বৈশাখের ফুলগুলো

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:৫০

মোকারম হোসেন

গ্রীষ্মের খরতাপ। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। মিরপুর বোটাবিনক্যাল গার্ডেনের প্রধান ফটক থেকে অফিস ভবন পর্যন্ত যেতেই ঘেমে-নেয়ে একাকার। গিয়েছিলাম ট্যাবেব্যুইয়া ফুলের খোঁজে। সেখানে ট্যাবেব্যুইয়ার উৎসব দেখে অবাকই হলাম। অনেকগুলো গাছ, তাতে বর্ণিল পুষ্প প্রাচুর্য একেবারেই ধারণাতীত। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা তার শ্যামলী নিসর্গ গ্রন্থে ঢাকায় যে দু-একটি ট্যাবেব্যুইয়ার সন্ধান দিয়েছিলেন, তা এখন অতীত। ভেবেছিলাম ঢাকায় এ প্রজাতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু না, বোটানিক্যাল গার্ডেন গাছটিকে সংরক্ষণ করে নিশ্চিত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছে।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে ট্যাবেব্যুইয়ার সন্ধানে গিয়ে দেখা পেলাম গর্জনেরও। প্রবেশ পথের দ্বিতীয় ফটক পার হতেই ডানপাশে কয়েকটি গাছ চোখে পড়ে। গাছতলায় পড়ে থাকা রাশি রাশি ঝরাফুল দেখে গাছের আদ্যোপান্ত খুঁটিয়ে দেখি। সরল কান্ডের সুউচ্চ গাছ, একেবারই খাড়া, ফুলও বেশ ওপরে। ঘুরতে ঘুরতে মধুগন্ধি কইনার ফুলেরও দেখা পেলাম। বৈশাখে চোখ খুললেই দেখা মেলে কৃষ্ণচূড়া ও জারুলের; এসব ফুলের আয়োজনও স্নিগ্ধ-মায়াবি, সে তুলনায় সোনালু ইদানীং অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য। প্রথমোক্ত ট্যাবেব্যুইয়ার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। ট্যাবেব্যুইয়া মাঝারি উচ্চতার গাছ, আমাদের দেশে দুটি প্রজাতি চোখে পড়ে। ত্রিপত্রিক এবং পঞ্চপত্রিক, কান্ড নাতিদীর্ঘ ধূসর বর্ণ, অমসৃণ এবং শীর্ষ বিক্ষিপ্ত শাখা-প্রশাখায় এলোমেলো। পত্রিকা ডিম্বাকৃতি, মসৃণ ও মøান সবুজ, বিন্যাস বিপ্রতীপ। পাতার আড়ালে ফুলেরা আচ্ছন্ন থাকে বলেই ফুলগুলো সহজে চোখে পড়ে না। গন্ধহীন হলেও ট্যাবেব্যুইয়া এই বৈশিষ্ট্যে শিউলি কিংবা কলকের ঘনিষ্ঠ। ফুল নিঃসন্দেহে সুন্দর; ভেরির আকৃতি, দল-প্রান্ত আন্দোলিত এবং ভেতর হলুদ ও বেগুনির মিশ্রণে উজ্জ্বল। ফল লম্বা, সরু ও ঘন বাদামি। বীজ ডিম্বাকৃতি। ফুল পূজার অর্ঘ্য ও নারীর কেশবিন্যাসের উপকরণ।

গোটা বসন্তই সোনালু ফুল পত্রহীন শূন্যতায় নিশ্চুপ কাটিয়ে দেয়। তখন অনেকটা মৃতপ্রায়। এই রূপ প্রত্যক্ষ করলে আগামী সম্ভাবনার কথা বেমালুম বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। প্রকৃতি থেকে বসন্ত যখন নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই প্রাক বৈশাখে সোনালু যেন অলৌকিকভাবেই প্রাণ ফিরে পায়। গাছজুড়ে পুষ্পকলিরা উঁকি দেয়, ছড়িয়ে দেয় প্রাণের শিহরণ। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, জাতীয় সংসদ ভবনের পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত (মাঝের পথ) পথের এক পাশে অঢেল সোনালু চোখে পড়ে। ঢাকায় দু-এক দশক আগেও এর দৈন্যতা ছিল। এরা একাধিক নামে পরিচিত : সোনাইল, বান্দরলাঠি, হনালু ইত্যাদি। এ গাছের সেরা বৈশিষ্ট্য তার ঝুলন্ত দীর্ঘ মঞ্জরি এবং গন্ধক-হলুদ ফুল। এমন মণিকাঞ্চ যোগ বড়ই দুষ্পাপ্য। পুষ্পিত সোনালুর হলুদ নির্ঝর তুলনাহীন। ইংরেজি নাম ‘গোল্ডেন শাওয়ার’ নিঃসন্দেহে সার্থক উপমা।

