খাশোগির অন্তর্ধান

সৌদি আরবের কাছে জবাব চায় ফ্রান্স

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

খ্যাতনামা সাংবাদিক জামাল খাশোগি’র অন্তর্ধানের বিষয়ে সৌদি আরবের কাছে জবাব চায় ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, সৌদি আরবের সরকারবিরোধী সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজ হয়ে যাওয়া একটি বিপজ্জনক ঘটনা। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে।

শুক্রবার ফ্রান্স ২৪ টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ম্যাক্রোঁ বলেন, আমি প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য অপেক্ষা করছি। যেসব খবর সামনে আসছে তা মারাত্মক, খুবই মারাত্মক, ভয়াবহ উদ্বেগজনক। এই ঘটনা উদঘাটনে ফ্রান্স সম্ভব সবকিছু করতে চায়। ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, সাংবাদিক জামাল খাশোগির অন্তর্ধানের বিষয়টি পরিষ্কার হলে ফ্রান্স একটি অবস্থান নেবে। তখন বিষয়টি নিয়ে তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, সৌদি রাজা সালমান বিন আবদুলআজিজ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন। এর আগে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ভন ডারমুহল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, ইস্তাম্বুল থেকে খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার ফলে অনেক প্রশ্ন ও দ্বিধা তৈরি হয়েছে। ফ্রান্স সরকার খাশোগির বিষয়ে নিজের উদ্বেগের কথা সৌদি সরকারকে জানিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ওই সাংবাদিকের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা রিয়াদকে স্পষ্ট করতে হবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রিয়াদের সঙ্গে প্যারিসের নিবিড় কূটনৈতিক ও ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় এ ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করতে সময় নিয়েছিল ফ্রান্স।

এদিকে, সাংবাদিক জামাল খাশোগি’র অন্তর্ধান ইস্যুতে সৌদি আরবের বিনিয়োগবিষয়ক সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন সাময়িকী ইকনোমিস্ট, সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, সিএনবিসি’র মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো। একই ইস্যুতে সৌদি বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ব্যক্তিরা হচ্ছেন সাবেক মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী আর্নেস্ট মোনিজ, ভার্জিন গ্যালাক্টিকের রিচার্ড ব্রনসন, এওএলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ কেস প্রমুখ।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘দাভোস ইন ডেজার্ট’ নামে খ্যাত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনটির আগামী ২৩ অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদে শুরু হওয়ার কথা। সম্মেলনটি বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু তুরস্কে অবস্থিত সৌদি আরবের কনস্যুলেটে গিয়ে সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজ হওয়া ও তার পেছেনে সৌদি সরকারের হাত থাকার অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে দেশটির সম্মেলন বর্জন করা বা সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিতের কথা জানিয়েছে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।

২ অক্টোবর ২০১৮ দুপুরে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন খাশোগি। এরপর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। তুরস্কের তদন্তকারীরা বলছেন, সৌদি আরবের ১৫ জন এজেন্ট কনস্যুলেটের ভেতরেই খাশোগিকে হত্যা করেছে।

তুর্কি আরব মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান তুরান কিসলাকসি একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছেন, খাশোগিকে হত্যা করে তার লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে। সৌদি আরব এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে আসছে, কনস্যুলেটে প্রবেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বের হয়ে গেছেন। পরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান খাশোগির কনস্যুলেট ত্যাগের প্রমাণ চাইলে তা দেখাতে ব্যর্থ হয় রিয়াদ। এমনকি ওই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজও সরিয়ে ফেলে সৌদি কনস্যুলেট কর্তৃপক্ষ।

নিখোঁজ খাশোগি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রবল সমালোচক ছিলেন। সৌদি আরবের এ রাজনৈতিক ভাষ্যকার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা তার নিবন্ধে সৌদি জোটের কাতারবিরোধী অবরোধের কঠোর সমালোচনা করতেন। মানবাধিকার প্রসঙ্গে সমালোচনা করায় কানাডার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছিল সৌদি আরব। আর তখন সৌদির সমালোচনায় কলম ধরেছিলেন খাশোগি। সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ জানিয়েছে, তিনি মোহাম্মদ খালেদ খাশোগির দৌহিত্র। খালেদ খাশোগি দেশটির সাবেক বাদশাহ আবদুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন।

সংবাদ সাময়িকী ইকনোমিস্টের এডিটর ইন চিফ জ্যানি মিন্টন বেডোস জানিয়ে দিয়েছেন, রিয়াদের বিনিয়োগবিষয়ক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন না। সিএনবিসিতে কর্মরত একজন সঞ্চালক ও নিউইয়র্ক বিজনেস টাইমসের সাংবাদিক অ্যান্ড্রু রস সরকিন টুইটার বার্তায় লিখেছেন, তিনিও ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘জামাল খাশোগির অন্তর্ধান ও তার হত্যার শিকার হওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন পড়ে আমি ভয়ংকর রকম ক্ষুব্ধ।’

প্রভাবশালী সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষ্য, সম্মেলনের মিডিয়া স্পন্সরের হিসেবে থাকার কথা থাকলেও তারা ওই অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমস এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা সৌদি আরবের ওই আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে না থাকার কথা ভাবছে। ভায়াকমের সিইও বব বিকাশও সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ তার সেখানে বক্তব্য রাখার কথা ছিল। সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও ব্লুমবাবার্গও তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়ে দিয়েছে, রিয়াদের বিনিয়োগ সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্তের কথা।

সাংবাদিক জামাল খাশোগির অন্তর্ধান ও সম্ভব্য হত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে সৌদিবিরোধিতা সংবাদমাধ্যমের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছেছে অন্যান্য খাতেও। উবার টেকনোলজিসের সিইও দারা খশরুশাহী বলেছেন, এর মধ্যে যদি নতুন কোনো তথ্য উঠে না আসে তাহলে তিনি রিয়াদে অনুষ্ঠিতব্য ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ কনফারেন্সে’ যাবেন না।

 

"