ব্রিটেনে ট্রাম্পের ভিন্নধর্মী সফর

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১২তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাজ্য সফর করতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাষ্ট্রীয় সফর না হলেও তার এই সফর আগের রাষ্ট্রনেতাদের সফরের চেয়ে ব্যতিক্রমী হবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১৯৭৭ সালে জিমি কার্টার গিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যে। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল লন্ডনের ‘জি সেভেন’ শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেওয়া। তবে ওই সফরে তিনি নিউক্যাসলও গিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাকি বিশ্বের সম্পর্ক উন্নয়নের এক মহাপরিকল্পনার অংশ ছিল নিউক্যাসল। তাই নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিউক্যাসল সিভিক সেন্টারের বাইরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের সামনে ভাষণের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করেছিলেন কার্টার। ওই অনুষ্ঠান সম্পর্কে স্থানীয় পত্রিকা ক্রনিকলের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, তারা বিমানবন্দর, রাস্তাঘাট, সিভিক সেন্টারের বাইরে সব জায়গায় তাকে অভ্যর্থনা জানাতে জড়ো হয়েছিল এবং তিনি সেই অভ্যর্থনা সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। একসময় এভাবেই ব্রিটিশ জনতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানাত।

১৯৬১ সালে জন এফ. কেনেডির ব্রিটেন সফরের সময় তাকে আর তার স্ত্রী জ্যাকুলিন কেনেডিকে একনজর দেখার জন্য প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ লন্ডন বিমানবন্দর সংলগ্ন রাস্তায় সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল যুক্তরাজ্যে, যা এত মানুষ জড়ো হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল। আর সবশেষ যুদ্ধে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) যুক্তরাজ্যের সহযোগী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যুক্তরাজ্যে আসতেন অনেক দিন বিরতির পর। প্রথম সফরকারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন উড্রো উইলসন, যিনি ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ব্রিটেন গিয়েছিলেন। এরপর ২৭ বছর পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে দ্বিতীয়বারের মতো কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তরাজ্য সফরে যান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনের রাজপরিবারের কাছ থেকেও সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার পেয়েছেন। পঞ্চাশের দশকের প্রেসিডেন্ট ডুয়াইট আইজেনহাওয়ার রানির পছন্দের ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি একমাত্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজপরিবারের অবকাশ যাপনের স্থান বালমোরাল দুর্গে আমন্ত্রিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সঙ্গেও বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয় রানির। ১৯৮২ সালে উইন্ডসর দুর্গে থাকার জন্য রানি ব্যক্তিগতভাবে রিগানকে নিমন্ত্রণ করেন। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটনকে রাজকীয় প্রমোদতরী ‘ব্রিটানিয়া’তে রাত্রিযাপনের সম্মান দেওয়া হয়। ১৯১৮ সালে উইলসনের পর জর্জ বুশ ২০০৩ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাকিংহাম প্রাসাদে রাত্রিযাপন করেন। ১৯১৮ সালে প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাজ্য সফর করেন উড্রো উইলসন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সফরে উইন্ডসর অতিক্রম করার সময় রাজপ্রাসাদে এক কাপ চায়ের জন্য নিমন্ত্রিত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তার পূর্বসূরিরা যে রকম রাজনৈতিক অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তা পাবেন না। ১৯৯৭ সালে বিল ক্লিনটন মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, সে রকমও কোনো কার্যক্রম নেই ট্রাম্পের সফরে। এমনকি ২০১১ সালে সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামার ডাউনিং স্ট্রিট বাগানে বার্গার বানানো বা সংসদের দুই সভাতে ভাষণ, কিছুই থাকছে না ট্রাম্পের সফরে। এসবের পরিবর্তে ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রীর গ্রামের বাড়ি ‘চেকার্স’-এ ভ্রমণে যাবেন, ১৯৭০ সালে যেমনটা গিয়েছিলেন রিচার্ড নিক্সন। এ সফর আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়। রাষ্ট্রীয় সফরের পরিকল্পনা থাকলেও তার দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বলাই বাহুল্য, রাষ্ট্রীয় সফরও অনেক সময়ই পরিকল্পনামাফিক হয় না। ১৯৮২ সালে রানির পক্ষ থেকে রোনাল্ড রিগানকে পাঠানো আমন্ত্রণের জবাব দিতে দেরি করেছিল হোয়াইট হাউস, যার ফলে সে সময় কিছুটা কূটনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৭ সালে টেমস নদীতে চলমান এক বজরাকে জায়গা করে দিতে লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ খুলে দেওয়ায় বিল ক্লিনটনের বিশাল গাড়িবহরকে কিছুক্ষণের জন্য দুভাগে ভাগ হয়ে যেতে হয়।

 

সে সময় প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তারক্ষীরা বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কাজেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পরিদর্শন যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সে জন্য চেষ্টার অন্ত থাকবে না।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ সফরকে উদ্দেশ্য করে বিক্ষোভ প্রদর্শনের নানা ধরনের পরিকল্পনা থাকলেও, তার কড়া নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে দিয়ে লন্ডন থেকে চেকার্স, চেকার্স থেকে উইন্ডসর আর উইন্ডসর থেকে স্কটল্যান্ডের যাত্রায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

তবে বিক্ষোভ কার্যক্রম আড়াল করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য আলোচনায় আসছে এ সফরের আগে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাণিজ্য শুল্ক আরোপ, ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করা, জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করা, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারিসহ নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। কাজেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ সপ্তাহের সফরের মাধ্যমে দুদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

"