জারুল ভূ-বাংলার অন্তরঙ্গ তরু প্রজাতি। কৃষ্ণচূড়ার লাল এবং সোনালুর হলুদ-সোনালি রঙের সঙ্গে এর নীলাভ সৌন্দর্য স্নিগ্ধ ও মনোহর। এ সময়ে একমাত্র বেগুনি রঙের উৎস জারুল, তবে জ্যাকরান্ডার সৌন্দর্যও কম যায় না। সৌন্দর্য যাই থাকুক, সে তুলনায় বিস্তার ঘটেনি। আর এ ক্ষেত্রে পুষ্প প্রাচুর্য, স্থায়িত্ব, সহজলভ্যতা ও নান্দনিকতার কারণেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে জারুল। ঝরা পালকের কবি জীবনানন্দ দাশ জারুলের অপার সৌন্দর্য দেখেছেন এভাবে—

‘ভিজে হয়ে আসে মেঘে এ দুপুর চিল একা নদীটির পাশে

জারুল গাছের ডালে বসে বসে চেয়ে থাকে ওপারের দিকে।’

জারুল জলাভূমির গাছ হলেও স্বাভাবিক শুষ্কতায় বেঁচে থাকতে পারে। এ কারণেই ঢাকায় জারুলের আশ্চর্য প্রস্ফুটন চোখে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল লাগোয়া পথপাশে, ভিসির বাসভবনের উত্তরপাশে, রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিপুল পরিমাণ জারুলের দেখা মেলে। জারুলের কান্ড নাতিদীর্ঘ, খসেপড়া বাকলের আঁকাবাঁকা চিহ্নে বিচিত্র কান্ড অনেকটা পেয়ারা গাছের সঙ্গে তুলনীয়। পাতা লম্বা, চওড়া এবং গাঢ় সবুজ। শীত পাতা খসানোর দিন। জারুলের শাখান্তের বিশাল মঞ্জরি, উজ্জ্বল বেগুনি বর্ণের উজ্জ্বলতা এবং ঘন সবুজ পাতার পটভূমিকায় উৎক্ষিপ্ত পুষ্পচ্ছটা শুধু দুষ্প্রাপ্য নয়, সৌন্দর্যেও অনন্য।

অবাধ অথচ স্বল্পকালীন প্রস্ফুটনের জন্য পাদাউক অনন্য। কোনো ভোরে হয়তো মঞ্জরির হলুদ ফুটেছে আলো হয়ে সারা গাছে, বাতাস ভরে উঠল মধুগন্ধে, কিন্তু পরদিন কোনো চিহ্ন কোথাও থাকবে না। এক দিনের ব্যবধানে নিঃশেষে মুছে যাবে সব রং, শুধু নিচে ছড়িয়ে থাকবে অজস্র ঝরা ফুলের হলুদ। স্বল্পায়ু প্রস্ফুটন সত্ত্বেও বর্ণে, ঔজ্জ্বল্যে, সুগন্ধের ঐশ্বর্যে, দেহসৌষ্ঠবের আভিজাত্যে পাদাউক তরুরাজ্যের অন্যতম অপ্রতিদ্বন্দ্বী বৃক্ষ।

আমাদের দেশে জ্যাকারান্ডার ইতিহাস একেবার সংক্ষিপ্ত নয়। কিন্তু সে তুলনায় বিস্তার লাভ করেনি। জলাবদ্ধতাই এ গাছের মূল হন্তারক। গত কয়েক বছরের ব্যবধানে হারিয়ে গেছে ঢাকার দুটি বড় গাছ। একটি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট লাগোয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর, অন্যটি পুরাতন সড়ক ভবনের পশ্চিম পাশের দেয়াল লাগোয়া। গাছ দুটির ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উত্তর পাশে, ঢাকা বিডিআরের দক্ষিণ পাশের প্রবেশদ্বারের ডানদিকে কয়েকটি বড় জ্যাকারান্ডা চোখে পড়ে। ইদানীং রমনা পার্কসহ বিভিন্ন এলাকায় অপরিণত গাছ দেখা যায়। এ গাছ একহারা গড়নের, লম্বাটে, মসৃণ হালকা-ধূসর শরীর, কৃষ্ণচূড়ার মতো পাতা, তবে আরো চিরল চিরল, কারুকার্যময়, গাছের তন¦ী চেহারার সঙ্গে বেশ মানানসই।

