দ্যুতি ছড়ায় যে গল্প

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

কাউসার মাহমুদ

‘মুক্তিযুদ্ধ, পেনশনের চেক ও ঘুষের গল্প’ কবি ও কথাসাহিত্যিক ইভান অনিরুদ্ধের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। ইভান অনিরুদ্ধ মূলত একজন কবি কি গল্পকার তা এখনো চূড়ান্ত নয়। অর্থাৎ তার কবিতা ও গল্পের বুনন একেবারেই ভিন্ন এবং এমন আলাদা জমিনের যে, কবিতা পড়লে মনে হয় তিনি কবিতাই লেখেন। আর গল্প পাঠে মনে হয়, এই ভূমিটিতে গল্পের সমস্ত উপাদান নিয়ে তিনি খুবই প্রশান্ত এবং উর্বর গল্পই রচনা করতে পারঙ্গম। সহজ, সাবলীল ভাবে যাপিত জীবনের গল্প, দুঃখ, প্রেম, অহম আর কষ্টবোধকেই তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারেন স্বাচ্ছন্দ্যে। আলোচ্য ‘মুক্তিযুদ্ধ, পেনশনের চেক ও ঘুষের গল্প’ বইয়ের মূল ও প্রধান গল্পগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। এবং এমন ধারার একটি গল্পের নামেই বইয়ের নামকরণও করেছেন তিনি। বইয়ে মোট দশটি গল্প রয়েছে।

যেহেতু গল্পের বইয়ের আলোচনা এটি। তাই বোধকরি কবি ইভানকে গল্পকার বিশেষণেই এখানে উল্লেখ করা শ্রেয়। গল্পকার ইভান অনিরুদ্ধের এই বইটি পড়ে সবচেয়ে বেশি আকর্ষিত হয়েছি তার চেতনাকে উপলদ্ধি করে। দেশ ও বাঙালি জাতির প্রতি তার যে মমত্ববোধ ও শেকড়ের আদিম শৈল্পিক টান, তাই তিনি প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন গল্পে। অর্থাৎ এই লেখক তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, মুক্তিবাহিনী, রাজাকারÑ এসব বিষয়েই যেন গল্প ফাঁদতে বেশি আনন্দিত, স্বচ্ছন্দ ও স্বতঃপ্রণোদিত। সেই সঙ্গে ইতিহাস ও তৎকালীন সময়ের চিত্রছবি এঁকে একেকটি গল্পের শরীর নির্মাণে তার যে শৈল্পিকতা ও কালের সত্যকে তুলে আনা, তা তিনি আনতে পেরেছেন বেশ অনেকটাই। মোটকথা, আশির দশকে জন্ম নেওয়া এই গল্পকার বোধকরি তার এই গল্পভুবনে মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকেই উপজীব্য করতে চেয়েছেন। তখনকার সত্য ঘটনা, পাক হানাদার বাহিনীর লোমহর্ষকতা, মুক্তিবাহিনীর আত্মদান এবং তৎকালীন রাজাকারদের চরিত্রকেই ইতিহাস পর্যালোচনা করে গল্পে তুলে আনতে সচেষ্ট থেকেছেন। এ ক্ষেত্রে তার সফলতা ষোলোআনা না হলেও বেশ অনেকটাই অর্জন হয়েছে বলে মনে হয়। তাই বলে শুধু কেবল মুক্তিযুদ্ধ ও এ সময়ের ঘটনা অবলম্বনেই এই বইয়ের সবকটি গল্প নয়। গল্পকার যেহেতু, তার ওপর লেখা হয় কবিতাও। প্রেম ও মধ্যবিত্ত পরিবারের গভীর দীর্ঘশ্বাস ও দাগ টানা টানাপোড়নের প্রেমময় জীবনের গল্প তো থাকবেই। তাই জীবনধর্মী এমন কয়েকটি গল্পের সন্নিবেশও আছে বইটিতে। যা পাঠককে বিলোড়িত করবে বলে

