স্বাধীনতা : মুক্তির আনন্দ

প্রকাশ | ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মৃধা আলাউদ্দিন

কখনো কখনো গৎবাঁধা পরিপাটি সুন্দর জীবনেও মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে। ক্লান্তি আসে তারুণ্যভরা জীবনের সুন্দর সন্ধ্যায়। কিন্তু এটা কখনো মানুষের কাম্য হতে পারে না। মানুষ এমনটা চায়-ও না। মানুষ শান্তির সুবাতাসে অবগাহন করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। মানুষ ভাসতে চায় তারুণ্য, মুক্তির আনন্দ বা স্বাধীনতার রৌদ্দুরে...। যেমন সৈয়দ কামারুজ্জামান লিটন ঢাকার একটা ফাইভ স্টার হোটেলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। রুটিনমাফিক জীবনÑ অফিস-বাসা। বাসা-অফিস। ব্যাচেলর জীবন বলে অগোচালোও কম নয়; কখনো ভোরে উঠে ব্যায়ামের জন্য চলে যায় রমনায়। কখনো নাক ডেকে ঘুমায়। কখনো নিজে বাজার করে। রিকশায় ঘোরে জিগাতলা থেকে শান্তিনগর, হাতিরঝিল। না, তারপরও লিটনের কষ্ট। এক-দুটা মাস ধরে তার এ অস্থিরতা কমছে না। কোথায় যেন অভাব, কোথায় যেন অপূর্ণতা। কোথায় যেন স্বাধীনতাহীনতায় ভুগছেন তিনি। আর অমনি সিদ্ধান্ত নিলেন কমপক্ষে এক সপ্তাহের জন্য ঢাকার বাইরে মাটির টানে বের হয়ে যাবেন। যেই ভাবনা, সেই কাজÑলিটন বের হয়ে গেলেন গাজীপুর কালীগঞ্জের পারাবর্থায়। তার খালার বাসায়, যেখানে তার ছেলেবেলার তারুণ্যেভরা কয়েকটি বছর কেটেছে।

২.

পড়ন্ত বিকেলের সোনালি আলো আচড়ে পড়ছে লিটনের চারপাশে। দূরদিগন্তে চেয়ে আছে লিটন। ভালো করে দৃষ্টি নিবন্ধ করলে দেখা যায় কাঁচকুড়া, পলাইশার খালবিল, তিলোত্তমা ঢাকার শেষাংশ। তুরাগ বা বালুনদী। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেন লিটন। যেন মাটির সোঁদা গন্ধে ভরে ওঠে লিটন-লিলির তনু দুটি দেহ। লিলি লিটনের কাজিন। মাকে হারানোর পর পৃথিবীতে এ একটি মাত্র জায়গা যেখানে আসলে লিটনের মনে হয় সে স্বাধীন আকাশে ওড়া মুক্ত বিহঙ্গ। নীল আকাশের নিচে মেঠোপথে দাঁড়িয়ে অসম্ভব সুন্দর এ জীবনটাকে আরো বেশি ভালোবাসতে চায় লিটন। সে এখন সোনালি ডানার গাঙচিল...

৩.

প্রথম শ্রেণির একটা জাতীয় দৈনিকের ফটো সাংবাদিক রাফি রাইন ওরফে রাফি। তার কাছে তারুণ্যভরা মুক্তির আনন্দ বা স্বাধীনতা মানে মাথা উঁচু করে নিজের ইচ্ছার কথাটা সবাইকে জানানো। রাফি বলেন, জীবনের শুরুতেই পরিবারের সঙ্গে পড়াশোনার বিষয় নিয়ে আমার দ্বিমত ছিল। কেননা, আমি ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিলাম নিজের পছন্দমতো। আমি সব সময় মনে করি এটা আমার অধিকার। তাই মোটামুটি জোর করেই বেছে নিয়েছিলাম নিজের পথ। আজ এত দিন পর আমার সিদ্ধান্তে পরিবারের সবাই খুশি! কিন্তু তখন যদি স্বাধীনভাবে নিজের মতপ্রকাশ না করতাম, হয়তাে পরাধীনতার শিকল ভেঙে বের হতে পারতাম না। আমার সামনের পথ হতো স্বাধীনতাহীন, কষ্টের ভারবাহী পাথর। রাফি সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের কখনোই উচিত হবে না সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করা। কিন্তু দেশের একচেটিয়া কিছু কিছু বড় ব্যবসায়ীÑযারা বিজ্ঞাপন দিয়ে খবরের কাগজ বাঁচিয়ে রাখতে চান, তারা সব সময় নানাভাবে সংবাদপত্রকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করেন, যা ঠিক নয়। তবে এটাও সত্য, অবাঞ্ছিত বিধিনিষেধের এই বেড়াজালের মধ্যেই আমাদের অধিকার আদায়ের জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আমরা করি।...

