মুসলিম-অভিবাসীদের নাম ছিল ব্রেন্টনের আগ্নেয়াস্ত্রে

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিভিন্ন দেশের মুসলিম এবং অভিবাসীদের হত্যার কারণে যেসব লোকজনের সাজা হয়েছে তাদের অনেকের নামই লেখা ছিল ব্রেন্টন ট্যারেন্টের আগ্নেয়াস্ত্রে। ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলার ঘটনা ফেসবুকে লাইভস্ট্রিমিং করেছিল ওই হামলাকারী। আল নুর মসজিদে নির্বিচারে পুরুষ-নারী-শিশুদের ওপর তার গুলি চালানোর দৃশ্য এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, তা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বেশি ক্ষণ দেখা সম্ভব নয়। খুবই পারদর্শীভাবে মুসজিদের ভেতরে থাকা নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়েছে সে।

ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ওই হামলার আগেই তথাকথিত একটি ইশতেহার প্রকাশ করে যেখানে সে তার সহিংস কট্টর ডানপন্থি মতাদর্শ তুলে ধরেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের ভাষায়, ব্রেন্টন ট্যারেন্ট আসলেই একজন ‘উগ্র ডানপন্থি সন্ত্রাসবাদী।’ হামলার ঘটনার যে ১৭ মিনিটের ভিডিও এবং তার আগে যে সুদীর্ঘ ইশতেহার সে প্রকাশ করেছে, তা থেকে তার চিন্তা ও মতাদর্শ সম্পর্কে বেশ কিছু ধারণা পাওয়া গেছে।

ব্রেন্টন ট্যারেন্ট যখন অস্ত্র বোঝাই গাড়ি নিয় আল নুর মসজিদের দিকে যাচ্ছিল তখন তার গাড়িতে যে গান বাজছিল, সেটি একটি সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদী রণসংগীত। ‘চেটনিকস’ নামে পরিচিত সার্বিয়ান প্যারামিলিটারি ইউনিট ১৯৯২-৯৫ সালের বসনিয়ান যুদ্ধের সময় এটাকে তাদের কুচকাওয়াজ সংগীত হিসেবে ব্যবহার করতো। এই সংগীতে বসনিয়ার যুদ্ধের সময় সার্বদের নেতা রাদোভান কারাদযিকের প্রশংসা করা হয়েছে। গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে রাদোভান কারাদযিক দোষী সাব্যস্ত হন।

মুসলিমদের এবং অভিবাসীদের হত্যার কারণে যেসব লোকের সাজা হয়েছে, তাদের অনেকের নামও লেখা ছিল ব্রেটন ট্যারেন্টের আগ্নেয়াস্ত্রগুলোতে। একটি অস্ত্রের গায়ে বেশ কয়েকজনের নাম লেখা ছিল। এরা হলো :

১. অ্যান্তন লুন্ডিন পিটারসন, সুইডেনে দুই অভিবাসী শিশুকে হত্যা করেছিল এই শিক্ষার্থী।

২. আলেকজান্দ্রে বিসোনেতে, ২০১৭ সালে কানাডার একটি মসজিদে হামলা চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করে সে।

৩. স্কেনডারবার্গ, আলবেনিয়ার এই নেতাকে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী করা হয়।

৪. অ্যান্তনিও ব্রেগাডিন, এই ভেনেতিয়ান সামরিক কর্মকর্তা একটি চুক্তি ভেঙে তুর্কি বন্দিদের হত্যা করেছিল।

৫. চার্লস মার্টেল, এই ফ্রাংকিস সামরিক নেতা আন্দালুসিয়ায় ব্যাটল অব ট্যুরস-এ মুসলিমদের পরাজিত করে।

এসব নামের পাশাপাশি ১৬৮৩ সালের কথাও উল্লেখ রয়েছে ব্রেন্টনের অস্ত্রে। ১৬৮৩ সালে দ্বিতীয়বারের মতো অটোমান সামাজ্যের অধীনে চলে যায় ভিয়েনা।

একটি বন্দুকের গায় লেখা ছিল ‘ফর রদারহ্যাম।’ যুক্তরাজ্যের রদারহ্যামে শিশুদের ওপর এশিয়ান মুসলিম পুরুষদের যৌন নিপীড়নের যে কেলেঙ্কারির ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল, সেই ঘটনাকেই এতে ইঙ্গিত করা হয়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর ঐতিহাসিক অনেক লড়াইয়র প্রতি ইঙ্গিত করে বিভিন্ন শব্দ লেখা ছিল তার অস্ত্রে।

অস্ট্রেলীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ব্রেন্টন সিডনি থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার উত্তরের শহর গ্রাফটনের বাসিন্দা। তার সাবেক বস ট্রেসি গ্রে দাবি করেছেন, ব্রেন্টনের মধ্যে তিনি কখনো কেনো চরমপন্থি চিন্তাভাবনা বা পাগলামি আচরণ দেখেননি।

দীর্ঘ ইশতেহারে ব্রেন্টন লিখেছে, ২০১৭ সালে ইউরোপ ঘুরে আসার পর তিনি এই হামলার পরিকল্পনা শুরু করে। বিশেষ করে সে উল্লেখ করেছে, সুইডেনে একটি লরি চালিয়ে ইসলামিক স্টেটের সমর্থক এক ব্যক্তির চালানো হামলার কথা। এছাড়াও আছে ফ্রান্সে এমানুয়েল ম্যাঁক্রোর মতো লোকের প্রেসিডেন্ট হওয়া এবং ফ্রান্সে যে জাতিগত বৈচিত্র্য তা নিয়েও ক্ষোভ-হতাশার কথা বলেছে সে।

তার ওই দীর্ঘ ইশতেহারের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট।’ এতে যে ধরনের ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ তুলে ধরা হয়ছে, তা সাম্প্রতিককালে অনলাইনে দ্রুত প্রসার লাভ করছে। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীদের একটি ব্যাপক আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীও তৈরি হচ্ছে।

 

"