বিশ্লেষণ

ই-সেবা ও দিনবদলের প্রযুক্তি

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

কুমিল্লা সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর এলাকার স্বল্পশিক্ষিত বিধবা পঞ্চান্ন বছর বয়সের রেহেনা বেগম তার স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া ফসলি জমি পরের কাছে বর্গা দিয়ে আসছিলেন দশ বছর ধরে; কিন্তু বেশ কিছু দিন আগে তারই জমির পাশের জমির মালিক হাকিম আলী তার জমির খানিকটা অংশ দখল করতে তৎপর হলে রেহেনা বেগম সালিসির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে চাইলেন। অথচ তার সে চাওয়া সফলতার মুখ দেখেনি। তাই তিনি উকিলের শরণাপন্ন হলেন। উকিল প্রথমে তার জমির দলিলের নকল ও দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ইত্যাদি চাইলে, রেহেনা বেগম কিছুই দিতে পারেননি। পরে গ্রামের মেম্বার নেসারত মিয়া তাকে ই-সেবাকেন্দ্রের খোঁজ দিলেন। রেহেনা বেগম ই-সেবাকেন্দ্রে যোগাযোগ করে মাত্র পাঁচটি কর্মদিবসেই উকিলের চাওয়া সব কাগজপত্র সংগ্রহ করে ফেলেন। বর্তমানে জমিটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিয়ে মামলা করতে এখন তার আর কোনো বেগ পেতে হবে না বলে তিনি প্রশান্তির শ্বাস নিচ্ছেন। রেহেনা বেগম সরকারের এই ধরনের সেবাকে

সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ‘জনগণের সেবায় সরকারের এই ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা মানুষের অনেক আগে থেকেই দরকার ছিল।’

অন্যদিকে ২নং দুর্গাপুর ইউনিয়নের শাসনগাছা এলাকাবাসী লুৎফর রহমান তার বসতবাড়ি-সংলগ্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্দেশিত ড্রেনটি তারই প্রতিবেশী জনৈক সোবহান শিকদার ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করার উদ্যোগ নিলে তিনি বাধা দেন। কিন্তু সোবহান শিকদার সেই বাধা তোয়াক্কা না করে বাড়ি নির্মাণ করতে সচেষ্ট থাকলে লুৎফর রহমান জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ই-সেবাকেন্দ্রে এসে ই-সেবার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের বরাবর ড্রেনটি অক্ষুণœ রাখার জন্য আবেদন করলে সেই আবেদন মঞ্জুর হয়। এ প্রসঙ্গে লুৎফর রহমান বলেন, ‘কত সহজে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন হয়েছে, অথচ একটা সময় গেছে জেলা প্রশাসকের দ্বারে ধর্না দিতে দিতে বছর পার হয়ে যেত।’

‘জনগণ সেবার পেছনে ছুটবে না, সেবাই পৌঁছে যাবে জনগণের দোরগোড়ায়’ এই সেøাগানকে উপজীব্য করে শুরু হয় দেশের মানুষকে প্রযুক্তির ব্যবহার ও সেবার আওতায় নিয়ে আসার নানা উদ্যোগ। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রদত্ত সেবাসমূহকে জনগণের দোরগোড়ায় সহজতর উপায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশের সব জেলায় চালু করা হয়েছে জেলা ই-সেবাকেন্দ্র। ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ৬৪ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ‘জেলা ই-সেবাকেন্দ্র’ উদ্বোধন করেন। জেলা ই- সেবাকেন্দ্র থেকে দেশের জনগণ স্বল্প খরচে, স্বল্প সময়ে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া সেবা পেয়ে থাকেন। এই প্রসঙ্গে এসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগামের পরিচালক নজরুল ইসলাম খান, ‘জেলা প্রশাসন প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণকে সেবা দিয়ে আসছে। জনসাধারণের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ সরাসরি সচিবালয় থেকে সরকারের সেবা গ্রহণ করে থাকেন, কিন্তু সাধারণের একটি বৃহৎ অংশ প্রতিদিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সেবা গ্রহণ করেন। বিগত দিনগুলোয় সনাতন পদ্ধতিতে অফিস ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হওয়ার কারণে জনগণকে দ্রুতগতিতে কাক্সিক্ষত সেবা দেওয়া সম্ভব হতো না। দলিল-দস্তাবেজের রেকর্ডরুম থেকে নকলসহ যেকোনো সেবা নেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দিনের পর দিন ধর্না দিয়ে তারিখের পর তারিখে

