অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতারে যুক্তরাষ্ট্রের হাত

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সাত বছর ধরে লন্ডনে ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নিয়ে থাকা উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই গ্রেফতার করেছে যুক্তরাজ্য। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক অ্যাসাঞ্জ ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ সামরিক ও কূটনৈতিক গোপন নথি ফাঁস করে দিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। আফগান ও ইরাক যুদ্ধ নিয়ে তার প্রকাশ করা নথিতে চরম বেকায়দায় পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও পেন্টাগন।

সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাদের রোষানলে পড়া অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের মামলা হয় সুইডেনে। গ্রেফতার এড়াতে ২০১২ সালে অ্যাসাঞ্জ লন্ডনে ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেন। তারপর থেকে তিনি সেখানেই ছিলেন। সুইডেনের সেই মামলার কার্যক্রম বন্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পড়ার ভয়েই এই দূতাবাস ছাড়ছিলেন না অ্যাসাঞ্জ। এর মধ্যে ইকুয়েডর সরকার তার ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ বাতিল করায় গত বৃহস্পতিবার সকালে দূতাবাসে গিয়ে ৪৭ বছর বয়সি অ্যাসাঞ্জকে ধরে নিয়ে আসে লন্ডন পুলিশ।

আদালতে হাজির না হওয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ওই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন অ্যাসাঞ্জ। এর জন্য তার এক বছরের সাজা হতে পারে। তবে ওই সাজা ঘোষণা হবে আগামী মাসে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বন্দি বিনিময় চুক্তি অনুসারে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গোপন তথ্য ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্ত তিনি। অভিযোগে বলা হয়েছে, অ্যাসাঞ্জ ২০১০ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট ইন্টারনেট প্রটোকল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত পররাষ্ট্র দফতরের কম্পিউটারে সংরক্ষিত পাসওয়ার্ড বের করতে চেলসি ম্যানিংয়ের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিলেন।

দোষী সাব্যস্ত হলে অ্যাসাঞ্জের পাঁচ বছরের সাজা হতে পারে বলে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে তাকে হস্তান্তরের বিষয়টি পররাষ্ট্র দফতর দেখছে বলে জানিয়েছে তারা। লন্ডনে ইকুয়েডরের এই দূতাবাস থেকে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করা হয়। লন্ডনে ইকুয়েডরের এই দূতাবাস থেকে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করা হয়।

লন্ডন পুলিশ প্রথমে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতারের কারণ হিসেবে আদালতে হাজির না হওয়ার অভিযোগের কথা জানালেও পরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধের কথা স্বীকার করেছে বলে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতারের পেছনে তাকে হস্তান্তরে ওয়াশিংটনের অনুরোধও কাজ করেছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেও পার্লামেন্টে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতারের খবর জানানোর সময় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তান্তরের অনুরোধের কথাও বলেছেন। অ্যাসাঞ্জকে ধরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বড় অঙ্কের ঋণ মওকুফ চেয়েছেন বলে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে। তবে প্রকাশ্যে অ্যাসাঞ্জের আশ্রয় বাতিলের কারণ হিসেবে ‘আন্তর্জাতিক আইন ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের নিয়ম লঙ্ঘনের’ কথা বলেছেন মোরেনো।

২০১৭ সালে ইকুয়েডরের ক্ষমতায় আসা মোরেনোও উইকিলিকসের সত্য প্রকাশের শিকার হয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে উইকিলিকস এক গুচ্ছ গোপন নথি ফাঁস করে যেখানে মোরেনা ও তার পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতি ও মুদ্রাপাচারের তথ্য বেরিয়ে আসে। এদিকে এক মাস আগেই মোরেনোর নেতৃত্বাধীন ইকুয়েডর সরকারকে ৪২০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন দেয় ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ।

অ্যাসাঞ্জের বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট মোরেনোর তুমুল সমালোচনা করেছেন ইকুয়েডরের সাবেক প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়া। ২০১২ সালে অ্যাসাঞ্জকে আশ্রয় দেওয়ার সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন কোরেয়া। ‘লেনিন মোরেনো ইকুয়েডর ও ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক’ টুইটে লিখেছেন তিনি।

অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী পামেলা অ্যান্ডারসন। বে-ওয়াচ তারকা অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারকে ‘জঘন্য অবিচার’ আখ্যায়িত করেছেন। টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘তুমি কিভাবে পারলে ইকুয়েডর? তুমি কিভাবে পারলে যুক্তরাজ্য? ও তুমি আমেরিকার ‘বিচ’ এবং তোমার ব্রেক্সিট থেকে নজর সরানো দরকার।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘বিষাক্ত’ বলেও তার বিষোদগার করেছেন তিনি। এর মধ্যে দিয়ে অ্যাসাঞ্জ যে সব সময় তাকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করা হবে বলে আশঙ্কা করতেন, তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর না করতে যুক্তরাজ্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে করা সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস। তাকে হস্তান্তর করা হলে তা সাংবাদিক, সত্য প্রকাশকারী ও সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট অন্যদের জন্য ভয়ানক নজির তৈরি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে তা ব্যবহার করবে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছে তারা।

অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য এক অন্ধকার অধ্যায় আখ্যায়িত করেছেন এডওয়ার্ড স্নোডেন, যিনি নিজেও যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নথি ফাঁসের পর রাশিয়ায় স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছেন। অ্যাসাঞ্জের অধিকার লঙ্ঘিত হবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ। এদিকে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতারের পর ইকুয়েডর দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেছেন তার সমর্থকরা। অ্যাসাঞ্জকে পুলিশ স্টেশন থেকে আদালতে নেওয়ার সময় হাতকড়ার মধ্যে বুড়ো আঙুল ঢুকিয়ে বিক্ষোভ দেখান কয়েকজন। তারা বলছেন, ওয়াশিংটনের জন্য অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ইকুয়েডর এবং এর মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কালো অধ্যায় রচিত হলো। বাক স্বাধীনতার কথা বলা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে আনায় অ্যাসাঞ্জকে নায়ক হিসেবে দেখেন বহু মানুষ। এদিকে তাকে গ্রেফতারের পর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন, ‘জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নায়ক নয়, সে বছরের পর বছর সত্য থেকে লুকিয়ে ছিল।’ আর দেশটির প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছেন, অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে ‘যুক্তরাজ্যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়’।

এদিকে সুইডেনের একজন আইনজীবী বলেছেন, অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আবার মামলা সচল করার উদ্যোগ নেবেন অভিযোগকারী নারী। তবে দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও এনজিও ভিকটিম সাপোর্ট সুইডেনের চেয়ারম্যান বিবিসিকে বলেছেন, এটা কঠিন হবে বলেই তিনি মনে করেন। গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানিয়ে সাংবাদিকদের সামনে ইউলিকস সম্পাদক ও অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী। অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরের অনুরোধের বিপক্ষে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন উইকিলিকসের আইনজীবী জেনিফার রবিনসন।

তিনি বলেছেন, এটা ‘ভয়ানক নজির’ তৈরি করবে যে যুক্তরাষ্ট্র সংক্রান্ত সত্য তথ্য প্রকাশের জন্য যেকোনো সাংবাদিককে সে দেশে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। রবিনসন জানান, পুলিশ হেফাজতে থাকা অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে তার। সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেছেন, ‘আমি এটাই বলতাম।’ ইকুয়েডার দূতাবাস ছাড়লে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করা হবে বলে একাধিক বলেছিলেন অ্যাসাঞ্জ।

অস্ট্রেলিয়ার কম্পিউটার প্রোগ্রামার অ্যাসাঞ্জ ২০০৬ সালে উইকিলিকস প্রতিষ্ঠা করেন। চার বছর পর ইরাকে মার্কিন সৈন্যদের হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে বেসামরিক মানুষ হত্যার ভিডিও প্রকাশ করে সংবাদ শিরোনাম হয় এই ওয়েবসাইট। এরপরে যুক্তরাষ্ট্রের আরো কয়েক লাখ গোপন নথি ফাঁস করে তারা।

উইকিলিকসের হাতে ৭ লাখের বেশি গোপন নথি, ভিডিও ও কূটনৈতিক তার বার্তা যেতে সহায়তার অভিযোগে ২০১০ সালে তাদের গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিংকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ। ম্যানিংয়ের ৩৫ বছরের সাজা হয়, সাত বছর কারাভোগের পর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ক্ষমায় ২০১৭ সালে ছাড়া পান তিনি।

 

"