বৈশাখের হালখাতা

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:৫১

উপল মাহমুদ

প্রাচীন বর্ষবরণের রীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবেই জড়িত হালখাতা। সেই যুগে প্রত্যেকে চাষাবাদ বাবদ চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করে দিত। এর পরের দিন, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ ভূমির মালিকেরা তাদের প্রজাসাধারণের জন্য মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রাখতেন, যা পরে ব্যবসায়িক পরিম-লে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানিরা সারা বছরের বাকির খাতা সমাপ্ত করার জন্য পহেলা বৈশাখের দিনে নতুন সাজে বসেন দোকানে। গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করে শুরু করেন নতুন বছরের ব্যবসার সূচনা। এ উৎসবগুলো সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে পরিণত হয়েছে প্রত্যেক বাঙালির ঘরে। এখনো নববর্ষে হালখাতার হিড়িক পড়ে বাজার, বন্দর ও গঞ্জে। হালখাতা বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের প্রথমদিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা পাওনার হিসাব সমন্বয় করে এ দিন হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এ জন্য খদ্দেরদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করে দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করান। খদ্দেররাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুরনো দেনা শোধ করে দেন। আগেকার দিনে ব্যবসায়ীরা একটি মাত্র মোটা খাতায় তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। এ খাতাটি বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হালনাগাদ করা থেকে ‘হালখাতা’র উদ্ভব।

বাংলা নববর্ষ এবং হালখাতা

হিন্দু সৌর পঞ্জিকা মতে, বাংলায় ১২টি মাস অনেক আগে থেকেই, পালন করে আসছে। কিন্তু গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় দেখা যায়, এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় এই সৌর বছর গণনা শুরু হতো। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ভারতবর্ষে মোগল সম্রাজ্য শুরুর পর থেকে আরবি বছর হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী তারা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সঙ্গে এর কোনো মিল পাওয়া যেত না। আর তখনই সম্রাট আকবর এর সুষ্ঠুু সমাধানের জন্য বাংলায় বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী সে সময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌরবছর ও আরবি হিজরি সালেরও ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরির কাজ শুরু করেন। বাংলা বছর নির্ধারণ নিয়ে রেখা বিভিন্ন বইয়ের প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে পরীক্ষামূলক এই গণনা পদ্ধতিকে কার্যকর ধরা হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে, অর্থাৎ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের তারিখ থেকে। প্রথমে ফসলি সন বলা হলেও পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত পেতে শুরু করে।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোমকীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকা-ের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।

বাঙালি উৎসবপ্রবণ জাতি। বাঙালির মিলনমেলা উৎসবের রঙ মাখে অবলীলায়। ‘হালখাতা’ কিংবা ‘পুণ্যাহ’ সেই রঙের জারিত প্রস্রবণ। সম্রাট আকবরের রাজত্বকাল থেকেই ‘হালখাতা’ পহেলা বৈশাখের আচার-অলংকার হিসেবে বিবেচিত। হালখাতার পাশাপাশি জমিদারকে খাজনা প্রদানের অনুষ্ঠান হিসেবে ‘পুণ্যাহ’ প্রচলিত ছিল। নববর্ষের প্রথম দিন প্রজাকুল সাধ্যমতো ধোপাদুরস্ত পোশাকে সজ্জিত হয়ে জমিদারবাড়িতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করে মিষ্টিতে আপ্যায়িত হতো। জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ায় ‘পুণ্যাহ’ এখন বিলুপ্ত হয়েছে। তবে বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে হিন্দু ব্যবসায়ীরা হালখাতার সমৃদ্ধ ইতিহাস ছোট আকারে হলেও আজও পালন করে আসছেন।

প্রাচীনকালের হালখাতা

কাগুজে কিংবা ধাতব মুদ্রার প্রচলন না থাকায় প্রাচীনকালে ব্যবসা-বাণিজ্য কৃষিপণ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত ছিল। এ ব্যবস্থায় কৃষকেরা যেসব পণ্য উৎপাদন করতেন, তা অন্যের উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে বিনিময় করতেন এবং রশিতে গেরো দিয়ে হিসাব রাখতেন। কেউ কেউ মাচানের খুঁটিতে দাগ কেটেও হিসাব রাখায় ব্যবস্থা করতেন। আরো পরে তালপাতায় বা তুলট কাগজের চিরকুট এই হিসাব ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। হালখাতা সেই পুরাতন ব্যবস্থার পরিবর্তিত রূপ।

কৃষি-অর্থনীতিতে হালখাতা ছিল বাকিতে ভোক্তার প্রয়োজন মেটানোর একটি মাধ্যম। কৃষি-অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ না থাকায় বাকিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনাবেচা ছিল অপরিহার্য। ফলে হালখাতার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তখন বাংলার কৃষকদের হাতে নগদ টাকা থাকত না। পাট বিক্রির নগদ অর্থ কেবল পরিবারের সদস্যের পোশাক ক্রয়, দেনাশোধ এবং বিয়ের খরচ মেটানোর কাজে ব্যবহার করত। নববর্ষে দুই-একটি শখের ইলিশ মাছ কেনার জন্যও তারা এই টাকা খরচ করত। পাটের মৌসুম পার হলেই পুনরায় বাকিতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বাধ্য হতো। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হালখাতা অনুষ্ঠানে এই দেনার আংশিক বা পুরোটাই পরিশোধের রীতি প্রচলিত ছিল। ফলে হালখাতা ছিল পুরাতন বছরের হিসাব মিটিয়ে নতুন বছরে নতুন জীবন শুরুর সংস্কৃতি।

 

"