পহেলা বৈশাখের পান্তা ইলিশ

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইলিশ মাছ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশ এরই মধ্যে ভৌগোলিক নিবন্ধনও পেয়েছে। বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। দিনে দিনে এই ইলিশ উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে।

বাংলা নববর্ষে পান্তা ইলিশ খাওয়ার প্রচলন আগে একেবারেই ছিল না। এর সঙ্গে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির কোনো সংযোগও নেই। বাংলা নববর্ষ সৌরপঞ্জিকা অনুসারে প্রবর্তিত হয়। এই এলাকায় পান্তা ভাত সব সময়ই কৃষকের কাছে পরিচিত খাবার। এর সঙ্গে বিভিন্ন শাকসবজি ও শুঁটকি ভর্তা ছিল খাবারের তালিকায়। কিছু এলাকায় কচুশাকের ডাঁটা মিশিয়ে রূপচাঁদা মাছের শুঁটকির প্রচলন বেশি ছিল বলে জানা গেছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলা নববর্ষ উৎসবের দুটি দিক আছে। প্রথমটি আবহমান বাংলায় ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সামাজিক রীতি। অন্যটি ৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন। রমনা পার্ককে ঘিরে শুরু হলেও বর্তমানে যার বিকশিত রূপ সারা বাংলাদেশ এবং বিশ্বে প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।

নববর্ষে পান্তা ইলিশ খাওয়া প্রসঙ্গে ছায়ানটের সভাপতি ও রবীন্দ্র-গবেষক সনজীদা খাতুন মন্তব্য করেন ‘একসময় আমাদের অনুষ্ঠানস্থলের (ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন) আশপাশে অনেক দোকান বসত। সেখানে পান্তা ইলিশ খাওয়ানো হতো। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এসব দোকান দিত। দোষটা এসে চাপে আমাদের ঘাড়ে। অথচ গ্রামের হালখাতার নববর্ষ আর রমনার নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা হচ্ছে বাঙালির নবজাগরণ। যারা বোঝেন না, তারা এ নিয়ে বিদ্রƒপ করেন। পত্রপত্রিকায় উপসম্পাদকীয়ও লেখেন। এসব কথায় কখনো কান দিইনি। নববর্ষ উদ্যাপনে পান্তা ইলিশ খেতে হবে এমনটা কখনো দেখিনি, শুনিওনি। কারণ গ্রামের মানুষ এ সময় কাঁচা লঙ্কার সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে অথবা শুকনো মরিচ পুড়িয়ে পান্তা ভাত খায়। সেখানে ইলিশ থাকে না। ইলিশ তো খুব দামি মাছ। এটা গ্রামের মানুষ কোথায় পাবে?’

মানিক বন্দ্যোপাধায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস ইলিশ ধরা জেলেদের জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে। উপন্যাসের চরিত্রে কুবের ও অন্য জেলেদের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনার বিষয়টি উঠে এসেছে। ঋতুভিত্তিক সামাজিক অবস্থাও ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। কিন্তু পুরো উপন্যাসের কোথাও বৈশাখ মাসে নববর্ষ পালনের জন্য ইলিশের জোগান দেওয়ার কথা লেখা হয়নি।

লোক গবেষক শামসুজ্জামান খান মনে করেন, ‘বৈশাখে খরার মাসে যখন কোনো ফসল হতো না তখন কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকত না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদ্যাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করত। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুব ছোট আকারে। কৃষানি আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখত, চাল ভিজিয়ে রাখত। সকালে কৃষক সেই চাল পানি খেত এবং শরীরে কৃষানি পানিটা ছিটিয়ে দিত। তারপর সে হাল চাষ করতে যেত। দুপুর বেলায় পান্তা খেতে পারত কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো একটু শুঁটকি, একটু বেগুন ভর্তা ও একটু আলু ভর্তা দিয়ে খেত।’

যতটুকু জানা যায়, ৮০-এর দশকে রমনাকে কেন্দ্র করে নববর্ষে কিছু খাবারের দোকান বসে। যারা ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে যেতেন তারা সেখানে খেয়ে নিতেন। এমনই একবার অল্প কয়েকজন মিলে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা বিক্রি করলেন এবং তা সব বিক্রি হয়ে গেল। কয়েকজন বেকার তরুণ এই কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের উৎসাহিত করতে এবং ‘নতুন একটা কিছু প্রবর্তন’ করার মানসিকতা নিয়ে একটি গ্রুপের প্রচারণা চালাতে লাগলেন। যাদের মধ্যে দু-একজন গণমাধ্যমকর্মীও ছিলেন। বিষয়টা আর কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুনাফালোভী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে বৈশাখের অনেক কিছুই করপোরেটদের দখলে চলে যায়।

করপোরেট সংস্কৃতি সবকিছুকেই পণ্য বানাতে চায়। সেজন্য তারা উপকরণ খোঁজে। পান্তা ইলিশ হয়ে যায় সেই উপকরণ। বৈশাখী খাবারের ব্র্যান্ডে পরিণত হয় পান্তা ইলিশ। মিডিয়ায় ইলিশের নানা পদের রেসিপি, বিজ্ঞাপন, নাটক, সামাজিক অনুষ্ঠানসহ সবখানে এমনভাবেই বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের সংযোগ ঘটানো হয় যে, মনে হয় পান্তা ইলিশ ছাড়া বৈশাখের কোনো মানে নেই। যার প্রভাব পড়ে আর্থসামাজিক পরিম-লে। ইলিশের চাহিদা কেবল বাড়তেই থাকে। এক হালি ইলিশের দাম ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়! ইলিশ বলতে নির্বিচারে জাটকা নিধন শুরু হয়।

দেশে বছরজুড়ে যত জাটকা ধরা হয় তার অন্তত শতকরা ৬৫ ভাগ মার্চ এপ্রিল মাসে নিধন হয়। তা কেবল এই বৈশাখকে কেন্দ্র করে। এ সময় মা ইলিশের ডিমসহ নিধন কেবল একটি মাছ নয়, লাখ লাখ ভবিষ্যতের ইলিশকেও ধ্বংস করা হয়।

সামাজিক এই অনাচারের প্রতি প্রথম নীরব প্রতিবাদ জানায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। ২০১৩ সালে এই সংগঠনের সদস্যরা বৈশাখে ইলিশ বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা ইলিশের বিকল্প হিসেবে বাজারে সুলভ তেলাপিয়া মাছকে বেছে নেন এবং পান্তার সঙ্গে তেলাপিয়া মিলিয়ে ‘পান্তাপিয়া’ নাম দিয়ে সদস্যদের হাজার হাজার পরিবার নববর্ষকে বরণ করেন। প্রতি বছর তারা নববর্ষে ইলিশ বর্জন করে পান্তাপিয়া দিয়েই উৎসব পালন করছেন। যা অনেকের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পরবর্তীতে সুধী সমাজ, মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হন। এ বিষয়ে কবি আসাদ চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। তবে বর্ষবরণে পান্তা ইলিশ কোনোভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়। এ সময়টা ইলিশ সংরক্ষণের সময়। বৈশাখ উপলক্ষে কিছু লোক পয়সার গরম দেখানোর জন্য চড়া দামে ইলিশ কিনছে, কিছু লোক সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করছে; এরা আত্মসম্মান বোধহীন বাঙালি।’

 

"