সময়ের অর্থকথা

খাদ্য সংকট ও আমাদের বিজ্ঞান

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

হোসাইন মুবারক

দেশের খাদ্য সংকট নিরসনে উদ্ভাবনী কার্যক্রম চলছে। কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্যবিমোচনসহ গবেষণা ও সম্প্রসারণকর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়Ñএমন বিষয়গুলোর সহায়ক হিসেবে বিএআরআইয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে। কয়েক দিন আগে গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএআরআই) বারির প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে এ-সংক্রান্ত দুই দিনের কর্মশালা শেষ হলো। কর্মশালায় জানানো হয়, এ পর্যন্ত কৃষি গবেষণার এই প্রতিষ্ঠানটি ২০৮টি ফসলের ৫১২টি উচ্চ ফলনশীল জাত (হাইব্রিড), রোগ প্রতিরোধে সক্ষম ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী জাত, ৪৮২টি অন্যান্য প্রযুক্তিসহ এ যাবৎ ৯০০টির বেশি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি হচ্ছে এবং বিএআরআই গবেষণা কার্যক্রমের পাশাপাশি উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও তথ্য হস্তান্তর কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। দুই দিনের কর্মশালায় মূলত উদ্ভাবিত ফসলের উন্নতজাত, ফসল ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি, পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি, ফার্ম মেশিনারি ও শস্য সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিÑ এই চারটি ক্যাটাগরির অধিবেশন ছিল। সাম্প্র্রতিক সময়ে যেসব প্রযুক্তি উদ্বোধন করা হয়েছে সেগুলো দ্রুত কৃষকপর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, এনজিওকর্মী, বেসরকারি বীজ কোম্পানি ও কৃষকদের প্রশিক্ষিত করে তোলাই ছিল কর্মশালার প্রধান উদ্দেশ্য।

কর্মশালাটি নানা কারণে এ দেশের গণমানুষের কাছে গুরুপূর্ণ। এ দেশ কৃষিপ্রধান, ফল-ফসলের দেশ। শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। সেটাও চাষিদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল ধানের আরেক রূপান্তর; কৃষকের শ্রমের আধার কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদিত নানা ফসলের মধ্যে নানা মৌসুমের ধানের সঙ্গে আছে গম, নানা ধরনের ডাল, মসলাজাতীয় শস্য, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল। আর এসব কৃষিপণ্য শুধু নিজেরাই ব্যবহার করি না, কিছু কৃষিপণ্য বিদেশেও রফতানি হয়। বিদেশে এ দেশের প্রবাসী নাগরিকরা এসব পণ্যের প্রধান ভোক্তা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে জালের মতো ছেয়ে আছে নদী-নালা, খাল-বিল। নদীর আবহে এ দেশের কম-বেশি সব এলাকায় সবুজের সমারোহ। গাছপালা থেকে শুরু করে বিস্তৃত ফসলের মাঠ। সবখানে যেন সবজি আর সবুজ। এ কারণে এ দেশকে বলা হয় সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা। নাতিশীতোষ্ণ এ দেশের আবহাওয়া তাই পৃথিবীর অনেক এলাকার মানুষের পছন্দনীয়। আবহাওয়াগত কারণে আমাদের দেশে গণমানুষের বসতি এত ঘন যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে আনুপাতিক হার অনেক বেশি। প্রতি বর্গমাইলে আমাদের যে লোকসংখ্যা তা তুলনামূলকভাবে অনেক দেশের চেয়ে বেশি। কিন্তু মাটির উর্বরতার সঙ্গে আমাদের বৈজ্ঞানিকদের উন্নত গবেষণা ও ফসলের জাত উদ্ভাবন সমতালে এগিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে খাদ্য ঘাটতির হাত থেকে আমরা অনেকটা রক্ষা পাচ্ছি।

দেশ স্বাধীনের ৪৬ বছর অতিক্রান্ত হলো। সাড়ে সাত কোটি থেকে এখন দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি। জনসংখ্যা বেড়েছে কিন্তু দেশের চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ বাড়েনি বরং দিন দিন আবাসিক এলাকা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে ঘরবাড়ি, শিল্প এলাকায় কলকারখানার সম্প্রসারণ হয়েছে। চাষযোগ্য জমিই এসব কাজে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমি দিন দিন কমেছে। কিন্তু খাদ্য-চাহিদা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। স্বাভাবিক কারণে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এ ঘাটতি পূরণ হচ্ছে কীভাবে? দেশে বিভিন্ন এলাকায় আগে দেশি ধান উৎপাদন হতো। এসব ধানের বেশির ভাগ ফসলের একরপ্রতি ফলন ছিল খুব কম। এখন ‘বিরি’র দীর্ঘ গবেষণার ফলে উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। বছর বছর নানাজাতের উচ্চ ফলনশীল ধানের উদ্ভাবন হয়েছে। এতে কৃষকরা কম জমিতে বেশি ফসল পাচ্ছেন। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীদের আরো সাফল্যময় কিছু দিক আছে; যা না বললেই নয়।

