করোনার ছুটি যেভাবে কাটাচ্ছেন ইবি শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

শিহাব হোসেন শাওন, ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগÑ ক্যাম্পাসে আড্ডা, খুনসুটি, ঘোরাঘুরি, ক্লাস, এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন সব ছেড়ে এখন গৃহবন্দি। সার দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন বন্ধ ঘোষণা করল; মনে এক অজানা আনন্দ নাড়া দিয়ে উঠল।

ভাবলাম বাড়ি যাব, প্রচুর ঘুমাব। আনন্দ করব। প্যারামুক্ত থাকব কিছুদিন। তবে আজ খুব বিরক্তি মনে হচ্ছে। সারা দিন গৃহবন্দি থেকে মুঠোফোন নিয়েই কাটছে। গান, নাটক, মুভি দেখতে দেখতে এক ঘেয়েমি চলে এসেছে। চার দেয়ালে বন্দি এ জীবন থেকে পরিত্রাণ চাই। ফিরে পেতে চাই ক্যাম্পাসের ডায়না চত্বরের আড্ডা, ঝাল চত্বরে বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি, লেকের পাড়ে দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়ার মুহূর্তগুলো। এমন বন্দি জীবন ছেড়ে কবে ক্যাম্পাসে ফিরব, সেই অপেক্ষার প্রহর গুনছি।

মাহমুদুল হাসান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগÑ করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচতে আমাদের দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কর দেওয়া হয়েছে। এমন অনাকাক্সিক্ষত ছুটি সব সময় আনন্দের হয়ে থাকে। কিন্তু এ ছুটি একটু অন্যরকম। শঙ্কায় কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত। খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতে পারছি না। একপ্রকার বন্দি জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। হঠাৎ এই বন্দি জীবন আমাকে মানুষিকভাবে কষ্ট দিচ্ছে। তবুও দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশ ও জাতির স্বার্থে বাসাই অবস্থান করছি। আমরা জানতে পেরেছি এ ভাইরাস আক্রন্ত ব্যক্তি থেকে হাঁচি কাশির মাধ্যমে অন্যের দেহে সংক্রমিত হয়ে থাকে। আমরা যদি জনসমাগম এড়িয়ে গৃহে অবস্থান করি তবে এ ভাইরাস থেকে অনেকটাই নিরাপদে থাকব। সুতরাং এ মুহূর্তে আমাদের নিজের বাসাই থাকাটাই উত্তম।

সুমাইয়া সানজুম, লোক প্রশাসন বিভাগ-ক্যাম্পাসে থাকতে থাকতে বাড়িতে হঠাৎ করেই দীর্ঘ সময় আর ভালো লাগছে না। ক্যাম্পাসের সঙ্গে মায়া জড়িয়ে আছে। তাই এখন বাসাই বেশিদিন থাকতে কষ্ট হয়। সারা দিন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, ইনকোর্স পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন, ফিল্ড ওয়ার্ক ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ক্যাম্পাসে দ্রুতই সময় কেটে যেত। কিন্তু বাড়িতে এখন আর সময় কাটছে না। কোথাও যেতে পারছি না। সারা দিন চার দেয়ালে বন্দি থাকতে থাকতে দম যেন আটকে যাওয়ার মতো। এমন আবদ্ধ জীবন থেকে কবে পাবো মুক্তির স্বাদ? অতি দ্রুত ফিরে যেতে চাই ব্যস্ততার ক্যাম্পাসে।

এস এম জামিরুল ইসলাম, অর্থনীতি বিভাগÑ করোনা ছুটিতে বাড়িতে এসেছি ১৮ মার্চ। গ্রামে ফেরার পর লক্ষ্য করলাম গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই অসচেতন আর কুসংস্কারে বিশ্বাসী। গ্রামের ছেলে হিসেবে মায়ের চাপে আমাকেও বাধ্য হয়েই কুসংস্কার পালন করতে হয়। করোনাভাইরাসের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ বেশি জরুরি। সবাই সম্মিলিতভাবে এই মহামারির প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সঠিক নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে। এজন্য ভাবলাম সাধ্যমতো যতটুকু পারি গ্রামবাসীদের মাঝে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। পরে আমাদের উপজেলা ইউএনও মহোদয়ের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মানবতার জন্য সংগ্রামে যোগ দিলাম। সেখান থেকে যতটুকু পারছি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গ্রামের মানুষকে সচেতন করতে কাজ করে যাচ্ছি।