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অপব্যবহার রোধের আরেকটি বড় উপায় দায়িত্বশীল জনমত তৈরি করা। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ দ্বারা এই দায়িত্বশীল জনমত তৈরি সম্ভব নয় বলেই তার দৃঢ় বিশ্বাস।

তিনি আরো বলেন, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করলে জাতীয় চেতনার একটি বড় অংশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। জনগণ সত্য চায়। রটনা নয়, আসল ঘটনা জানতে চায় দেশের মানুষ। একই সঙ্গে তিনি সময়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে আরো বলেন, ‘সময়’ সংবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে সত্যনিষ্ঠতা তার চেয়েও মূলবান।

আরেক ফটো সাংবাদিক অভি সবুজ বলেন, আমি মনে করি স্বাধীনতা শব্দটার ব্যাপ্তি অনেক, এটাকে নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়; জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছাটা স্বতঃস্ফূর্ত থাকা জরুরি। জীবনকে স্বাধীনভাবে দেখার সুযোগ সব সময়ই রয়েছে বলে সবুজ মনে করেন। তাই ক্যারিয়ার তৈরির ক্ষেত্রে সে বেছে নিয়েছিল নিজের পছন্দ অনুযায়ী সৃজনশীল সুন্দর কাজ। পেয়েছিলেন হেল্পফুল সুন্দর সহকর্মী ও সিনিয়র। আসলে নিজের মতো করে জীবনযাপনের স্বাধীনতা থাকা চাই সবারই।

কেবল চাকরি, পড়াশোন নয়; বিয়ে অর্থাৎ জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও মুক্তির আনন্দ বা পূর্ণ স্বাধীনতা চান এ প্রজন্মের আরেক প্রতিনিধি, সাংবাদিক মুবাশ্বির মুবিন। মুবিন বলেন, বেশির ভাগ বাবা-মা মনে করেন জীবনসঙ্গী বাছাই করার মতো পরিপক্বতা এখনো আসেনি আমাদের সন্তানের। কিন্তু এটা একেবারেই ঠিক নয়; কেউ যদি সাফল্যের সঙ্গে পড়াশোনা, চাকরি ও পথ চলতে পারেÑ তবে সে পছন্দের মানুষকেও সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে পারবে। মুবিন আরো বলেন, মুক্তির আনন্দ বা স্বাধীনতা মানুষের মনকে নাড়া দিতে পারে। স্বাধীনতা এত দ্রুত পরিসরে মানুষের মনকে নাড়া দিতে পারে, যা আর কিছুতেই সম্ভব নয়। স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয় মানব মনের সব আকুতি। স্বাধীনতা না থাকলে মানুষের মন আর যন্ত্রের পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যেত। শুধু মুক্তির আনন্দ বা স্বাধীনতার তুলিতে মানুষের হৃদয়ের চিত্রাঙ্কন করা সম্ভব। কেননা, স্বাধীনতা ছাড়া মানুষের মনকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আর কিছুতেই নেই। যে মানুষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে থাকে সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে না, স্বাধীনতার সুনীল-শুভ্র আকাশ সে দেখতে পারে না। মুক্ত হৃদয়ে প্রতিনিয়ত যে গান বেজে চলছে, তা তারুণ্যেভরা, মুক্তির আনন্দ বা স্বাধীনতারই জয়গান।