বিশ্বাস করি।

গল্পকার ইভান অনিরুদ্ধের গল্পের ভাষা খুবই সাবলীল ও স্বচ্ছ। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ কখনো অনুমেয় তথা তিনি কি বলতে চেয়েছেন তা প্রথমেই বোঝা যায়। তবে বেশকিছু গল্প এই বিষয়টিকে উতরে একটি উৎকর্ষতায় গিয়ে পৌঁছেছে। এই গল্পগুলোয় পাঠক কিছুটা দ্বিধা ও একটা টানের মধ্যে পড়ে থাকবেন। অপেক্ষা করবেন একটি বাঁক অথবা চরম সমাপ্তির। পড়তে পড়তে কখনো মনে হবেÑ এমন হবে কিন্তু মুহূর্তেই গল্পের বাঁক বদলে গতি প্রবাহিত হয় ভিন্ন কোনো টানেলে। এসব গল্পে তার ভাবনা শক্তি ও গল্পকে নিয়ে খেলতে পারার অস্বাভাবিক, ঈর্ষণীয় সক্ষমতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এই যেমন, প্রথম ‘দখল’ গল্পটিই। গল্পে তার ভাষা ব্যবহার ও চরিত্রের প্রয়োগ যথাযথ মনে হলেও সমাপ্তিটা অনুমেয় হয়েছে প্রথমেই। যেন বুঝতেই পারছি শেষটা হবে যোগেন বাবু যুদ্ধের পর ভারত থেকে ফিরে এসে দেখবেন রাজাকার আবদুস সালাম তার বাড়িঘর সব দখল করে নেবে। বলতে গেলে এইধারা ও নির্দিষ্ট এ ঘটনাটিকে কেন্দ্র ও উপজীব্য করেই বাংলা সাহিত্যে অনেক গল্প রচিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে ইভান অনিরুদ্ধের ‘দখল’ নতুন কিছু নয়। কিন্তু তারপরও পুরো গল্পটিতে যোগেন বাবু, রমা, রেণু ও আবদুস সালাম; মাত্র চারটি চরিত্র নির্ধারণ করে যেভাবে গল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন, তার সঙ্গে ঘটনাকে টেনে যে একটা ঐতিহাসিক ফ্লেভার! তা তার মুনশিয়ানাই বলবো। তেমনিভাবে ‘মালেকের যুদ্ধ জয়’ ও ‘পেনশনের চেক ও ঘুষের গল্প’ দুটিকে মনে হয়েছে দুর্দান্ত। ঘটনা, সময়, চরিত্র সবকিছু মিলিয়ে এই গল্প দুটিকে মনে হয়েছে বইয়ের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ দুটো গল্প। মালেক একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। শৈশবের মধ্যভাগে এসে নানাবাড়িতে একটি দুর্ঘটনায় প্রথম অসুস্থতা। তার কিছুকাল পরে আবিষ্কার করে স্ত্রী লিঙ্গের চালচলন ও কাজবাজের প্রতি নিজের বিশেষ আকর্ষণ। বুঝতে পারে ক্রমশ সে অস্বাভাবিক কোনো মানুষে রূপান্তরিত হচ্ছে। জগৎ সংসারে এক ভাই ও ভাবি ছাড়া আপন বলতে কেউ নেই। অথচ ভাবি তাকে তাড়ানোর মতলবে থাকে সারাক্ষণ। একদিকে ঘরছাড়া অন্যদিকে ক্রমশ তৃতীয় লিঙ্গে রূপান্তরিত মালেকের কপালে সমাজের বঞ্চনা। ঘেন্নার থুতু মেখে পথ চলতে হয় তার। শেষমেশ বিকৃত রুচির চেয়ারম্যানের ঘরে জায়গা পাওয়া মালেক কিভাবে রাজাকার চেয়ারম্যানসহ গ্রামে অবস্থানরত পাকবাহিনীকে পরাস্ত করে কুপিয়ে হত্যা করে। তাই আছে গল্পের পরতে পরতে। মুক্তিযুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় সময়ে একজন তৃতীয় লিঙ্গের দেশপ্রেম ও শরীরে অমানুষিক নির্যাতন সয়ে দৃঢ়প্রত্যয়ে কিভাবে শত্রুকে পরাভূত করা যায় তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেন গল্পের মালেক। বাংলাদেশ জন্মের পেছনে লাখো শহীদ, বীর সন্তানের সঙ্গে সমাজের বঞ্চনামাখা এ রকম কোনো মালেকও যে জড়িয়ে আছে, তাই বেশ সুকরুণ ও তীব্রভাবে রূপায়ন করেছেন গল্পকার। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক শিল্প-সাহিত্যে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্টভাবে কোথাও আলোচনা হয়েছে তা আমার মতো অনেকের কাছেই অজানা। সেইক্ষেত্রে ইভান এই গল্পে সেইসব মানুষের কথা ছোটগল্পের ক্যানভাসে টেনে এনে তার লেখকঋণ শোধ করেছেন এবং আমাদের দায়মুক্তি দিয়েছেন।