এবার কাঠগোলাপের কথা শোনা যাক। বিচিত্র রঙের এই ফুল দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি সুগন্ধিও। এসব কারণে নামও অনেকÑ গুলাচি, গুলাইচ, গরুড়চাঁপা, চালতা গোলাপ, গোলক চাঁপা ইত্যাদি। শীতকালে গাছের সব পাতা ঝরে পড়ার পর বসন্তের শেষ দিকে দু-একটি করে ফুল ফুটতে শুরু করে। তখন গাছে একটিও পাতা থাকে না। অবশ্য বৈশাখ মাসেই পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয় তার রূপ। তখন সারা গাছে শুধু ফুলের উৎসব। গ্রীষ্মকাল ছাড়িয়ে বর্ষা ঋতু পর্যন্ত কাঠগোলাপের এমন সৌন্দর্য অটুট থাকে।

আমাদের চারপাশে যখন জারুল, সোনালু আর কাঠগোলাপের ফুলগুলো ফুটতে শুরু করে; তখন টুকটুকে লাল রঙের কোনো ফুল থাকে না। প্রকৃতিতে সেই লাল রঙের শূন্যতা দূর করতেই আসে কৃষ্ণচূড়া। কৃষ্ণচূড়া আমাদের এতই আপন আর পরিচিত যে তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। কিন্তু মজার বিষয় হলো, আমাদের এত প্রিয় এই গাছটির জন্মস্থান সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার অঞ্চল। মাঝারি উচ্চতার চিরল চিরল পাতার এই গাছ আমরা খুব সহজেই চিনি। ৫ পাপড়ির মধ্যে একটু বড় ও তাতে হলুদ বা সাদা দাগ থাকে। কোনো কোনো ফুল দেখতে আবার অনেকটা কমলা রঙের। কিন্তু এমন সুন্দর এ ফুলটির কোনো গন্ধ নেই। সারা গাছে এতই ফুল ফোটে যে, আমরা অনেক দূর থেকে বুঝতে পারি কৃষ্ণচূড়া ফুটেছে।

বৈশাখের রাশি রাশি ফুলের ভিড়ে যদি স্বর্ণচাঁপার কথা না বলি তা হলে অনেকটা অপূর্ণই থেকে যায়। এই ফুলটির শোভা ভারি স্নিগ্ধ। সোনালি রঙের পাপড়িগুলো বেশ তুলতুলে, কোমল। এসবের সঙ্গে আছে দারুণ সুবাস। পাতার তুলনায় ফুলগুলো ছোট। তাছাড়া ফুল ফোটেও বেশ উঁচুতে। এ কারণে স্বর্ণচাঁপার ফুল চট্ করে আমাদের চোখে পড়ে না। চোখে না পড়লে যে খুঁজে পাওয়া যাবে নাÑ এমন কোনো কথা নেই। ফুলের চমৎকার মধুগন্ধই আমাদের আকৃষ্ট করে তার কাছে নিয়ে যায়।

এবার ক্যাশিয়া জাভানিকার কথা। এরা লালসোনাইল নামেই বেশি পরিচিত। উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা নাম রেখেছেন লালসোনাইল। এ ফুলের জন্মস্থান ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপপুঞ্জ। তবে ইদানীং বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। শীতকালে পাতা ঝরায়। বসন্তের মাঝামাঝি সময়ে গাছজুড়ে নতুন পাতা আসে। তারপর বৈশাখের শুরুতেই চমৎকার গোলাপি রঙের সুগন্ধি ফুলগুলো ফুটতে শুরু করে। সারাগাছে নতুন পাতা আর উজ্জ্বল রঙের ফুল অনেক দূর থেকেই আমাদের চোখে পড়ে। গাছটি দেখতে অনেকটা ছাতার মতো; গোলগাল ভারি সুন্দর।

শুধু এই কটি ফুলই নয়, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে আমাদের প্রকৃতিতে আরো ফোটে কেও, কনকচূড়া, ভাঁট, সোনালি শাপলা, বেলি, গন্ধরাজ, কয়েক রকম লিলি ইত্যাদি।

ছবি : লেখক

 

"