ডাকসু নির্বাচন ও সাবেক নেতারা

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের শিক্ষা, স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর নেতা তৈরির আঁতুড়ঘর বলা হয় ডাকসুকে। ডান, বাম, মধ্যপন্থাÑ সব দলেই ডাকসুর সাবেক নেতাদের সক্রিয়-সগৌরব অংশগ্রহণ রয়েছে।

১৯২১ সালে উপমহাদেশের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ডাকসু সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের এক টাকা চাঁদা দিয়ে তখন এর সদস্য হতে হতো। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় দেশের স্বাধিকার, ভাষার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার ডাকসুর।

ডাকসুর প্রথম ভিপি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ১৯২৮-২৯ সেশনে ভিপি ও জিএস হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এ এম আজহারুল ইসলাম ও এস চক্রবর্তী, ১৯২৯-৩২ সময়কালে রমণী কান্ত ভট্টাচার্য ও কাজী রহমত আলী।

এরপর ভিপি ও জিএস নির্বাচিতদের মধ্যে যথাক্রমে রয়েছেন নিরোদ বিহারী নাগ ও আবদুর রব চৌধুরী, একরামুল হক ও শাহ আলী হোসেন, বদরুল আলম ও মো. ফজলী হোসেন, আবুল হোসেন ও এ টি এম মেহেদী, আমিনুল ইসলাম তুলা ও আশরাফ উদ্দিন মকবুল, বেগম জাহানারা আখতার ও অমূল্য কুমার, এস এম রফিকুল হক ও এনায়েতুর রহমান, শ্যামা প্রসাদ ঘোষ ও কে এম ওবায়েদুর রহমান, রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরী, বোরহান উদ্দিন ও আসাফুদ্দৌলা, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ও শফি আহমেদ, মাহফুজা খানম ও মোরশেদ আলী, তোফায়েল আহমেদ ও নাজিম কামরান চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন।

১৯৭২-৭৯ সময়কালে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে দায়িত্ব পালন করেন ছাত্র ইউনিয়নের মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও মাহবুব জামান। ১৯৭৯, ১৯৮০ ও ১৯৮২ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। প্রথম ২ নির্বাচনে যথাক্রমে জাসদ-ছাত্রলীগের এবং বাসদ-ছাত্রলীগের প্রার্থী হয়ে সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে জিতেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান। ১৯৮২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৮৯ পর্যন্ত ভিপি ও জিএস পদে যথাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন আখতারুজ্জামান ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। ১৯৮৯-৯০ সেশনে দায়িত্ব পালন করেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং মুশতাক আহমেদ। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৯০-৯১ সেশনের জন্য ভিপি ও জিএস পদে যথাক্রমে নির্বাচিত হন আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন।

উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কে কোথায় :

তোফায়েল আহমেদ : তিনি ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তোফায়েল ‘মুজিব বাহিনীর’ অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ এবং সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তিনি দুইবার শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। দশম জাতীয় সংসদেও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

মতিয়া চৌধুরী : ‘অগ্নিকন্যা’ নামে খ্যাত মতিয়া চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বামপন্থী রাজনীতি দিয়ে। তিনি ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৬৩-৬৪ মেয়াদে। ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, প্রচারণা, তদবির এবং আহতদের শুশ্রƒষায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদকও হয়েছিলেন। গত কয়েক মেয়াদ ধরেই আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। মহাজোট সরকারের গত দুই মেয়াদে (২০০৯-২০১৪ এবং ২০১৪-২০১৮) কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এবারসহ সাতবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

রাশেদ খান মেনন : ১৯৬৩-৬৪ মেয়াদে ডাকসুর ভিপি ছিলেন বামপন্থী রাজনীতিক রাশেদ খান মেনন। ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন তিনি। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আদায়, সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এমপি হন।

বর্তমানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মেনন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের হয়ে ২০০৮ থেকে গত তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ সমাজকল্যাণমন্ত্রী করা হয়েছিল তাকে। একাদশ সংসদেও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ডাকসুর প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আখতারউজ্জামান : আশির দশকের সামরিক এরশাদ সরকারবিরোধী আন্দোলনের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে আখতারউজ্জামান ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে ডাকসুর পর পর দুইবার জিএস এবং ১৯৮৩ সালে ভিপি নির্বাচিত হন। ছাত্র রাজনীতির নানা ধাপ পেরোনো সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা আখতারউজ্জামান একাত্তরে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেরাদুনে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ সদস্য এবং গাজীপুর জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান।

মাহমুদুর রহমান মান্না : তিনি ১৯৭৯ সালে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে এবং ১৯৮০ সালে বাসদ থেকে নির্বাচন করে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে ১৯৭২ সালে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) জিএসও নির্বাচিত হন। মান্নার রাজনৈতিক জীবন শুরু ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে। পরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে হেরে যান তিনি।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর : বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে তিনি ১৯৮৯-৯০ মেয়াদে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এই নেতা নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় অংশ নেন। আওয়ামী লীগের সাবেক এই সাংগঠনিক সম্পাদক পরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণফোরামের টিকিটে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আমান উল্লাহ আমান : ডাকসুর ইতিহাসে সর্বশেষ ভিপি নির্বাচিত হন তিনি। তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিভিন্ন মেয়াদের বিএনপির আমলে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এখন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদে রয়েছেন। তার সঙ্গেই জিএস ছিলেন খায়রুল কবির খোকন। তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

"