একসময়ের শত্রু এখন স্বামী-স্ত্রী

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

গৌরি মালার আর রোশান জায়াথিলাকে তাদের ১১ মাস বয়সি মেয়ের সঙ্গে খেলা করতে দেখলে মনে হবে না যে মাত্র ১০ বছর আগেও একে অপরের শত্রু ছিলেন তারা।

২৬ বছর বয়সি গৌরি ছিলেন শ্রীলঙ্কার বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল টাইগার্সদের শিশু যোদ্ধা। তাদের মতে, যারা লড়াই করত রোশানের মতো মানুষদের দ্বারা সৃষ্ট অত্যাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘সিংহলিদের দেখা বা তাদের সঙ্গে কথা বলিনি আমি। আমরা ভাবতাম তারা খারাপ মানুষ এবং আমাদের হত্যা করবে।’

আর রোশানের জন্য বিদ্রোহীরা ছিল ঘৃণিত শত্রু। ২৬ বছর ধরে চলা যুদ্ধে যাদের বোমা হামলা প্রাণ কেড়ে নেয় নিষ্পাপ মানুষের। ‘আমরা একে অপরকে শত্রু ভাবতাম,’ বলছিলেন ২৯ বছর বয়সি রোশান। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখন আমরা সুখী দম্পতি। আমাদের মেয়ে আমাদের ভালোবাসার প্রতীক।’

তাহলে কোন পরিবর্তন তাদের এক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল? তারা এখন নিজেদের একটা বাড়ি তৈরি, একটা গাড়ি কেনা আর ছোট্ট সেনুলি চামালকাকে স্কুলে পাঠানোর স্বপ্ন দেখে।

শ্রীলঙ্কায় সহিংসতা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিদের একটা অংশের মধ্যে বাড়তি জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠার ক্ষোভে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হামলা চালিয়ে ১৩ সেনাকে হত্যা করে। এই ঘটনা তামিলবিরোধী দাঙ্গার জন্ম দেয়। যাতে প্রাণ হারায় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীটির কয়েকশ’ সদস্য।

গৌরির জীবনে যুদ্ধ ছিল নিয়মিত বিষয়ের মতোই। তবে এটা স্থায়ীভাবে বদলে যায় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। যখন গৌরি জানতে পারে, তার বড় ভাই শুভ্রমানিয়াম কান্নান ট্রাক্টর চালানোর সময় গোলার আঘাতে আহত হয়েছেন।

ভাঙা মন নিয়ে বড় ভাইকে খুঁজতে গিয়ে বিদ্রোহীদের হাতে অপহৃত হন তিনি। ১৬ বছর বয়সি গৌরিকে এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে পাঠায় তারা। ‘আমি দেখলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে মানুষ’, বলেন গৌরি।

তিনি বলেন, ‘আমার এক বান্ধবী বোমার আঘাতে আহত হয়। আমরা তাকে উঠানোর চেষ্টা করি। কিন্তু সে একটি সায়ানাইড ক্যাপসুল চিবিয়ে খেয়ে আত্মহত্যা করে। কারণ, তার ক্ষতগুলো এতই মারাত্মক ছিল যে বেঁচে থাকাটা তার কাছে নিরর্থক ছিল।’

‘আমাদের গোসল এবং খাবারের কোনো সুব্যবস্থা ছিল না। এক সময় আমার মনে হতে লাগলো যে বেঁচে থেকে লাভ কী?’ ২০০৪ সালে ১৪ বছর বয়সে যুদ্ধ তার থাবা বিস্তার করে রোশানের জীবনে।

বিচ্ছিন্নতাবাদী আর সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকার মাঝে অবস্থিত ভাবুনিয়া জেলায় রোশানের পারিবারিক গ্রামে হিন্দু নববর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে আঘাত হানে বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি বোমা। এর পরপরই বোমা হামলায় সামরিক-বেসামরিক মানুষদের মৃত্যুর ক্ষোভে বাবা আর চাচাত ভাই-বোনদের মতোই সরকারি নিরাপত্তা বিভাগে যোগ দেন রোশান। ‘আমরা প্রায় প্রতিদিনই হামলার খবর শুনতাম’ বলেন রোশান।

তিনি জানান, সংঘাতে নিজের এক ভাইকে হারান তিনি। ‘মানুষ ভীত ছিল। মারা পরার ভয়ে একসঙ্গে কোথাও ঘুরতেও যেত না কেউ।’

২০০৯ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এই সহিংসতায়। ২০১৫ সালে এক প্রতিবেদনে, অন্যায় হত্যাকা-ের জন্য দুই পক্ষকেই দায়ী করে জাতিসংঘ।

এতে বলা হয়, নির্যাতন আর ধর্ষণের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নিরাপত্তা বাহিনী। আর বয়স্ক ও শিশুদের জোর করে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেছে বিদ্রোহীরা।

প্রায় এক মাস যুদ্ধ করেছে গৌরি। হৃদযন্ত্রে ত্রুটি থাকার কারণে গৌরিকে মুক্ত করে দেন তার দলনেতা। এরপরেই শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে গৌরি।

সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচিতে পাঠানো আরো অনেক বিদ্রোহীদের সঙ্গে ছিলেন তিনি। বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব থাকলেও সিংহলিদের সঙ্গে মিশে গৌরি অনুভব করে যে, তারাও ‘মানুষ’। এরপর সরকারি নিরাপত্তা বিভাগে যোগ দেন তিনি।

উত্তরাঞ্চলে কিছু খামার প্রতিষ্ঠা করেছিল সরকার। আর উদয়নকাট্টুতে এ রকমই একটি খামারে পরিচয় হয় গৌরির হবু স্বামীর সঙ্গে।

২০১৩ সালে সেখানে নিয়োগ পান গৌরি। আর সেখানে এক বছর আগে থেকেই কাজ করছিলেন রোশান। তবে তামিল-ভাষী মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় বেশ ঝামেলায় ছিলেন তিনি।

"