বিশ্লেষণ

রংপুর সিটি নির্বাচন ও একটি প্রশ্ন

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

রেজাউল করিম খান

২০১৭ সালের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন উল্লেখযোগ্য একটি। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুকে ৯৮ হাজার ৮৯ ভোটে পরাজিত করেছেন। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সরকার পরিষদের কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর এটিই সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজয়। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর সংগত কারণেই রংপুর নির্বাচন সর্বমহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচন পরিচালনা, ভোটের প্রচারণা, খবর সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের জন্য যারা রাজধানী থেকে রংপুর গিয়েছিলেন, ঢাকায় ফিরে তারা নানা মতামত প্রকাশ করেছেন। আওয়ামী লীগও বিপুল ভোটে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করছে। ওইসব মতামতের সার-সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায়Ñ(ক) এলাকাটিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এখনো জনপ্রিয়তা আছে, (খ) শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু দলছুট হয়ে আওয়ামী লীগে এসেছেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় আছেন। এখন দলের অন্যরা সুযোগ চান। ফলে স্থানীয় নেতৃত্বে বিরোধ দেখা দেয়। নির্বাচনের পূর্বে বিরোধ নিষ্পত্তি ও সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। রংপুর সিটিতে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হলেও বর্ধিত নতুন এলাকার অবস্থা এখনো বেহাল হয়ে আছে। (গ) দীর্ঘদিন পর মানুষ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। (ঘ) নানা কারণে মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তা কমেছে। (ঙ) নির্বাচন কমিশন সফল হয়েছে।

লোকতন্ত্রে বিশ্বাসীরা মনে করেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও তৎপরবর্তীকালের প্রায় সব কয়টি স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। বিএনপি নেতাকর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলা অথবা মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করা হয়। নির্বাচনী প্রচারেও বাধা সৃষ্টি করা হয়। মানুষ ভয় পেতে থাকে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজনই হয় না। এইসব কারণে নির্বাচনগুলো প্রহসনে পরিণত হয়।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রংপুর সিটি নির্বাচন এযাবৎকালের অন্যতম সেরা নির্বাচন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যেসব পূর্বশর্ত থাকে, তার সব কয়টিই রংপুর সিটি নির্বাচনে বিদ্যমান ছিল। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সফল। ওই নির্বাচনের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) সফল ব্যবহার। ভোট গ্রহণের মাত্র ১৩ মিনিটের মধ্যে ঐ কেন্দ্রের ফলাফল পাওয়া গেছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী নির্বাচনটি ছিল সবার অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ।

রংপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে বিস্মিত হলেও কেউ কেউ একে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পূর্বেই জাতীয় পার্টির সঙ্গে তাদের সমঝোতা হয়েগিয়েছিল। জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘোষণায় সেই ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, তার প্রার্থী এক লাখ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন। অন্যদিকে ফলাফল ঘোষণার পর পরাজিত প্রার্থী শরফুদ্দিন ঝন্টু তার বাসভবনে এমনই সন্দেহ প্রকাশ করেন। পাঁচ বছর পূর্বে ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু ১ লাখ ৬ হাজার ২২৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম জাপা থেকে বহিষ্কৃত মোস্তাফিজার রহমান পান ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট। বিএনপি প্রার্থী কাউছার জামান বাবলা পেয়েছিলেন ২১ হাজার ২৩৫ ভোট। এবার মোস্তাফিজার রহমানের এত বেশি ভোট পাওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি প্রার্থীকে ঠেকানোই ছিল আওয়ামী সমর্থকদের লক্ষ্য। ভয় ছিল কোনোভাবে না আবার বাবলা জিতে যায়। ফলে বিএনপিবিরোধীরা লাঙ্গল মার্কায় ভোট দিতে কার্পণ্য করেননি। তার পরও ধানের শীষ মার্কায় গতবারের চেয়ে ১৩ হাজার ৯০১ ভোট বেশি পড়েছে। বিষয়টি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। নির্বাচনের পর গণভবনে অনুষ্ঠিত দলের সভাপতিম-লীর সভায় সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করে এর কারণ জানতে চান। এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে দায়িত্ব দেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। পরাজিত হয়ে বাবলা যা-ই বলুন না কেন, নির্বাচনে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। ছিল সাংগঠনিক দুর্বলতা। অনেকে আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, তাদের প্রার্থী পরাজিত হবে। সেই কারণে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ২০ দলীয় জোটের কোনো তৎপরতা ছিল না। শেষ মুহূর্তে অনেকে লাঙ্গলে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরে ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই বিএনপি প্রার্থী কাউছার জামান বাবলা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন। এরপর সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করে বলেন, এর জন্য আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি দায়ী।

কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থাটিকে এতটাই ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল করে গিয়েছিল যে তাকে শক্ত পায়ে দাঁড় করানোর কাজটি বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করা। বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের প্রণীত বিধিবিধান মেনেই রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ছোটখাটো দু-একটি ত্রুটিবিচ্যুতি ছাড়া ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাইে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী আচরণবিধি সব দলের জন্য সমান সুযোগ দিতে পারে না। প্রার্থী নির্বাচনে কত টাকা ব্যয় করবেন, তার একটি পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তার সমর্থকরা কত টাকা ব্যয় করবেন, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে অবাধে কালোটাকা ব্যবহার হয়। ভোটের বাজারে গরিব ভালো মানুষ প্রার্থীর কোনো মূল্য নেই।

রংপুর সিটি নির্বাচনে সিপিবি-বাসদ ও বাম মোর্চা সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে পর্যাপ্ত টাকা খরচ করার সামর্থ্য তার ছিল না। প্রচার-প্রচারণা ছিল দায়সারা গোছের। তার প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ উল্লেখ না করাই ভালো। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তিনি ওই নির্বাচনে প্রার্থী হলেন? বলা হয়ে থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ। পার্টির নাম প্রচার ও ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বেগবান করাও অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রচলিতবিধিতে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদের বৈধতা দেওয়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। বরং বামদের হাস্যকর উপস্থাপন জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নির্বাচনে কালোটাকার ব্যবহার বন্ধ, রাষ্ট্রক্ষমতার অবৈধ হস্তক্ষেপ রোধ, প্রচারে সমতা আনা প্রভৃতি বিষয়ে বামদের প্রস্তাবনা থাকলেও নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। করতেও পারবে না। সে ক্ষেত্রে নিজেদের জোটবদ্ধ ও সংগঠিত হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।

স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে সরকারের তেমন কিছু আসে যায় না। তবে ভোটারদের মনোভাব বোঝা যায়। সাধারণত, যে দল ক্ষমতায় থাকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেই দলের না হলে উন্নয়ন কর্মকা- বাধাগ্রস্ত হয়। এই সত্যটি ভোটাররা বুঝতে পেরেছেন। ফলে সরকারি দলের প্রার্থীর পাল্লা কিছুটা ভারীই থাকে। তার পরও যদি সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থী বিপুল ভোটে পরাজিত হন তো ওই দলের নেতাকর্মীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়তেই পারে। লাঙ্গল মার্কা জিতেছে, সেটি বড় প্রশ্ন নয়, চিন্তা হচ্ছে ধানের শীষ কেন অত ভোট পেল ?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"