ইয়েমেন শান্তি আলোচনা শুরু বন্দিবিনিময় চুক্তি সই

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইয়েমেনে প্রায় চার বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের লক্ষ্য নিয়ে সুইডেনে শুরু হয়েছে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনা। সংঘাতে লিপ্ত দুই পক্ষ বন্দিবিনিময় চুক্তিও সই করেছে বলে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন বিশেষ জাতিসংঘ দূত মার্টিন গ্রিফিথ।

দুই বছরের মধ্যে প্রথম এ শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। ইয়েমেন সরকার এবং হুতি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে আসা প্রতিনিধিরা এতে অংশ নিচ্ছেন। দুই পক্ষে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা এক সপ্তাহ স্থায়ী করার লক্ষ্যে কাজ করছে গ্রিফিথের টিম।

মানব বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা ইয়েমেনে যুদ্ধাবসানে কয়েক বছরের মধ্যে শান্তি আলোচনার এ সূচনাকে আশার আলো বলে অভিহিত করেছেন গ্রিফিথ। সংঘাতে লিপ্ত সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক আখ্যা দেন তিনি।

শান্তি আলোচনা এমন সময় হচ্ছে, যখন ইয়েমেনবাসী ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ২০১৫ সালের মার্চে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব মিত্রদের নিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করার পর এ পর্যন্ত দেশটিতে বহু শিশুসহ লাখো মানুষ নিহত হয়েছে। সংঘাত বন্ধে গত কয়েক মাস ধরে একটি শান্তি আলোচনার চেষ্টা করে আসছে জাতিসংঘ। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে কোনো আলোচনাই হয়নি। জেনেভায় গত সেপ্টেম্বরে আলোচনার সর্বশেষ একটি চেষ্টাও হুতিদের অনুপস্থিতির কারণে ব্যর্থ হয়। এবারের আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ হিসাবে বন্দিবিনিময় চুক্তি সই হওয়াকে একটি ইতিবাচক লক্ষণ বলেই বর্ণনা করেছেন জাতিসংঘ দূত গ্রিফিথ।

এ চুক্তির আওতায় কতজন বন্দি মুক্তি পাবে সে সংখ্যা সঠিকভাবে জানাতে না পারলেও গ্রিফিথ বলেছেন, এ পদক্ষেপে হাজার হাজার পরিবার উপকৃত হবে।

সংবাদদাতারা বলছেন, প্রথমদফা এ আলোচনার মূল লক্ষ্য বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত লোহিত সাগরের হোদায়দা বন্দরে পুরোদস্তুর লড়াই বন্ধ করা। যেখানে হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়ে আছে।

তা ছাড়া, ইয়েমেনে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানটি কেমন হবে সে সম্পর্কিত আলোচনার একটি ফ্রেমওয়ার্ক গত বৃহস্পতিবারের আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসার আশা করছে জাতিসংঘ। গ্রিফিথ বলেন, আগামী দিনগুলোতে আমরা শান্তি প্রক্রিয়ায় গতি সঞ্চারের বড় ধরনের সুযোগ পাব।

আলোচনায় বসেছে ইয়েমেনের সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সমর্থিত সরকার এবং ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিরা। আলোচনা শুরু করেছেন জাতিসংঘ দূত। কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকটি ওয়ার্কিং গ্রুপের মধ্য দিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলবে।

কয়েকটি বিষয় নিয়ে দুই পক্ষ একসঙ্গে আলোচনা করবে। আর অন্য কয়েকটি বিষয় নিয়ে তারা আলাদা আলাদা গ্রুপে আলোচনা করবে। বিবিসিকে এ কথা জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।

সৌদিতে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : সৌদির দক্ষিণাঞ্চলীয় জিজান প্রদেশে ছয়বার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। ইয়েমেনের ওপর সৌদি জোটের বর্বর বিমান হামলার জবাবে হুথি সমর্থিত সেনারা এসব ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে আল-মাসিরা টেলিভিশন জানিয়েছে, ছয়টি স্বল্প পাল্লার জিলজাল ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জিজানে সমবেত সৌদি জোটের ওপর হামলা চালানো হয়। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সফলতার সঙ্গে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং এতে অজ্ঞাতসংখ্যক শত্রু নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এদিকে, জিজান প্রদেশের আন-নাহার পাহাড়ের কাছে পুতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে সৌদি আরবের অন্তত তিন সেনা নিহত ও দু’জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া, ইয়েমেনের সেনারা পশ্চিমাঞ্চলীয় হুদাইদা বন্দর এলাকা থেকে সৌদি জোটের একটি গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।

শান্তি আলোচনার মধ্যেই ২৮ বার সৌদি বিমান হামলা : দারিদ্র্যপীড়িত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের ওপর গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরব অন্তত ২৮ বার বিমান হামলা চালিয়েছে। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ইয়েমেন ইসুতে যখন হুথি আনসারুল্লাহ আন্দোলন ও পলাতক প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদির অনুগত লোকজন সংঘাত অবসানের জন্য শান্তি আলোচনা করছে তখন সৌদি আরব দৃশ্যত হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইয়েমেনের এক জেনারেলের বরাত দিয়ে আল-মাসিরা টেলিভিশন চ্যানেল বলেছে, সৌদি আরব ও তাদের ভাড়াটে সেনাদের হামলা অব্যাহত রাখার ঘটনায় এটাই প্রমাণ করে যে, আগ্রাসীরা ইয়েমেন দ্বন্দ্বের অবসান চায় না।

ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জেনারেল ইয়াহিয়া সারিয়ি জানান, গত বৃহস্পতিবারের বিমান হামলায় তিন নারী নিহত ও বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এসব হামলার জবাবে হুথি আনসারুল্লাহ আন্দোলন সমর্থিত সেনারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জিজান প্রদেশে ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে।

সৌদিকে জাতিসংঘ, ইয়েমেনের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিন : দারিদ্র্যপীড়িত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের ওপর থেকে আগ্রাসী সৌদি আরবের অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য রিয়াদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। ইয়েমেন যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সুইডেনে যখন শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে তখন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এ আহ্বান জানালেন।

এর পাশাপাশি তিনি ইয়েমেনের জনপ্রিয় হুথি আনসারুল্লাহ আন্দোলন ও পলাতক প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদির অনুগতদের প্রতি আলোচনায় কঠোর অবস্থান না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার এক টুইটার বার্তায় তিনি বলে, স্টকহোমে ইয়েমেন সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে শান্তি আলোচনা শুরুর ঘটনাকে আমি স্বাগত জানাই। দুই পক্ষের প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি যে, যুদ্ধাবসান ও জনগণের ভোগন্তি দূর করার জন্য তাদের হাতে যে ক্ষমতা আছে তা যেন তারা ব্যবহার করেন। ইয়েমেনিরা আর ধৈর্য ধরতে পারছেন না।

পরে গুতেরেসের এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানান, ইয়েমেনের হুদাইদা বন্দর উন্মুক্ত রাখার জন্য সবপক্ষের প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব আহ্বান জানিয়েছেন। ইয়েমেনে যে সামান্য পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী প্রবেশ করে তা এই বন্দর দিয়েই আসে।

"