না হোক, এ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের জামিন অযোগ্য করে যাবজ্জীবন কারাদ-, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও আর্থিক জরিমানা-সংবলিত নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সরকার বিষয়টি ভেবে দেখলেই ভালো করবে।

প্রতারকচক্র যে শুধু বাংলাদেশের টাকা জাল করে ক্ষান্ত হচ্ছে তা নয়, ভারতীয় রুপি, ডলার, ইউরোসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও জাল করা হচ্ছে। এর সঙ্গে মাফিয়া গ্রুপসহ আন্তর্জাতিক অনেক চক্রের জড়িয়ে থাকারও তথ্য আছে। দেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার বাস্তবতাও একই ধরনের ইঙ্গিত দেয়।

মাঝেমধ্যে দু-একজনের ধরা পড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে জাল টাকা শনাক্তকারী যন্ত্র বিতরণের উদ্যোগÑএসবই সাময়িক সমাধান। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, ধরা পড়া ব্যক্তিদের জামিনে বেরিয়ে এসে ফের অপরাধে যুক্ত হওয়া বন্ধ করা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পথেঘাটে নতুন নোট বিক্রি বন্ধের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। ধরা পড়া প্রতারকদের অনেকে আইনি দুর্বলতা কিংবা অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পার পেয়ে যায়। মামলা হলেও সাক্ষীর অভাবে সাজা হয় না কিংবা বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী সারা দেশে জালনোট বিষয়ে ছয় হাজার মামলা ফাইলবন্দি থাকার কথা জানা যায়। আইনি এ দুর্বলতা কাটাতে হবে। আমরা আশা করব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে চক্রটি সমূলে বিনাশ করবে, নিশ্চয়তা দেবে সাধারণ মানুষের কেনাকাটার নিরাপত্তার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জালনোট প্রতিরোধ সেলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারের জন্য ঝুলে আছে ৬ হাজার ৩৭০ মামলা। এ সময়ে বিচারাধীন মামলার আসামিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। জামিনে খালাস পাওয়া আসামিরাই আবার জালনোট ছড়াচ্ছেন। ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর হাটে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকার লেনদেন হয় বলে এটিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে জালনোট ছড়াতে তৎপর থাকেন অপরাধীরা। অভিযোগ আছে, অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের বুথেও পাওয়া যায় জাল টাকা।

জাল টাকা সমাজের একটি ব্যাধির মতো। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হয়, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, জনগণ মিলে জাল টাকা প্রতিরোধে সচেতন ও সচেষ্ট না হলে এ প্রবাহ রোধ করা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই। চক্রের হোতারা যেন কোনোভাবেই পার না পায়, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিভিন্ন দেশ জালনোট প্রতিরোধে প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না জালনোট প্রতিরোধ করা না গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি, যা কখনোই কোনো সুনাগরিকের কাম্য হতে পারে না।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

"