বাংলা নববর্ষের গ্রহণ-বর্জন ও বাঙালির হালখাতা

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:৪৭

আকমল হোসেন

কবিকণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছেÑ ‘ঐ নতুনের কেতন উড়ে কালবৈশাখী ঝড় তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। কবি নতুনের জয়গান ও প্রশংসা করেছেন এবং তাকে গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, সেখানে এক অজানা বাসনা কাজ করে। বাঙালির প্রবাদে আছে, যাকে দেখি নাই সে বড় রূপসী আর যার হাতে খাইনি সে বড় রাঁধুনি। অজানা বস্তু এবং নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণটাই বেশি। এ প্রসঙ্গে গ্রামীণ খনার বচনেরও সমর্থন মেলে। বচনে বলছে, ‘নতুন নতুন তেঁতুলের বিচি (বীজ) পুরান হলে বাতায় গুঁজি।’ অর্থাৎ নতুনের আদর বা কদরই আলাদা। সবেমাত্র হয়েছে এমন জামাই এবং পুরাতন জামাইয়ের মধ্যে নতুন জামাই পরিবারের সদস্যদের কাছে বেশি আদর পায়। তাই তো কবি তার লেখায় প্রবীণকে রেখে নবীনকে আহ্বান করে লিখেছেন, ‘হে নবীন কর হানি দ্বারে নবযুগ ডাকিছে তোমারে’ একই কারণে নববর্ষের প্রতি মানুষের আলাদা এবং অতিরিক্ত আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। আর এ প্রবল আকর্ষণ থেকেই বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের মধ্যে বর্ষবরণের কাজটি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে; সেদিক থেকে বাঙালিরা একটু পিছিয়ে। শিক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা, গবেষণা এবং বিকাশের যে কাজ সেটিই হলো ক্রিয়েটিভ কাজ। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর ব্যক্তিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এটা করা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে। তবে সৃষ্টিশীলতার জন্য যেমন মানসিকতা দরকার, তেমনি দরকার আর্থিক সচ্ছলতা, সেটা ব্যক্তিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্র সব পর্যায়েই। সমাজবিজ্ঞানী ও ব্যবস্থাপনা বিশারদ আব্রাহাম মাসলো তার চাহিদা সোপান তত্ত্বে এ বিষয়টিই দেখিয়েছেন।

যেসব জাতি/সম্প্রদায় তাদের জৈবিক/শারীরিক চাহিদা, নিরাপত্তামূলক চাহিদা ও সামাজিক চাহিদা পূরণে সক্ষম তাদের দ্বারাই সংস্কৃতির সেবা করা সম্ভব। আর সেই সূত্রের বিচার করলে দেখা যায়, সমৃদ্ধ জাতিই তাদের নববর্ষ অনেক আগে থেকেই পালন করে আসছে। তবে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে ওই কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়নি। গুটিকতক অভিজাত ও বিত্তশালীর মধ্যেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে। মাসলোর চাহিদা সোপানে তত্ত্বের আলোকে এখনো বাংলাদেশের ৮০ ভাগ লোকের কাছে নববর্ষ পালনের তাগিদ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। তিন কোটি বেকার, প্রায় নয় কোটি দরিদ্র লোকের প্রাথমিক স্তরের চাহিদাই পূরণ হয়নি, সেখানে নববর্ষে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আশা করা দুরূহ।

পৃথিবীর মানবম-লীর বিভিন্নমুখী প্রয়োজনে আসছে সময় গণনা করার রেওয়াজ। দিন, মাস ও বছরের হিসাব। ইংরেজি ক্যালেন্ডার শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষা থেকে। লাতিন শব্দটির অর্থ হিসাব বই আর আরবি শব্দ ‘আলমানাক’, যার বাংলা অর্থ দিনপঞ্জিকা। মিসরীয় পঞ্জিকাই হলো প্রাচীন পঞ্জিকা। হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনা গমন সময় থেকে হিজরি সন, যিশুখ্রিস্টের জন্ম থেকে খ্রিস্টাব্দ, সেভাবে মধ্যযুগে সম্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা সনের উদ্ভব। প্রচলিত নিয়মের ব্যর্থতাই নতুন নিয়মের তাগিদ করে, তেমনি চলতি বছরের হতাশা আর আশাভঙ্গের বেদনাই নতুন বছরকে আকর্ষণ করে নতুন কিছু পাওয়ার আশায়।