ঘুরতে হতো যাতে করে ভুক্তভোগী ব্যক্তিটির সময় এবং অর্থ দুটিরই অপচয় ছিল নিশ্চিত। ই-সেবাকেন্দ্র চালু হওয়ার ফলে বর্তমানে কোনো নাগরিক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে না এসেও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অথবা ডাকযোগে কাক্সিক্ষত সেবা নিতে পারছেন।’

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল প্রতিটি জেলায় একটি করে সার্ভার, ৩১ মডেম ল্যান, ১০টি করে কম্পিউটার, ৫টি করে ল্যাপটপ ও একজন করে সহকারী প্রোগ্রামার দিয়ে জেলা ই-সেবাকেন্দ্র বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশ টেলিকমিইনকেশন্স লিমিটেড প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১ মেগাবাইট পার সেকেন্ড গতির ইন্টারনেট সংযোগ দেয়। জেলা ই-সেবাকেন্দ্র চালু হওয়ার ফলে মানুষের তথ্য জানার অধিকারটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। একজন আবেদনকারী মুঠোফোনের এসএমএস (শর্ট মেসেজ সার্ভিস) অথবা অনলাইনে তার সেবার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারছেন। যেকোনো সেবার জন্য আবেদন করলে আবেদনকারী গ্রহণ নম্বরসহ একটি রসিদ দেওয়া হয়। এই রসিদে সেবা দেওয়ার সম্ভাব্য তারিখ উল্লেখ থাকে। নির্দিষ্ট দিনের আগেই যদি সেবাটি প্রস্তুত হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে ফোনের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়। যার প্রতিশ্রুতিতে সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। আগে একটি দলিলের নকল পেতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় ব্যয় হতো। বর্তমানে সাত থেকে দশ দিনে সেই নকল পাওয়া যাচ্ছে।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এ ব্যাপারে অভিমত প্রকাশ করে বলেন, ‘ই-সেবাকেন্দ্র চালু হওয়ার ফলে সেবা প্রদানকারী সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতা উন্নতি হয়েছে। সেবা প্রদানে এক রকম সুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসক তার ল্যাপটপের সামনে বসেই ড্যাশবোর্ড থেকে সব কর্মকর্তার কর্মতৎপরতা ও কর্মদক্ষতা অবলোকন করতে পারছেন। অথবা কার কার কাছে কী পরিমাণ ফাইল পেইন্ডিং রয়েছে তিনি ল্যাপটপে একটিমাত্র ক্লিকেই লক্ষ করতে পারছেন। একইভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় খুব সহজেই ঢাকায় বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রোজ দিনের কাজের অগ্রগতি দেখছে। এ ধরনের একটি পরিবীক্ষণ পদ্ধতি এ নিয়মটিকে সঠিকভাবে চলতে সহায়কের ভূমিকা রাখছে।’

ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন রূপকল্প নয়। এটি এখন সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের জীবনধারা বদলানোর জন্য একটা স্থান করে নিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ তথ্যসেবায় বিপ্লব ঘটে গেছে এই উদ্যোগের ফলে সরকারের আন্তুরিকতা মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তা ছাড়া বিগত শতকের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ অনলাইনের ইন্টারনেটের যুগে পা রাখে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এর সূচনা হলেও আওয়ামী লীগ সরকার একে সুসংহত করে এবং অনলাইন ইন্টারনেটের যুগে বসবাস করা শুরু হয়। এ ছাড়া ১৯৯৭ সালে মুঠোফোন প্রযুক্তিকে উন্মুক্ত এবং ১৯৯৮ সালে কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়। গত ১১ নভেম্বর ২০১১ সালে দেশব্যাপী চার হাজার ৫০১টি ইউনিয়ন পরিষদে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অন্যতম মাধ্যম ‘ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র’ (ইউআইএসসি) চালু হয়। এসব তথ্য-সেবাকেন্দ্রে অত্যন্ত কম খরচে স্বল্পসময়ে সব ধরনের সরকারি ফরম আহরণ পূরণ করার সুবিধা, গ্রেজেট নোটিস, জন্ম-মৃত্যু-নিন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনসহ নানা তথ্য ও প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ভূমি অফিসের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজ, ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় বিভিন্ন প্রাইমারি এবং হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ছবি তোলা, বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো ভিসা কপি আহরণ, জীবনবীমা সুবিধা, ভিজিএফ-ভিজিডির তালিকা, কৃষি, শিক্ষা, আইন, মানবাধিকার, মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ই-মেইল সুবিধা, কম্পিউটার কম্পোজ ও প্রিন্ট, ফটোকপি, মুঠোফোন ব্যবহার, কার্ডবিক্রয় ও রিচার্জ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায় ইংরেজি শিক্ষাসেবা পাওয়া যায়, যা কিছুদিন আগেও এ দেশের মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"