কলেজস্টুডেন্ট জাকারিয়া জনির মতে, ‘স্বাধীনতার তীব্র আনন্দ প্রকাশ করার জন্য দুটি রং-ই যথেষ্ট। আর সেটা হলো আমাদের পতাকার লাল-সবুজ রং। লাল-সবুজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মুক্তির নতুন স্বাদ, স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। যে পতাকার বুকে জাতি এঁকেছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন, যে পতাকার অধিকার আদায়ের জন্য যুদ্ধ করেছে লাখো মানুষ এবং আমরা স্বাধীন হয়েছিÑএর চেয়ে বড় আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না। একমাত্র মুক্তির আনন্দ বা স্বাধীনতাতেই মানবাত্মা খেলা করে এবং তার আনন্দ উপভোগ করে।

৪.

সাংবাদিকতায় বাধা-বিপত্তি ও স্বাধীনতা-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে স্টাফ রিপোর্টার (ক্রাইম) ইমরান রহমান বলেন, প্রথম প্রথম সাংবাদিকতায় আসলে স্বাধীনতা নয়, মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। কারণ, চ্যালেঞ্জিংয়ে পেশায় কখন কি নিউজ সামনে এসে পড়ে তার ঠিক নেই। তবে প্রথম এক-দুই মাস পার করাটাই বড় চ্যালেঞ্জিং। এ কাজে প্রথম স্বাধীনতা নয় বাধা হয়ে দাঁড়াবে ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়াটা। পেলেও কাজের শুরুতে সবাইকে মানিয়ে নেওয়াটা বড় ফ্যাক্ট। এরপর শুরুতেই সব কিছু নতুন। সুতরাং কোনো বিটে কাজ করতে চাই, কাজের স্বাধীনতা না থাকলে কখনোই কাজে মনোযোগ আসবে না। সোর্সের অভাবে সব কাজকেই ভয় ভয় লাগবে। এমনকি সব জায়গায় অপরিচিত লোকজন থাকলে স্বাধীনতা নয়, ঘটবে আরো বিপত্তি। সিনিয়ররা হেল্পফুল না হলে কাজে স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যাবে না। আর স্বাধীনতা না থাকলে প্রতিটা কাজকেই বিপত্তি মনে হবে। তারুণ্য বা মুক্তির আনন্দ না থাকলে আমরা শত বাধা-বিপত্তি ঠেলে দিয়েও স্বাধীনতার সমুদ্রে গা ভাসাতে পারব না। স্বাধীনতার সমুদ্রে...।

যে মানুষ পরাধীনতা দেখেনি, যুদ্ধ দেখেনি তারা বুঝবে না মুক্তির আনন্দ বা স্বাধীনতার আসল স্বাদ কতটা তীব্র। কষ্টার্জিত এ স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব এখন শুধুই আমাদের। তাই এর অপব্যবহার করা কারোরই উচিত নয়। সেটা দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনে হোক, ব্যক্তিজীবনেই হোক। জীবনে পথ চলতে গেলে খানিকটা বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। স্বাধীনতার নামে এমন কিছু করা উচিত নয়, যেটা পরে মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে এর সঠিক প্রকাশের মাধ্যমে। ঝোঁকের বশে কোনো কিছু করতে পারাটাই স্বাধীনতা নয়; নিজের পাশাপাশি অন্যের প্রতিও শ্রদ্ধা রাখতে হবে। স্বাধীনতা মানে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ভালোবাসা, আর সে ভালোবাসা ও আনন্দের পরশ ছুঁয়ে বদলে দিতে হবে নিজের জীবন। অন্যের জীবন। স্বাধীনতা মানে উচ্ছলতায় মেতে ওঠা। স্বাধীনতা বা তারুণ্যেভরা মুক্তির আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক শহর ও গ্রামগঞ্জে। আকাশের ওপারে আকাশে। নতুন দিগন্তে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

"