নোবেলজয়ী কোস্টারিকার সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কোস্টারিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট অস্কার আরিয়াসের বিরুদ্ধে পাঁচ নারী যৌন অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছেন। #মি টু আন্দোলনে ল্যাটিন আমেরিকায় এত শীর্ষ পর্যায়ের কোনো রাজনীতিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঘটনা এটাই প্রথম। বিশ্বজুড়ে নারীদের কর্মক্ষেত্রে যৌন অসদাচরণের শিকার হওয়া নিয়ে মুখ খোলার যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তা #মি টু নামে পরিচিত।

কোস্টারিকার দুইবারের প্রেসিডেন্ট অস্কার আরিয়াস ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে সম্মানিত রাষ্ট্রনায়কদের একজন। আলোচনার মাধ্যমে ওই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য ১৯৮৭ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন তিনি। পরমাণু-বিরোধী আন্দোলনকর্মী আলেক্সান্দ্রা আর্চ সর্ব প্রথম অস্কার আরিয়াসের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া নিয়ে মুখ খোলেন। যদিও আরিয়াস তার আইনজীবীর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে আর্চের আনা যৌন অসদাচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে আরিয়াস কোনো মন্তব্য করতে চান না বলে বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান তার আইনজীবী এরিক রামোস। তবে আরিয়াস অভিযোগ অস্বীকার করলেও তার মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্চের মুখ খোলার সাহস অন্যদেরও উৎসাহ দিয়েছে। আর্চের পর আরও অন্তত চারজন নারী আরিয়াসের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ এনেছেন। তাদের এজন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালক এমা দালি।

বৃহস্পতিবার দালি রয়টার্সকে বলেন, ১৯৯০ সালে তিনি সেন্ট্রাল আমেরিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন। ওই সময় নিকারাগুয়ার রাজধানী মানাগুয়ায় একটি হোটেলের লবিতে একদল সাংবাদিক আরিয়াসের সাক্ষাৎকার নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।

‘সাংবাদিকদের দলে আমিও ছিলাম। তিনি সামনে এলে আমি তাকে একটি প্রশ্ন করি। আমার প্রশ্ন শুনে তিনি থামলেন, আমার দিকে তাকালেন এবং উত্তর দেওয়ার বদলে নিজের হাত বাড়িয়ে আমার বুক স্পর্শ করলেন এবং আমার দুই স্তনের মাঝে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তুমি তো ব্রা পরোনি’ তারপর চলে গেলেন। ‘আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম এবং ওই সময় আমি একটা কথাই বলতে পারতাম, ‘হ্যাঁ আমি পরেছি’।’

ওই সময় দালি রয়টার্সের হয়ে ফ্রিল্যান্সিং করতেন এবং ‘টিকো টাইমস’ নামে কোস্টারিকার এই দৈনিক পত্রিকায় কাজ করতেন।

ক্ষোভের সঙ্গে দালি বলেন, পেশাগত জীবনে তিনি দারুণ সফল একজন ব্যক্তি হওয়ার অর্থ এই নয় যে, অন্য মানুষের সঙ্গে এ রকম ব্যবহার করার লাইসেন্স তিনি পেয়ে গেছেন। দালি ওই সময় তার ছেলেবন্ধু এবং পরে তার স্বামীকে এ ঘটনা জানিয়েছিলেন বলে জানায় দ্য ওয়াইশংটন পোস্ট।

আরিয়াসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা তৃতীয় নারী এলেয়নোরা অ্যান্তিলোনা। ১৯৮৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আরিয়াসের প্রচার শিবিরে প্রেস সহযোগী হিসেবে কাজ করতে তিনি। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ওই সময়ে একদিন আরিয়াস জোর করে আমার হাত তার পুরুষাঙ্গে রাখে, আমাকে ঠেলে নিয়ে একটি ওয়ারড্রোবের ওপর চেপে ধরে এবং আমি বাধা দিতে গেলে জোর করে চুমু খায়। ‘আইনজীবীরা এবং অন্য নারীরা যেভাবে আর্চের অভিযোগ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে সেটা দেখে আমি তাকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি আর্চের আনা অভিযোগ বিশ্বাস করি, কারণ তিনি (আরিয়াস) আমার সঙ্গে কয়েক বছর আগে একই কান্ড করেছেন।

কোস্টারিকার গণমাধ্যমে অ্যান্তিলোনার খবর প্রথম প্রকাশ পায়। অভিযোগ তোলা অন্য নারী মার্তা আরায়া মারোনি একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করেন। তিনি টিকো টাইমসকে বলেন, ২০১২ সালে আরিয়াসের বাসভবনে একটি বৈঠক চলাকালে তিনি আমার পা জড়িয়ে ধরেন এবং কয়েকবার ফোনালাপে ম্যাসেজের প্রস্তাব দেন। ২০১৩ সালের শেষ দিকে আরিয়াসের সাক্ষাৎকার নিতে গেলে তিনি কোস্টারিকার ম্যাগাজিন ‘পারফিল’র সাংবাদিক মনিকা মোরালেসকে তার পায়ের ওপর বসার প্রস্তাব দেন বলে দাবি ওই নারী সাংবাদিকের।

আরিয়াসের আইনজীবী রামোস রয়টার্সকে বলেন, কোস্টারিকার প্রসিকিউটর কার্যালয়ে থেকে আরিয়াসের বিরুদ্ধে যৌন অসদারচরণ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা (আরিয়াসের বিরুদ্ধে) বিবৃতি দিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের পূর্ণ সম্মান আছে।

২০০৬ সালে আফ্রো আমেরিকান সামাজিক আন্দোলনের কর্মী তারানা বুরকি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের বিষয়ে প্রথমবারের মতো ‘#মি টু’ ধারণার কথা বলেন, পরে একই নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরে হলিউড অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মি টু হ্যাশট্যাগ দিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এরপর একে একে মুখ খুলতে থাকেন হলিউডের অভিনেত্রীরা। নীরবতা ভেঙে যৌন নিগ্রহের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান দিতে থাকেন নারীরা।

 

"