রকি হোসাইন, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ- করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে হঠাৎ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা আসল। ১৭ মার্চ সকালে ক্যাম্পাস ছেড়ে আসার সময় উপলব্ধি করলাম এ দেখা হয়তো সবার সঙ্গে শেষ দেখাও হতে পারে। ক্যম্পাসের বন্ধুবান্ধব রুমমেট সবার ভেতরেই ছিল চিন্তার ছাপ। আবার কবে খুলবে ক্যম্পাস? কবে দেখা হবে আমাদের? এত দিনের ছুটি কীভাবে কাটাব তা নিয়ে পরিকল্পনা ছিল আগে থেকেই। কারণ এই ছুটিতে অপ্রয়োজনে বাহিরে বের হওয়ার যাবে না। তাই পরিকল্পনা মাফিক নিজ গৃহে থেকে জ্ঞান ভান্ডারকে উন্নত করার চিন্তা করলাম। ভাবলাম, এই সুযোগট স্পোকেন ইংলিশে দিলে কেমন হবে? পরে রুটিন করলাম কত সময় ভোকাবুলারিতে, কত সময় গ্রামারে আর কত সময় সম্পূর্ণ প্র্যাকটিসে দেওয়া যায়। মূলত স্পোকেন ইংলিশকে কেন্দ্র করেই আমার সময় কাটছে এখন। তবে যখন একঘেয়েমি চলে আসে, তখন পছন্দের হুমায়ুন আহমেদের লেখা হিমু চরিত্রটি পড়ি, ইংলিশ মুভি দেখি আর কিছু সময় ফেসবুকিং করি। তবে এত কিছুর পরেও মন পড়ে আছে সেই চিরচেনা ক্যাম্পাসে। সারা দিন ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, আড্ডার মুহূর্তগুলো এখন মনে নাড়া দিয়ে উঠে। ফিরে যেতে চাই বার বার। সবশেষে এই করোনাভাইরাসের ছুটি যেন আমাদের মনে আরেকটি ভাইরাসের জন্ম দেয় কারণ অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা।

আবীর হোসেন, লোক প্রশাসন বিভাগ- ক্লাস শেষে ক্যাম্পাস থেকে মেসে ফিরতে বিকাল হয়ে যেত। রুমে ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগটুকুও ছিল না তেমন। তারপরই ছুটে যেতাম টিউশনি করাতে। টিউশনি শেষে রাত ১০টার পরে ক্লান্ত দেহে রুমে আসতাম। এভাবে চলত প্রতিদিন। হঠাৎ দূরপ্রাচ্যের চীন থেকে করোনা আতঙ্ক পৌঁছে গেল এ দেশের অলিগলিতে। তখন অপেক্ষায় ছিলাম কবে ক্যাম্পাস ছুটি হবে। বাসাই যাব। আগামী কয়েক দিন ক্লাস-পরীক্ষার ঝামেলা থাকবে না। তবে আজ খুব ছন্নছাড়া মনে হচ্ছে। সারা দিন গৃহবন্দী হয়ে আছি। কখনো বই পড়া, কখনো কবিত লেখা, আবার কখনে ফেসবুকিং ও মুভি দেখতে দেখতে দিন পার হয়ে যাচ্ছে। গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে করোনা আতঙ্ক। সন্ধ্যার পর এখন বাড়ির সামনের দোকানটাও বন্ধ হয়ে যায়। মোড়ে মোড়ে পুলিশের টহল। গ্রামের মধ্যে এখন শহরের সেই থমকে যাওয়ার গন্ধটাও পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্ত এখন আতঙ্কে কাটছে। ভয় হয়, আমি কি পারব পুনরায় ক্যাম্পাসে ফিরে যেতে?

 

 

"