যেভাবে বাংলা নববর্ষ শুরু : পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সন বা নববর্ষ পালনের সঠিক ঘটনা জানা গেলেও বাংলা নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো ইতিহাস পাওয়া যায়নি। ইংরেজি ১৫৫৬ সালে পিতা হুমায়ুনের মৃত্যুর পর ১৩ বছর বয়সে আকবর বৈরাম খানের তত্ত্বাবধানে সিংহাসনে বসেন। শাসনকাজ এবং কর আদায়ের সুবিধার্থে আকবর বাংলা নববর্ষের প্রচলন করেন বলে জানা যায়। কৃষিপ্রধান অর্থনীতিতে কৃষকের জীবন ও জীবিকাকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের মৌসুম হিসেবে পহেলা বৈশাখ গুরুত্ব পায়। কারণ ওই সময় কৃষকের ঘরে আসে ফসল। ফসল বিক্রি করে রাজার খাজনা পরিশোধ করা সম্ভব। সেই বিবেচনায় ফসলের মৌসুমকেই নববর্ষ হিসেবে পালন শুরু করেন সম্রাট আকবর। শাসক তার করের টাকা উসুল করে, ব্যবসায়ী শ্রেণি কৃষকদের কাছ থেকে তাদের পাওনা আদায়ের জন্য শুরু করে হালখাতা। হালখাতার অর্থ নতুন খাতা। পুরাতন বছরের পাওনা পরিশোধ করে নতুন বছরে আবার নতুন করে লেনদেন শুরু হয়। পুরাতনের বিদায় আর নতুনের গ্রহণের মধ্য দিয়ে শাসক/দোকানির পাওনা উসুল হচ্ছে, দেনাদারের দেনা কমছে, সেই সঙ্গে শোষণের ঘটনাও ঘটছে। অত্যাচারী শাসক, মুনাফালোভী ব্যবসায়ী/সওদাগর আর সুদখোর মহাজনের কাছে নববর্ষ আশীর্বাদ হলেও দায়গ্রস্ত সাধারণ মানুষের কাছে কি কম দুঃখ আর নির্যাতনের? পুরাতন বছরের বিদায় আর নতুন বছরের আগমনে শাসকের কর আর ব্যবসায়ীর দেনা পরিশোধ যে কৃষকের বাড়ি, মাঠের জমি এবং হালের বলদ বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছে নববর্ষ তাকে কোনো আশার বাণী শোনাবে? না খোলাবাজার/মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো বলবে, প্রতিযোগিতা করে টিকে থাক। প্রতিযোগিতারও তো একটা নিয়ম আছে। ৩৮০ ডলারের মাথাপিছু আয় নিয়ে ২৮ হাজার ডলার আয়ের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কোনো বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য? একই নববর্ষ শুধু আনন্দের নয়, বেদনারও বটে। জমিদারের পাওনা আদায়ে কৃষকের বাড়িতে বাঁশগাড়ি; কৃষকের আদরের সন্তানের একমাত্র শখের জিনিস একটা কাঁসার থালা তার কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেওয়ার ঘটনা তো ওই নববর্ষের সঙ্গেই জড়িত। পহেলা বৈশাখ বরণের লক্ষ্যে চৈত্রের সমাপনী দিনে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় তাদের মোকাম/ব্যবসালয় ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করে, যেন অতীতের গ্লানিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে নতুন বছরকে বরণ করছে। তাই তো কবি লিখেছেনÑ ‘এসো হে বৈশাখ।’ নববর্ষে সবাই পাওনা পেয়ে আনন্দিত। কিন্তু যে কৃষক, শ্রমিক, রাষ্ট্রের নাগরিক রাষ্ট্রের সব পাওনা পরিশোধ করল, সেই জনতা কী পেল? তার হালখাতা কবে, নববর্ষই বা কবে? সে খবর কী আমরা রাখি? রাষ্ট্রীয় নীতিমালা অনুসরণ, কর-খাজনা প্রদানের বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে জনতার পাওনা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার দাবি কি বাস্তবায়িত হয়েছে? তাদের পাওনা আদায়ের হালখাতা কবে হবে? আমরা হয়তো বিষয়টা কোনো দিনই ভাবি না। পুরাতন বছরের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কি আমাদের মানসিক জরাজীর্ণতা ও স্বার্থপরতা আর কুসংস্কারকে বিদায় দিতে পেরেছি? মুখে বলতে পারলেও অন্তরে অনেকেই বলতে পারবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ মানুষের অধিকার পূরণ হয়নি, তাদের হালখাতাও আসেনি, তবু প্রচলিত নববর্ষ ও হালখাতার পার্বণের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত ছিল, আজও আছে। এ ধরনের পার্বণে আজকের মতো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না ঠিকই; কিন্তু কৃত্রিমতাও ছিল না। যতটুকু হতো সেটা আন্তরিকতার মাধ্যমেই হতো। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে যাত্রাপালা, দুহে ও জারি-সারি গান, বিয়ে-খতনাতে মেয়েদের কোরাসগীত সেকালে যেভাবে ছিল, এখন আর সেভাবে নেই। নতুন ফসল ঘরে ওঠানোর পর নবান্নের উৎসব, পায়েস বিতরণ হতো, গ্রামগঞ্জে হতো লাঠিখেলা, লরিখেলা, হা-ডু-ডু আর দাঁড়িয়াবান্দা খেলা। আর আড়ং বসত গ্রামের হাটবাজারে। মিলন ঘটত দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষের। সেখানে আজ এমনটা দেখা খুবই কঠিন। তবে বাঙালি শহুরে সভ্যতার শহরকেন্দ্রিক বাংলা নববর্ষ/পহেলা বৈশাখ পালনের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। কয়েক দশক আগেও এর হদিস ছিল না। শহুরে বণিক ব্যবসায়ীদের পাওনা আদায়ের প্রয়োজন থেকেই এ উৎসবের জন্ম। তবে বৈশাখী উৎসবের চরিত্র আগের মতো আর নেই। আসলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকশিত হয় না। যদিও ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে ধরনের একটা পরিবেশের স্বপ্ন বাঙালিরা দেখেছিল, কিন্তু সেটাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রাচীনকালে বাংলা ভাষার উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় এবং সমাজের এলিটদের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি, বরং বাংলাকে পাখির ভাষা বলে অনেকেই উপহাস করেছে। বাংলা ভাষা ব্যবহারের কারণে বর্ণ অভিমানী ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে নরক বাসের ফতোয়া এসেছে। এ ধরনের বাধার মুখে বাংলা ভাষার প্রাণশক্তি নিহিত ছিল গণ-সম্পৃক্ততায় এবং হিন্দু মুসলিম সবার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের কারণে। সে সময় এ অঞ্চলে ধর্মভিত্তিক সাম্প্র্রদায়িকতা ছিল না বললেই চলে। ব্রিটিশরাই প্রথম এ ভূখ-ে তাদের প্রয়োজনেই ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়। যেটা ভাষার ওপর পড়ে। বলা হয় বাংলা হিন্দুদের ভাষা। অধিকাংশ লোককে শেখাতে লাগল হিন্দুদের ভাষা হবে সংস্কৃতি আর মুসলিমদের জন্য উর্দু। বাংলা মুসলমানের ভাষা নয়। এ অভিযোগে পাকিস্তান আমলে জাতীয় সম্প্রচার রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানি সংবিধানে মুসলিম ছাড়া অন্যরা শাসক হতে পারবে না এমনতর সাম্প্রদায়িক নীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করা হলো। বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুতে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার চক্রান্ত হলো, বাঙালিরা সেই চক্রান্ত প্রতিরোধ করে বিজয়ী হলো। ১৯৭১ সালে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করলেও পরে সেটাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব বাংলাদেশে ছিল, এখনো আছে। তবে এদের কোনোটাই ভাষা, স্বাধীনতা, বিজয় আর পেেহলা বৈশাখের মতো সর্বজনীন নয়। কিন্তু সংবিধানের ৫ম ও ৮ম সংশোধনীর মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণরসকে নিঃশেষ করে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেওয়া হলো এবং সেটা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বাংলা সংস্কৃতিকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমাবর্ষণ, বাংলাকে ধর্মীয় মোড়কে বিশেষণের মৌলবাদী চক্রান্ত, অন্যদিকে শাসক মহল ও তাদের সেবাদাস বুদ্ধিজীবীরা দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী কাজে ইন্ধন জুগিয়েছে। Ñবাঙালির চিরাচরিত পোশাক ছেড়ে জন্মদিনের পোশাকে বনেদি সাজার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আবার পহেলা বৈশাখের দিন পান্তা-ইলিশ খেয়ে এবং বাঙালি পোশাক পরিধান করে খাঁটি বাঙালি সাজার নাটক করছে। বাঙালির জীবনবোধের সংস্কৃতিকে ত্যাগ করে শুধুই এক দিনের পান্তা-ইলিশ আর র‌্যালিতে বাঙালিত্ব রক্ষা পাবে না। বাংলা ভাষা এখন পৃথিবীর প্রধান ১০টি ভাষার মধ্যে সংখ্যা বিচারে চতুর্থ স্থানে, এটা কম কথা নয়। ভাষার জন্য জীবনদান পৃথিবীতে বাঙালিদের ক্ষেত্রেই ঘটেছে, যদিও সেই জীবনদান ব্যর্থ হয়নি। ৮ ফাল্গুনের সেই ঘটনার আলোকে আজ পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সূত্রপাত ঘটেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজও রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিশ্চিত হয়নি। শিক্ষা, চিকিৎসা, আদালতসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এখনো বাংলা অনুপস্থিত। বাংলাকে নিয়ে গবেষণা ও বিকাশ ত্বরান্বিত হওয়া দরকার। নববর্ষের এই লগ্নে এই প্রতিজ্ঞা হোক সব বাঙালির।

"