ভারতকে চাঁদ-মঙ্গলে পৌঁছে দেন গ্রামের দরিদ্র ছেলেটি

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ড. মিলস্বামী আন্নাদুরাই। ভারতের প্রথম সারির একজন মহাকাশ বিজ্ঞানী তিনি। মঙ্গল আর চন্দ্রাভিযানে ভারতের সফলতার পেছনে অবদান রয়েছে তার। অন্য ১০ জনের মতো শিক্ষার সুযোগ ছিল না তারও।

কখনো গাছের তলায়, কখনো মন্দিরের বারান্দায় আবার কখনো গোয়াল ঘরে ক্লাস করেছেন তিনি। শিক্ষাজীবনের প্রথম তিন বছরের এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ক্লাস শুরু হওয়ার আগে গরুর গোবর পরিষ্কার করতাম আমি। কিন্তু দুর্গন্ধ থেকে যেত।’

তাহলে কীভাবে প্রযুক্তি শিল্পের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেন তিনি? আন্নাদুরাইয়ের পায়ে পড়ার মতো কোনো জুতা ছিল না। আর তার গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছেছিল, যখন তার বয়স আট বছর। তবে দ্রুতই পরিবর্তিত হচ্ছিল পৃথিবী। ১৯৬০ সালের ওই সময়টাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার প্রতিযোগিতা গিয়ে ঠেকেছিলও মহাকাশ পর্যন্ত। ভারতও সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল এবং ১৯৬৩ সালের ২১ নভেম্বর প্রথম রকেট লঞ্চ করে দেশটি।

তবে এসবের কিছুই সাধারণ ভারতীয়দের জীবনযাত্রায় তেমন প্রভাব ফেলেনি। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর ছোট গ্রাম কোধাবাড়িতে বেড়ে উঠছিলেন আন্নাদুরাই। তার মতো ভারতের বেশির ভাগ মানুষ তখন শিল্প-পূর্ব যুগে বাস করছিলেন, যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ ছিল অপ্রতুল। তবে দরিদ্রতা পড়াশোনায় তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিজ্ঞান আর গণিত পছন্দ ছিল তার। আর ঘৃণা করতেন ইতিহাস।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা বলতেন যে, ইতিহাস তৈরি করতে হলে ইতিহাস পড়তে হয়।’

তার বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। আর সেলাইয়ের কাজ করে কিছুটা বাড়তি উপার্জন করতেন তিনি। পরিবারকে ভরণপোষণের জন্য তার আয় যথেষ্ট হলেও সঞ্চয় বলতে তেমন কিছুই থাকত না। একসময় তিনি ভেবেছিলেন, আন্নাদুরাই হয়তো উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগই পাবে না। কিন্তু হঠাৎ করেই জীবন বদলে দেওয়ার মতো সুযোগ পেয়ে যান কিশোর আন্নাদুরাই।

‘আমার বয়স যখন ১২ বছর, তখন রেডিওতে গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি এক বৃত্তির খবর শুনি আমি। আর আবেদনও করি’, বলেন আন্নাদুরাই। ওই বৃত্তি তার আর্থিক সংকট কাটিয়ে তাকে পাশের শহরের একটি ভালো স্কুলে ভর্তি হতে সহায়তা করে।

তিনি বলেন, ‘সে সময় আমার বাবা প্রতি মাসে ১২০ রুপি আয় করতেন। আর বৃত্তির অর্থ ছিল বছরে এক হাজার রুপি।’ ১৯৭০ সালে ১ ডলার সাড়ে ৭ রুপির সমান ছিল।

জেলার সেরা আর রাজ্যে ৩৯তম মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে স্কুল শেষ করেন তিনি, যা পরে তাকে আরো শিক্ষার খরচ জোগাতে সহায়তা করে।

আন্নাদুরাই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তির কিছুদিন আগে, ১৯৭৫ সালে রাশিয়ার সহায়তায় আরিয়াভাটা নামে নিজেদের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে ভারতীয় মহাকাশ সংস্থা।

স্যাটেলাইটের সংকেত গ্রহণের জন্য ব্যাঙ্গালুরুর বেশ কিছু শৌচাগারকে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্যকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। ৬ মাস চলার জন্য স্যাটেলাইটটির নকশা করা হয়েছিল। তবে এটি ঠিকভাবে কাজ করেছিল মাত্র ৪ দিন।

৪ বছর পর, স্যাটেলাইট বহনে সক্ষম ভারতের নিজেদের তৈরি একটি রকেট উৎক্ষেপণ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে আন্নাদুরাই ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা আইএসআরওতে যোগ দেন।

তিনি বলেন, ‘অ্যাসবেসটস শিটের নিচে আমরা কাজ করতাম। আর প্রতি চার বছরে মাত্র একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতাম।’ তামিলভাষী হওয়ার কারণে এবং ইংরেজি ও হিন্দিতে দুর্বলতা থাকায় যোগাযোগে বেশ অসুবিধার মুখে পড়তে হতো তাকে।

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় মানুষ আমার ইংরেজি শুনে হাসত।’ তিনি প্রথম যে স্যাটেলাইটটিতে কাজ করেছিলেন, সেটি পৃথিবী থেকে ৪০০ কিলোমিটার ওপর একটি কক্ষপথে পৌঁছানোর জন্য নকশা করা হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় সেটি বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয়।

শুরুটা খারাপ হলেও, ৮টি আইএনএসএটি বা ইনসাট স্যাটেলাইট অভিযানে কাজ করেছেন তিনি। ইনসাটস হলো ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তি। যেগুলো আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে শুরু করে ম্যাপিং এবং সম্প্রচারÑ সবই করত।

২০০৩ সালে, চন্দ্রাভিযান হাতে নেওয়ার আগে, একবার মহাকাশ সংস্থা ছেড়ে দিয়ে বেসরকারি খাতে লোভনীয় চাকরি করারও চিন্তা করেছিলেন আন্নাদুরাই।

 

"