রোহিঙ্গা

জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

মো. আকবর হোসেন

বাংলাদেশের মোট আয়তনের শতকরা ১৭ ভাগই ছিল বনাঞ্চল। প্রতিনিয়ত বন কেটে ধ্বংস করার ফলে এখন আর আমরা সেই অবস্থানে নেই। এতে করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এমনিতেই বনাঞ্চল ধ্বংস করে প্রতিনিয়ত গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বসতবাড়ি। তার ওপর মিয়ানমার থেকে আগতদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে রোহিঙ্গা শিবির। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড় কেটে বন ধ্বংস করে একের পর এক রোহিঙ্গা শিবির গড়ে তোলা হচ্ছে। যে এলাকায় রোহিঙ্গা শিবিরগুলো গড়ে উঠেছে, সেখানে ছিল বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বসতি। পুরো এলাকা ছিল জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবিরগুলো ওই এলাকার জীববৈচিত্র্যকে ঠেলে দিচ্ছে মারাত্মক হুমকির দিকে। বন বিভাগ থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও রোহিঙ্গা শিবির স্থাপনের কারণে বন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কথা বিভিন্ন সময় জানিয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিলের (ইউএনডিপি) রোহিঙ্গা শিবির স্থাপন নিয়ে ‘দ্রুত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে’ বলেছেÑরোহিঙ্গা শিবিরগুলো দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউএনডিপির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের শিবিরগুলো প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন তিনটি এলাকার প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছে। এগুলো হচ্ছেÑটেকনাফ উপদ্বীপের উপকূল এলাকা, সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও সোনাদিয়া দ্বীপ। এ ছাড়া রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর নিকটবর্তী রয়েছে দুটি সংরক্ষিত এলাকাÑটেকনাফের অভয়ারণ্য ও হিমছড়ির ন্যাশনাল পার্ক। এ ছাড়াও সম্প্রতি প্রস্তাবিত ইনানি ন্যাশনালও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানা যায়। এই বিষয়গুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

জাতিসংঘের ওই সংস্থাটি বন, ভূমি, পানি, প্রাণবৈচিত্র্য, পরিবেশ, প্রজাতি, মানুষের স্বাস্থ্য, জলবায়ুর পরিবর্তনÑ এসব বিষয়ে ২৮টি উচ্চমাত্রার ঝুঁকি চিহ্নিত করে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ৫৪টি সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারকে পর্যাপ্ত সম্পদের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শেষ হওয়ার পর দ্রুত ধ্বংস হওয়া পরিবেশ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়। তবে আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা শিবির স্থাপনের কারণে বন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দায় শুধু বাংলাদেশের একার নয়। পুরো বিশ্বকেই ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে শামিল হয়ে কাজ করতে হবে। অন্যথায় এই বিপর্যয়ের মুখ থেকে দেশের জীববৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে আনা কিছুতেই সম্ভব হবে না। এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, রোহিঙ্গা বসতি গড়ে ওঠার বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সেখানে প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসভূমি চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। বন ও জীববৈচিত্র্য কখনোই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সেই সঙ্গে ভূমির ক্ষতিও দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। এ পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশের নয়, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো পুরো বিশ্বের বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও একটা মারাত্মক হুমকি হিসেবে দাঁড়াবে। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া উচিত। রোহিঙ্গারা সরে গেলে ওইসব অঞ্চলে বনায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ও তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি প্রস্তাব পাস করেছে। তবে যথারীতি চীন, রাশিয়াসহ সমমনা কয়েকটি দেশ এ প্রস্তাবের বিপক্ষেই ভোট দিয়েছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এভাবে একটি পক্ষ বারবার বিরোধিতা করে আসছে। আর এটাও স্পষ্ট, এসব প্রতিবন্ধকতার কারণেই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এসব ব্যাপারে বলিষ্ঠ কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। চীন, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ মিয়ানমারের মিত্র শক্তিগুলোকে এটা অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে, আয়তনগত দিক থেকে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র দেশ। একটি ক্ষুদ্র দেশ ও জনবহুল রাষ্ট্রের পক্ষে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে শরণার্থী হিসেবে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বরং এর ফলে বন, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনই যেসব মারাত্মক ঝুঁকি পরিলক্ষিত হচ্ছে। রোহিঙ্গা বসতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সে ক্ষতির ঝুঁকি স্বভাবতই আরো প্রকট আকারে বৃদ্ধি পাবে। আর এতে যে শুধু বাংলাদেশেরই ক্ষতি হবে তা নয়, ক্ষতি হবে পুরো বিশ্বেরই। রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় সারা বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এর বিকল্প আর অন্য কোনো পথ আছে বলে মনে হয় না। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ মোটেই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মহল দেখেশুনে ধীরগতিতে ঠা-া মাথায় পা বাড়াচ্ছে। তারা জীববৈচিত্র্য নয় তাদের রাজনৈতিক স্বার্থটাই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আনান কমিশনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা যেসব সুপারিশ দিয়েছে তা বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে মিয়ানমারকে সম্মত করাতে হবে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের আরো জোরালো ভূমিকা আমরা প্রত্যাশা করি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"