নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলার উদ্দেশ্যই ছিল ‘লাইভ সম্প্রচার’

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যেকোনো ধারার উগ্রপন্থি সন্ত্রাসী তৎপরতায় ইন্টারনেটের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রচারণাও নতুন নয়। তবে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সংঘটিত সাম্প্রতিক হামলা বিশ্ববাসীর সামনে নতুন এক বাস্তবতা হাজির করেছে। এবার প্রথম কোনো একটি হামলার লাইভ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী ব্রেন্টন ট্যারান্ট তার নিজের ফেসবুক একাউন্ট থেকে ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে হামলার ১৭ মিনিট লাইভ স্ট্রিমিং হাজির করেছেন বিশ্ববাসীর সামনে। সংবাদ মাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ওই হামলার উদ্দেশ্যই ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার লাইভ সম্প্রচার। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সন্ত্রাসী হামলাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের উপযোগী করে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে সন্ত্রাসীদের মধ্যে।

গত শুক্রবার ২৮ বছর বয়সি অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারান্ট নামের সন্দেহভাজন হামলাকারীর লক্ষ্যবস্তু হয় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদ। শহরের হাগলি পার্কমুখী সড়ক ডিনস এভিনিউয়ের আল নুর মসজিদসহ লিনউডের আরেকটি মসজিদে তার তা-বের বলি হয় অর্ধশত মানুষ। ট্যারান্ট তার হামলাটি ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিমিং করে। স্বয়ংক্রিয় বন্দুক হাতে হামলাকারীর এগিয়ে যাওয়া, মসজিদের প্রবেশকক্ষ থেকে বিভিন্ন কক্ষে নির্বিচার গুলি বর্ষণ আর রক্তাক্ত নৃশংস পরিস্থিতির ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যায়, সন্ত্রাসী হামলার ক্ষেত্রে সহযোগী মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অতীতের যেকোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর থেকে ভয়াবহ আকারে হাজির হওয়া মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আইএস ‘আমাক’ নামের ওয়েবসাইটকে ব্যবহার করেই ইউরোপ পর্যন্ত তাদের ‘জিহাদি উন্মাদনা’ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। ২০১৩ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে ওয়েস্টগেট শপিং মলে হামলার কথা সরাসরি টুইটারে জানিয়েছিল আল শাবাব জঙ্গিরা। একটু পরপর হামলার বর্ণনা দিয়ে নতুন নতুন পোস্ট দিচ্ছিল তারা। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্যারিসের পূর্বাঞ্চলীয় কোশের বাজারে চারজনকে গুলি করে হত্যা করে এক সন্ত্রাসী। মার্কিন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা তখন জানিয়েছিলেন, একটি গো প্রো ক্যামেরা দিয়ে ওই হামলার দৃশ্য রেকর্ড করা হয়েছিল। হামলাকারী ভিডিওটি ই-মেইল করতে চেয়েছিল, তবে তার আগেই পুলিশের হাতে মৃত্যু হয় তার।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দর্শক টানতে ইন্টারনেট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে সন্ত্রাসীরা। উগ্রপন্থিদের কাছ থেকে প্রযুক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জাতিসংঘের পক্ষ হয়ে বিশ্বের প্রযুক্তি শিল্পকে সহযোগিতায় কাজ করে টেক অ্যাগেইন্সট টেররিজম। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অ্যাডাম হ্যাডলি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ হলো রাজনৈতিক সহিংসতা। সে কারণে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে প্রভাবিত করতে সন্ত্রাসীদের সব সময় প্রচারণার রাস্তা খুঁজতে হয়।’ হ্যাডলি আরো বলেন, ‘তারা (জঙ্গিরা) দর্শক চায়। যেখানে বেশি দর্শক পাওয়া যাবে, সেখানেই সব সময় যাবে তারা।

এটা হতে পারে তথাকথিত কোনো মিডিয়া, আবার তা বড় মাত্রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্লাটফর্মও হতে পারে।’

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হামলার পুরো ঘটনাটি দেখে স্পষ্ট হয় যে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যুগের কথা মাথায় রেখেই পরিকল্পিত। অস্পষ্ট চিত্র নিয়ে ধারণকৃত ভিডিও গেমের স্টাইলে ওই হামলার ভিডিওচিত্র ধারণ করা হয়েছে। মসজিদে প্রার্থনারত ধর্মপ্রাণ মানুষকে এমন করে বন্দুক দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে, যেমন করে ভিডিও গেমে শত্রুকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।

নিউইয়র্ক টাইমসের মতামত পাতায় চার্লি ওয়ার্জেল লিখেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক হামলার ১৭ মিনিটের ওই ভিডিটি প্রত্যাহারের বন্দোবস্তের চেয়েও দ্রুতগতিতে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি লিখেছেন, এটি ডিজিটাল যুগের রেকর্ড পরিমাণ হতাহতের ঘটনাকে স্বয়ং হামলাকারী কর্তৃক চিত্রায়িত করার এক অনন্য নৃশংস-অমানবিক নজির। ওয়ার্জেল তার বিশ্লেষণে বলেছেন, এটি স্পষ্ট যে, হামলাকারী নিজেকে সবার সামনে তার বার্তা নিয়ে হাজির করতেই ভিডিওটি এভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। তবে যা একে ‘অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন সন্ত্রাসী ঘটনা’ আকারে হাজির করেছে তা হলো প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন বর্ণিত এর ‘পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট’, যে প্রাযুক্তিক বৈশিষ্টের কারণে একে ভাইরাল করা গেছে।

সিএনএন-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলার আগে ‘এইট চ্যান’ নামে একটি সাইটে (আইন বহির্ভূত এক ফোরাম যা বর্ণবাদী ও জঙ্গিবাদী পোস্ট শেয়ার করে) ৮৭ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার প্রকাশ করে হামলাকারী। সেখানে ২০১১ সালে নরওয়ের হামলাকারী অ্যান্ডার্স ব্রেইভিকের মতো উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের কর্মকা-কে সামনে আনা হয়। অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিদ্বেষী বিভিন্ন প্রবণতাকেও গৌরবান্বিত করা হয় কথিত সেই ইশতেহারে। যেখান থেকে মসজিদে হামলার লাইভ স্ট্রিমিং করা হয়, ‘এইট চ্যান’ নামের ওয়েবসাইটে সেই ফেসবুক পেজের ঠিকানাও দেওয়া হয়েছিল। হামলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল সন্দেহভাজন ট্যারান্টের টুইটার একাউন্ট থেকেও। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ওই পেজটি বন্ধ করে দেয়। টুইটার কর্তৃপক্ষ মুছে দেয় সন্দেহভাজন হামলাকারীর প্রোফাইল। তবে তার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় নৃশংস হামলার ভিডিও।

 

"