দেশের একটি অংশ বৃহত্তর উপকূলীয় এলাকা; সাগরের প্রান্ত ছুঁয়ে যার অবস্থান। এ এলাকার কৃষিজমিতে জোয়ার-ভাটার খেলায় সহজে লোনাপানিতে প্লাবিত হয়। লোনাপানির সংস্পর্শে সব জায়গায় ধান-চাষ করা যায় না। এ সংকটকে উপলক্ষ করে আমাদের বিজ্ঞানীরা লবণসহিষ্ণু ধান উদ্ভাবন করেছেন। এখন লবণসহিষ্ণু ধানের কারণে উপকূলীয় এলাকায় অনেক জমিতে নির্বিঘেœ ধানের চাষাবাদ হচ্ছে। দেশে কোনো কোনো এলাকা অধিক খরাপ্রবণ। অনাবৃষ্টির কারণে অনেক ধানের জাত অল্পতে শুকিয়ে মারা যাওয়ার উপক্রম হয়। সেই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কম। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা তো রয়েছেইÑএসব কারণে কম পানিসুবিধার জমির জন্য আমাদের বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন খরাসহিষ্ণু ধান। ফলে কম বৃষ্টিপাতেও ফসলের ফলন সঠিক মাত্রায় ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এখানেই শেষ নয়, ভাটি অঞ্চলে উজানি পানির তোড়ে ভেসে যায় আমাদের নিম্নাঞ্চাল। ফলে অকালবন্যা নেমে আসে। ধান ডুবে যায়। কৃষক হয় দিশাহারা। এসব সর্বস্বান্ত কৃষকের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে আমাদের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিনের সাধনায় উদ্ভাবন করেছেন বন্যাসহিষ্ণু ধান। তা ছাড়া একই জমিতে বছরে বারো মাস যাতে ধান ফলে এমন উপযোগী করে উদ্ভাবিত ধান এখন সব অঞ্চলে কৃষকের দোরগোড়ায়। এসব কারণে আমরা খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পন্ন হয়েছি। বলতে গেলে এসবই আমাদের কৃষি গবেষণার ফল।

কোনো সংকট থেকে উত্তরণে মানুষ তার চিন্তাশক্তি কাজে লাগায়, তারপর সমাধান বের করে আনে। অধিক জনসংখ্যার এই দেশে খাদ্যসংকট মোকাবিলায় কৃষিবিজ্ঞানীরা স্বীয় উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে বাড়তি উৎপাদনের লক্ষ্যে সফলও হয়েছেন তারা। আমাদের দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা একটি বড় সমস্যা। এত দিন এই বাড়তে থাকা জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হয়েছে। আগামী দিনে এই বহরে নতুন উদ্ভাবন যোগ করতে হবে। কৃষি ক্ষেত্র আরো যেসব ফসল উৎপাদিত হয়, ধানের মতো গবেষণা করে সেসব ফসলেরও উন্নত সংস্করণ আবিষ্কার করতে হবে; যেন ওইসব ফসলের উৎপাদনমাত্রা বৃদ্ধি পায়, যেন আমাদের আমদানি করে চাহিদা মেটাতে না হয়।

গত বছর আমরা রসুন সংকটে বাজারে উচ্চমূল্য দেখেছি, ৮০ টাকার রসুন ২২০ টাকায় কিনেছি, এবার আবার ৮০ টাকায় কিনছি। এবার পেঁয়াজের সংকট দেখছি, ২৫ টাকার পেঁয়াজ ১০০ টাকায় কিনছি, হয়তো বছরান্তে নয়, কয়েক মাসে ব্যবধানে আবার ২৫ টাকার কাছাকাছি কিনব। এই যে উচ্চমূল্যের খেলাÑএটা চলছে দেশ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্ন না হওয়ার কারণে। এ সুযোগটা নিচ্ছে আমদানিকারক আর রফতানিকারক মিলে একটি সিন্ডিকেট। চালের সংকটময় অবস্থার কথা অল্পবিস্তর বলতেই হয়। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হয়ে উদ্বৃত্তের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। শ্রীলঙ্কায় চাল রফতানিও করা হয়েছে। যদি উজানের ঢল আর প্রবল বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি না হতো, তাহলে হয়তো ওই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকত। এখন উল্টো চাল আমদানি করতে হচ্ছে। গাজীপুরে বিভিন্ন ধরনের কৃষিসংস্থাকে নিয়ে যে আসর হয়ে গেল, যেভাবে প্রযুক্তি বিনিময় হলো, আগামী দিনে সংকটময় যেকোনো কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরামর্শমূলক পদক্ষেপ জাতিকে নতুন পথ দেখাতে সক্ষম হবে। আর দেশের মানুষ কৃষিপণ্যের উৎপাদনসংকট থেকে মুক্তি পাবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

mubarokhosen83@gmail.com

"