স্বপ্ন

নতুন বছরে পুরোনো প্রত্যাশা

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

সোহেল নওরোজ

দেয়ালে ঝুলন্ত নির্বাক দিনপঞ্জির দিকে চোখ পড়তেই সচকিত হইÑআরো একটা বছর বিদায় নিল! পুরোনো বছরের মতো ওই দিনপঞ্জিটার উপযোগিতাও ফুরাল! এখন সেটার স্থান দখল করবে ঝকঝকে নতুন আরেকটি দিনপঞ্জি। এখনো প্রত্যাশা-প্রাপ্তি হিসাব মেলানো হয়নি। সে চেষ্টাতে খুব বেশি লাভ হওয়ার কথাও নয়। সব হিসাব নির্ভুলভাবে মেলে না কখনোই।

ঠিক এক বছর আগে এভাবেই পুরোনো দিনপঞ্জিকে বিদায় জানিয়ে এটা তার স্থান দখল করেছিল। তখন এটাকে ঘিরে কত রকমের পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম, রঙিন স্বপ্নেরা উঁকি দিচ্ছিল মনের অন্দরে। সাদা-কালো দিনের মধ্যে রঙিন স্বপ্নে আশা আর আনন্দের যুগপতে বাস্তবতাকে ভুলে গিয়েছিলাম ক্ষণিকের জন্য। ঘোর কাটতে সময় লাগে না। দিন যাপনের গ্লানিতে রঙিন স্বপ্নগুলো দ্রুতই ধূসর হতে শুরু করে। ঠিন যেন তরতাজা টুকটুকে ফুলের শরীর থেকে নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে একেকটি রঙিন পাপড়ি। ভেতর থেকে অন্য কারো স্বর অচেনা সুরে বলে ওঠেÑআহারে জীবন, আহা জীবন!

এই বছর কী দেবেÑএমন একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে চলে আসে। বছর মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণা বা সংখ্যার ফ্রেম ছাড়া কিছু নয়। বছরকে ঘিরে তাই আমাদের প্রত্যাশার ধরন ‘কী পাব’তে আটকে থাকা সমীচীন নয়। নতুন বছর এমন কোনো দিব্য শক্তি নিয়ে আসে না বা আসবে না যে, দুনিয়াকে আমূল বদলে দেবে। ওই নিথর বস্তুর সাফল্য-ব্যর্থতা পুরোটাই নির্ভর করে আমার ওপর, আমাদের ওপর। মানুষের কর্মকান্ডেই বছরের গায়ে লাগে সাফল্যের রং, ব্যর্থতার বিষাদ। কাজেই একটা বছর কেমন হবে তার চেয়ে এই বছরটা কীভাবে কাটাব এমন চিন্তাতে মনোনিবেশ করাই শ্রেয়, যুক্তযুক্ত। তাতে অন্তত দায়টা ওই জড়বস্তুর ওপর না চাপিয়ে আমাদের দায়িত্বশীল হওয়ার দীক্ষা পাওয়া যায়।

একটা প্রতিজ্ঞা নিয়েই সকাল শুরু করি। বছরটা কীভাবে শুরু করলে বছরান্তের হতাশা-হাহাকার-আক্ষেপ কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে? কী কী বদলাতে হবে, কীভাবে বদলাতে হবে। ছোট ছোট ভুলগুলো মুছে না ফেলার কষ্ট দূর করতে শোধরাতে হবে ভুল করার আগে। সব জায়গায় সাফল্য আসবে না ঠিক। তবু আমার প্রয়াসে যেন কমতি না হয়! আরেকটু এগিয়ে পুনরাবৃত্তি হওয়া ভুলের একটা খসড়া করে ফেলি।

আহূত-অনাহূত মিথ্যাকে টেনে এনে বা টানিয়ে রেখে ক্ষুদ্র স্বার্থের পেছনে ছুটে চলায় আর শামিল হওয়া যাবে না।

প্রতিশ্রুতি রক্ষার আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার অপরাধ করা যাবে না।

দায়িত্বে অবহেলার অসুখ কাটিয়ে উঠতেই হবে।

ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মের প্রকোষ্ঠ থেকে বেরিয়ে মুক্ত বাতাস পোহাবার সুখ থেকে বঞ্চিত হওয়া যাবে না কোনোভাবেই।

অবহেলিত মানুষের মুখে ফুলের হাসি দেখার আনন্দতুল্য কিছুকে অবহেলা করার বোকামি থেকে রেহাই পাওয়ার পথে পা ফেলতে হবে প্রতিদিন।

