যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে নিলে তবেই মুক্তি!

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দেশের সুরক্ষা, স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টে সমন্বিত তৎপরতার অভিযোগ তুলে গ্রেফতার করা হয়েছিল সৌদি আরবের প্রখ্যাত আইনজীবী লুজাইন আল হাথলাউলকে। পরিবারের অভিযোগ, আটকাবস্থায় তার ওপর শারীরিক ও যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছে। স্বজনরা দাবি করছেন, লুজাইনকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ভিডিওতে হাজির হয়ে তাকে বলতে হবে, তার ওপর কোনো শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন করা হয়নি। তবেই তাকে মুক্তি দেওয়া হবে।

২৯ বছর বয়সি আইনজীবী লুজাইন নারীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের জন্য কুখ্যাত রাজত্বে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন। অভিভাবকের বিনা অনুমতিতে নারীদের ভ্রমণ, পাসপোর্ট প্রাপ্তি এবং সন্তান জন্মদান, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের নিবন্ধনের অধিকার সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কট্টর সমালোচক ছিলেন এই প্রখ্যাত আইনজীবী। ২০১৮ সালের এপ্রিলে সংযুক্ত আরব আমিরাত লুজাইনকে আটক করে সৌদি আরবের কাছে তুলে দেয়। একই বছর মে মাসে আরো ১০ অধিকারকর্মীর সঙ্গে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

লুজাইনের পরিবার বলছে, তাকে কারাগারে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার তার ভাই ও দুই বোন অভিযোগ করেছেন, লুজাইনের মুক্তির শর্ত হিসেবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের একটি সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে। ভাই ওয়াহিদ আল হাথলাউল বলেন, ‘তাকে এমন একটি দলিলে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে, যেখানে একটি ভিডিওতে লুজাইন হাজির হয়ে বলবে, তার ওপর কোনো নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। এটা তার মুক্তি চুক্তির অংশ।’ ওয়াহিদ টুইটারে লিখেছেন, সম্প্রতি কারাগারে রাজ্যের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আমার বোনের সঙ্গে দেখা করে এসেছে।

ওয়াহিদ আল হাথলাউল বলেছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাকে চুক্তিতে রাজি করাতে সম্প্রতি তিনবার কারাগারে গেছে। প্রথম দুবার কর্তৃপক্ষ তাকে আপত্তিকর অভিযোগ অস্বীকার করে দলিলে স্বাক্ষর করতে চাপ দিয়েছিল। তৃতীয়বার কারাগারে গিয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে ভিডিওতে হাজির হয়ে নির্যাতনের কথা অস্বীকার করতে আহ্বান জানানো হয়। তবে ওয়ালিদরা এটিকে বাস্তবসম্মত দাবি বলে মনে করেননি।

বোন লিনা হাথলাউল অভিযোগ করেছেন, অধিকারকর্মী লুজাইনকে এই চুক্তির ব্যাপারে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সে উদ্বিগ্ন এই চুক্তির প্রস্তাব প্রকাশ করা হলে তার বোনের জীবন বিপদগ্রস্ত হবে। তা সত্ত্বেও সে এটা গোপন করতে চায়নি। লিনা টুইটারে লিখেছেন, ‘লুজাইনকে নির্মমভাবে নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে।’

লুজাইনের আরেক বোন এলিনা কর্তৃপক্ষের দাবিগুলো মেনে নিতে তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এলিনা টুইটারে লিখেছেন, ‘চুক্তিটা মেনে নাও এবং যা ঘটেছিল তা অস্বীকার কর, এমনকি তোমার কথার অডিও এবং ভিডিওতে রেকর্ড করা হলেও। তোমাকে কাছে পাওয়াটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা আমরা তোমার শূন্যতা অনূভব করছি।’

লুজাইনের ভাই-বোনেরা সবাই দেশের বাইরে আছেন এবং তার মুক্তির জন্য প্রচার চালাচ্ছেন। তার ভাই আগেই বলেছেন, তার বোনকে বৈদ্যুতিক শক, বেত্রাঘাত ও প্রহার করা হয়েছে। কারাগারে ওই অধিকারকর্মীকে যৌন নির্যাতন এবং তার বিরুদ্ধে যৌন সহিংসামূলক ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে। হাথলাউলের বিরুদ্ধে রাজ্যের সুরক্ষা, স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক শান্তি নষ্টের জন্য সমন্বিত তৎপরতার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় আরো ১০ অধিকারকর্মীর সঙ্গে হাথলাউলের বিচার চলছে, যাদের মধ্যে সাতজন জামিনে মুক্ত রয়েছেন।

২০৩০ সাল নাগাদ তেল নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী করতে কর্মক্ষেত্রে ধাপে ধাপে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উচ্চাকাক্সক্ষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সৌদি আরব। দেশটির ৩২ বছর বয়সি যুবরাজ ওই পরিকল্পনার নেপথ্য ব্যক্তি বলে মনে করা হয়। তবে গাড়ি চালানো ও অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে অভিভাবকত্বের খড়গ দূর হলেও এখনো সৌদি আরবে নারীদের পুরুষ অভিভাবকত্ব ব্যবস্থা প্রচলিত। গত বছর মে মাসে লুজাইনের গ্রেফতার হওয়ার পর দেওয়া বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক সারাহ লিয়াহ হুইটসন বলেছিলেন, সৌদি আরবে যে প্রকৃত সংস্কারবাদীরা প্রকাশ্যে মানবাধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নের বলে এসেছেন; তাদের জন্য যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘সংস্কার প্রচারণা’ ভয়ের উন্মত্ততা তৈরি করেছে। হুইটসন বলেন, বার্তা খুবই পরিষ্কার। যুবরাজের অধিকার এজেন্ডা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেই জেলে যেতে হবে।

"