‘পেনশনের চেক ও ঘুষের গল্প’টি পড়ে মনে হয়েছে, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে পুতিময় দুর্গন্ধ বাস্তবতাকে। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও রিটায়ার্ড স্কুলমাস্টার আবুল কালাম। স্কুলের সাধারণ শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট না থাকায় চার বছর হলো তার পেনশনের টাকা আটকে আছে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। ঘরে স্ত্রী নানা সময় তার সঙ্গে উচ্চগ্রামে কটাক্ষ করে বলে, ‘তুমি যে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তার প্রমাণ কী? তোমার কি কোনো সার্টিফিকেট আছে?’ স্ত্রীর এই কথায় আহত হন আবুল কালাম। নিতান্ত দুঃখ, হতাশা, আক্ষেপের সঙ্গে একটি অহংকার মিশিয়ে কখনো কখনো বলেন, ‘তুমি কি পাগল হয়েছো হাসানের মা! আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সারা জীবন ন্যায়ের পক্ষে থেকেছি। এখন শেষ জীবনে ঘুষ দিয়ে আমার ন্যায্য পাওনা টাকা তুলবো?’ কিংবা তীব্র কষ্টে লীন হয়ে স্ত্রীকে বলেন, ‘কী বলছো তুমি! আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না। আমি ঘুষ দিয়ে পেনশনের টাকা তুলবো না। যেদিন হবে সেদিন হবে, এটাই আমার ফাইনাল কথা।’ গল্পের এক পর্যায়ে ছেলে হাসান কিভাবে ঘুষ দিয়ে চরম বাস্তবতা মেনে মুক্তিযোদ্ধা বাবার পেনশনের টাকা উদ্ধার করেন, তাই সাজানো হয়েছে গল্পে।

নিম্ন মধ্যবিত্ত একজন রিটায়ার্ড স্কুলমাস্টার ও মুক্তিযোদ্ধার সাধারণ জীবনকে উপজীব্য করেই একটি দুর্দান্ত গল্প এটি। এমন সাধারণ জীবনগুলোর যে অসাধারণ গল্প থাকে। সেই গল্পগুলোকেই পরম যতেœ ইতিহাস আশ্রয়ে লিখেছেন গল্পকার ইভান। পড়তে পড়তে কখনো মনে হয়েছে, এই গল্পটি তো আমার পরিবার অথবা পরিচিত কারো। তাদের সঙ্গেও তো এমন আচরণ হয়েছে। স্বাধীন দেশে নিজের অধিকারটুকু নির্বিঘেœ আদায়ের যে নিরাপত্তা ও আনন্দ থাকার কথা ছিল তাই বুঝি ক্ষয়িত হচ্ছে, আহত হচ্ছি আমরা। এই সত্য ও বর্তমান পর্যুদস্ত বিবেককে তাড়িত করার লক্ষ্যেই যেন ইভান এভাবে গল্প লিখে যাচ্ছেন। যা পাঠে নিজের অজান্তেই আমাদের ভেতর থেকে একটা ‘আহ’ শব্দ বের হয়ে আসে। আমরা আহত হই বড় করুণভাবে। আর দেখি, আমাদের ওপরে শাসনাধীন সেইসব ভীত কাপুরুষ লোককে, যারা তাদের বিবেক ও স্বচ্ছতাকে পায়ে ঠেলে একটি অন্ধকার ভয়ের ভেতরই থাকে সর্বত্র। ইভান গল্পে গল্পে সেসব চরিত্র ও শেষ সমাপ্তিকেই এঁকেছেন নিদারুণভাবে।

এছাড়াও তার এ বইয়ে আছে মধ্যবিত্ত পরিবারের কিছু অসাধারণ প্রেমের গল্প। ‘যুদ্ধ, প্রেম ও মৃত্যু’, ‘নীরার লাল টিপ’, ‘তোমার মুখের রূপ কতো শত শতাব্দী’ গল্পগুলো তাই। এসবে উঠে এসেছে আমাদের জনজীবনের প্রেম। কোনো ব্যাচেলর ছেলের মেস জীবনের গল্প এবং বাড়িওয়ালার মেয়ের সঙ্গে প্রেমের মিষ্টি রোমান্টিক মুহূর্তের ছোট ছোট বর্ণনা। যদিও এসব ঘটনা ও গল্পের কথকতা খুবই চর্চিত, তবু এই চর্চিত বিষয়গুলো সহজ গদ্যে, সাধারণভাষ্যে পাঠককে নতুন করে স্পর্শ করতে

সক্ষম হবে।

"