আর নিজেকে বদলানোর প্রত্যয়ে সংযুক্ত হওয়ার তাড়না জাগিয়ে তোলার মতো ঘটনা এত বেশি, অথচ সময়ে তা খুঁজে পাই না অথবা খুঁজতে চাই না। এই প্রবণতা অপরাধগুলোকে বৈধতা দেয়। এই বোধ না থাকার নির্বুদ্ধিতা থেকে সরে আসাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান এতই বিস্তর যে, নিত্যদিনের সংকট থেকে মুক্তির স্বপ্ন এখনো ঝাপসা মনে হচ্ছে। দিনবদলের শপথের মধ্য দিয়ে যে বছরের প্রারম্ভিকতা, তাতে আক্ষরিক অর্থেই ছিল নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়ার স্বস্তি। কিন্তু বারবার হোঁচট খাওয়ার অভিজ্ঞতা বড় সংশয় চিহ্ন ঝুলিয়ে দেয় আমাদের সামনে। তবু মাথা তুলে দাঁড়াতে হয় বাঁচার জন্য, বাঁচানোর জন্য। সময়ের স্বাভাবিকতায় একটা বছর ‘মাত্র’ হতে পারে, কিন্তু জাগ্রত চেতনার বদ্ধমূলে না পাওয়ার গঞ্জনা, হারানোর বেদনা প্রতিনিয়ত দংশন করে। প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির ব্যবধান কেন দিনকে দিন বেড়েই চলেছে? রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, ভোগ-দখল, সন্ত্রাসের দাপটে দিনবদলের স্লোগান ¤্রয়িমাণ হয়ে ওঠে কখনো কখনো। তবু মূল সুর থেকে বিচ্যুত হওয়ার ভুল করা যাবে না ভুলেও। স্বার্থলোভী মানুষের ভিড়ে পর্যদুস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষের মাথা তুলে বাঁচার চেষ্টা, তবু দিন শেষে ঠিকই বলতে হয়Ñএই বেশ ভালো আছি! নৈরাজ্য আর অরাজকতায় কলুষ থেকে নিজে মুক্ত থাকা আর দেশকে মুক্ত রাখার চেয়ে মূল্যবান শপথ আর নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ থেকে সর্বনি¤œ পর্যায়ে এর চর্চা হওয়া জরুরি। জীবনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া অনিশ্চয়তা কাটাতে সর্বাত্মক প্রয়াসের বিকল্প কিছু নেই। যাবতীয় ক্লেশ-খেদ সরিয়ে রেখে নতুন বছরের প্রারম্ভে একটু ভালোর প্রত্যাশায় তবুও উন্মুখ হয়ে থাকি আমরা। অস্থিতিশীল বাজার ও গগনচুম্বী দ্রব্যমূল্য আমাদের হাপিত্যেশের অন্যতম প্রধান কারণ। নিত্যপণ্যের মূল্য অনেক আগেই সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়সীমা অতিক্রম করেছে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। আরো কত সমস্যা! তবু নির্বিঘেœ ঘরে ফেরার আকুতির কাছে পাত্তা পায় না তার কিছুই।

একদিনের লোক দেখানো বাঙালিপনায় আমাদের দায়মুক্তি ঘটতে পারে না। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন, প্রযুক্তির প্রশ্রয়ে ভিনদেশি ভাষা বা অশুদ্ধ মিশ্র ভাষার অনুসরণ-অনুকরণ নয়, বরং সার্বজনীন বাংলা চর্চার মাধ্যমে মায়ের ভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। একা সরকারের পক্ষে রাতারাতি দেশের সার্বিক চিত্র বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। দেশের উন্নতিকল্পে সর্বস্তরের মানুষের সততা, দায়িত্বশীলতা ও কর্মতৎপরতার নজির স্থাপন করা আবশ্যক। সর্বোপরি দুর্নীতি-দখল-সন্ত্রাসমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে কেবল নতুন দিনে পদার্পণ সম্ভব।

ধোঁয়াশার মধ্যে বসে সাফল্যমন্ডিত নতুন বছরের স্বপ্ন লালন করি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দখলদারিত্ব, হত্যা, দুর্ঘটনা আর অদূরদর্শিতার ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সর্বোচ্চ চেষ্টা দেখতে চাই সরকার থেকে তৃণমূল সবার ভেতর। এ কথা অনস্বীকার্য যে, নতুন বছরকে নতুন চেতনায় গ্রহণ করতে হলে আত্মবিস্মৃত না হয়ে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পুরোনো ভুল শোধরাতে হবে। সবকিছুকে তাই অদৃষ্টের হাতে সঁপে না দিয়ে নিত্যদিনের সংকট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে পথচলার সূচনা হোক নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক

snawroz.bau@gmail.com

"