ভারতে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্কে

প্রকাশ | ০৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারত সাত রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পর থেকেই বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্ক যেন ঘিরে ধরছে অন্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের। নিপীড়নের মুখ থেকে পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা আবার এখনই সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফিরতে চাইছে না। গত বৃহস্পতিবার টিভি চ্যানেলগুলোতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর খবর প্রচারের পরপরই এক রোহিঙ্গার ফোনকলে ফুটে উঠেছে আতঙ্কের ছাপ। জম্মু-কাশ্মীরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শহিদুল্লাহর কাছে বন্দিশিবির থেকে ফোনে তার ভাতিজার আকুল আর্তি, চাচা দয়াকরে আমাদের এখান থেকে নিয়ে যান। তারা আমাদেরও ফেরত পাঠিয়ে দেবে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ওইদিন রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তের স্থগিতাদেশ চেয়ে করা একটি আবেদন খারিজ করে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই আসাম পুলিশ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে ৭ রোহিঙ্গাকে হস্তান্তর করে। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হয় সেই খবর। জাতিসংঘ সঙ্গে সঙ্গেই ওই রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ওদিকে, ভারতের শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, রাখাইনে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা খুনও হতে পারে। মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার হয়ে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। শহিদুল্লাহ তাদেরই একজন। ২০১০ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে নানা পথ ঘুরে জম্মুতে থিতু হন তিনি। দুই বছর পর তার ভাতিজা সাদিউর রহমানসহ (৪০) আরো কয়েকজন আত্মীয় দেশ ছেড়ে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের আসামে ঢোকেন। কিন্তু অবৈধ অভিবাসী হিসেবে তারা সেখানে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তারপর থেকে তারা সেখানকার বন্দিশিবিরেই আছেন।

শহিদুল্লাহ জানান, গত ৩ অক্টোবর সাদিউর তাকে ফোন করে। ওইদিন সাদিউরকে নিয়মিত মেডিকেল পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছিল। সেদিনই একই রকম একটি বন্দিশিবির থেকে সাত রোহিঙ্গাকে বের করে সীমান্তে নিয়ে যায় ভারত সরকার। আর তারপরই তাদের হস্তান্তর করা হয়। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত সরকারের এটিই প্রথম পদক্ষেপ। এরপর কে এর শিকার হবে, তা নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অন্য সব রোহিঙ্গার মনে।

ভারতে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার জনকে পরিচয়পত্র দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। শহিদুল্লাহ ওইসব সৌভাগ্যবানের একজন। রোহিঙ্গা শণার্থীদের হেনস্তা, ইচ্ছামতো গ্রেফতার, বন্দি ও বিতাড়ন থেকে রক্ষা করতে ইউএনএইচসিআর এ পরিচয়পত্র দেয়। যদিও ভারত সরকার ওই পরিচয়পত্রের স্বীকৃতি দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলে তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে বলে জাতিসংঘ যে শঙ্কা প্রকাশ করেছে, ভারত তা মানতেও নারাজ। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া আমাদের দেশে প্রবেশ করা যে কেউ অবৈধ প্রবেশকারী বলে বিবেচিত হবে। আর আইন অনুযায়ী, অবৈধ প্রবেশকারীকে অবশ্যই নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

সম্প্রতি রয়টার্স কর্তৃপক্ষ ভারতের জম্মু ও রাজধানী দিল্লির দুটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, ভারতের হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি সরকার নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশ থেকে সব রোহিঙ্গা মুসলিমকে তাড়িয়ে দেবে। আগামী বছর মে মাসে ভারতে জাতীয় নির্বাচন। ওই নির্বাচন সামনে রেখে জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়াতে রোহিঙ্গা বিতাড়নকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে মোদি সরকার।

 

শহিদুল্লাহর মতো অনেক রোহিঙ্গাই কেবল বন্দিশিবিরে থাকা তার আত্মীয়দের নিয়েই চিন্তিত নন, বরং হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে থাকা নিয়েও শঙ্কিত।

রোহিঙ্গা শহিদুল্লাহ বলেন, ‘এখানকার পরিস্থিতি ভালো শুনেই আমরা এসেছিলাম। এখানে অনেক কাজ আছে। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা যায়, যেটা আমাদের দেশে সম্ভব নয়। এসবই ঠিক। আমাদের এখানে থাকতে দেওয়ার জন্য ভারতকে কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে আমাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ক্রমেই বাড়ছে।’

মোহাম্মদ আরাফাত নামের ২৪ বছর বয়সী আরেক রোহিঙ্গা জানান, স্থানীয়রা প্রায়ই তাদের সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পৃক্ততা থাকা নিয়ে কোনো প্রমাণ ছাড়াই কথা বলে। তারা চায় আমরা এখান থেকে চলে যাই। আর এ কারণেই আমরা আমাদের পরিবার নিয়ে উদ্বিগ্ন। এখানকার সবাই বিতাড়িত হওয়ার বিষয়টি জানে এবং এ নিয়ে তারা শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। জম্মু থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণে দিল্লির শাহীনবাগ শরণার্থী শিবিরে বাস করা রোহিঙ্গারাও আছে বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্কে। ৪৭ বছর বয়স্ক এক রোহিঙ্গা মোহাম্মদ হারুন বলেন, তারা ভারত থেকে যেতে চান না। ভারতে অন্য দেশ থেকে আসা শরণার্থীরা থাকার পরও কেন বেছে বেছে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য পরিস্থিতি এখনো নিরাপদ হয়নি। তাই তাদের এখনই সেখানে পাঠানো ঠিক নয়। রোহিঙ্গাদের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে: ভারতে রোহিঙ্গারা যে পরিস্থিতির মুখে আছে, তা দিন দিনই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। জম্মুর ‘চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ গত বছর শরণার্থীদের চিহ্নিত করে করে খুন করার হুমকি দিয়েছিল। তাদের এ হুমকিতেই সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুটি আরো বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলে দাবি তাদের।

ভারতের অনেক গণমাধ্যম যে রোহিঙ্গাদের কেবল সন্ত্রাসী হিসাবেই চিহ্নিত করছে তাই নয় বরং তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার এমনকি মানব পাচারেরও অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থক একটি পত্রিকা শনিবারের সম্পাদকীয়তে বলেছে, রোহিঙ্গারা একটি সমস্যা। তাদের মধ্যে যারা কট্টরপন্থি তাদেরকে কোনো দয়া দেখানো যাবে না। আর বাদবাকী যারা আছে তাদের সহায়তা করতে ভারত অপারগ। নানা জঙ্গি তৎপরতায় জর্জরিত ভারত চীনকে মোকাবিলায় মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। গত বছর তারা মিয়ানমারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের ‘চরমপন্থি সহিংসতা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

"