করোনার ক্রান্তিকাল এলো যেভাবে

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

চিরচেনা কর্মমুখর পৃথিবী বড্ড অচেনা। রাস্তা-ঘাট ফাঁকা, মানুষজনের হুল্লোড় নেই, কল-কারখানার শোরগোল থেমে নিস্তব্ধ গোটা দুনিয়া। আতঙ্কের এক কালোছায়া যেন ভর করেছে সবার ওপর। এমন ক্রান্তিকাল আগে কখনোই দেখেই বিশ্ববাসী। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই অতি ক্ষুদ্র এক ভাইরাস কাবু করে ফেলেছে সবাইকে।

এ আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন অর্ধ লক্ষাধিক। অথচ শুরুর দিকে বিষয়টিকে কেউই তেমন পাত্তা দেয়নি। সে সময় একে তুলনা করা হচ্ছিল ২০০৩ সালের সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম) ভাইরাসের সঙ্গে, যাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন মাত্র ৮ হাজারের মতো মানুষ, এর বেশির ভাগই আবার এশিয়ায়। তবে করোনা অতটা করুণা করেনি। সে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। হাতে গোনা কয়েকটি বাদে প্রায় সব দেশেই হানা দিয়েছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। এটিকে ধরা হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে।

ডিসেম্বর ১, ২০১৯। এদিন চীনের উহান শহরের এক বাসিন্দার শরীরে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল করোনাভাইরাস। ১৬ ডিসেম্বর ওই ব্যক্তিসহ দুজন নিউমোনিয়া-আক্রান্ত রোগীর রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠান উহান সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তাদের শরীরে সার্সের মতো একটি ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়।

সে সময় হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের পরিচালক আই ফেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ল্যাব টেস্টের রিপোর্টটি শেয়ার করেন। পরে সেটি আরো কয়েকজন চিকিৎসকের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মিডিয়ায়। তবে তাদের কথাকে দাম দেয়নি চীনা প্রশাসন। বরং ওই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়।

তবে বছরের শেষ দিনে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রথমবারের মতো উহানের কয়েক ডজন মানুষ ‘রহস্যময় নিউমোনিয়ায়’ আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশ করা হয়। যদিও তখন এ বিষয়ে আর বেশি কিছু জানানো হয়নি। জানুয়ারির ৩ তারিখ থেকে সিঙ্গাপুর, হংকং ও তাইওয়ানÑ উহানফেরত যাত্রীদের শারীরিক তাপমাত্রা পরীক্ষা শুরু করে।

১১ জানুয়ারি সাংহাইয়ের একদল বিজ্ঞানী নতুন ভাইরাসটির জিনগত পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করে। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এর উপস্থিতি শনাক্ত করা সহজ হয়ে যায়। ১৩ জানুয়ারি করোনা আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্তের কথা জানায় থাইল্যান্ড। এর তিন দিন পরেই জাপানে একজন রোগী পাওয়া যায়। ওই সপ্তাহেই চীনের বেইজিং ও দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং প্রদেশে করোনাভাইরাসের হানা নিশ্চিত হয়। ২০ জানুয়ারি চীনের রোগ বিশেষজ্ঞ ঝং নানশান জানান, ভাইরাসটি মানুষের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ছে।

এরপর থেকেই শুরু হয় করোনা ঝড়। প্রশ্ন ওঠতে থাকে এর বিস্তার প্রতিরোধের পদ্ধতি নিয়ে। কিছুদিনের মধ্যেই চীন

বিভিন্ন কড়াকড়ি আরোপ করে। চীনা নববর্ষের মাত্র এক দিন আগে ২৩ জানুয়ারি লকডাউন করা হয় উহান শহর, বন্ধ করে দেওয়া হয় যান চলাচল, ঘরের বাইরে যাওয়ায় দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা। কোয়ারেন্টাইন নির্দেশনা বাড়তে থাকে আশপাশের শহরগুলোতেও, দেখতে দেখতে অবরুদ্ধ হয় গোটা হুবেই প্রদেশ।

৩০ জানুয়ারি করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একই সঙ্গে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি ও মহামারি ঠেকাতে সবাইকে এক হয়ে কাজ করার পরামর্শ দেয় সংস্থাটি।

১ ফেব্রুয়ারি চীনের বাইরে করোনায় প্রথম মৃত্যু হয় ফিলিপাইনে। এরপর থেকেই এশিয়া অঞ্চলে ভাইরাসটির সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। এ থেকে বাঁচতে সব স্কুল-অফিস বন্ধ ঘোষণা করে হংকং।

৫ ফেব্রুয়ারি জাপানে ৩ হাজার ৬০০ যাত্রী নিয়ে আটকে পড়ে বিশাল প্রমোদতরী ডায়মন্ড প্রিন্সেস। ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় সাগরেই কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয় জাহাজটিকে। এর ছয় শতাধিক যাত্রী আক্রান্ত হয়েছেন প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে। মারা গেছেন ছয়জন। দেখতে দেখতেই এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত দেশ হয়ে ওঠে দক্ষিণ কোরিয়া।

 

"