যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় রক্ষাকর্তা এবার ‘ক্যাটম্যান’

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

‘ব্যাটম্যান’ বা ‘স্পাইডারম্যান’-এর মতো অতিমানবিক শক্তি তার নেই। বেড়ালদের প্রতি সামান্য মানবিকতা দেখিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন ‘ক্যাটম্যান’। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় বেড়ালদের ঠিকানা এখন তারই ‘ক্যাট স্যাংচুয়ারি’। বিশ্বের দরবারে সিরিয়ার পরিস্থিতি অচেনা নয়। যুদ্ধের ফলে মানুষের করুণ এবং হতাশাজনক ছবি সংবাদমাধ্যমের বদৌলতে প্রচারিত হয়েছে। নিপীড়িত মানবজীবনের কান্না ছাপিয়ে গেছে বিশ্বের সবকিছুই। এরই মধ্যে সিরিয়ার অবলা গৃহপালিত প্রাণীদের কথা চাপা পড়ে গেছে। বাস্তবিকই, মানুষ যেখানে নিজেই আর্ত, অসহায়, ভিটেহীন, সেখানে তার পোষ্যের খেয়াল রাখবে কীভাবে?

এই সিরিয়াতেই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিড়ালদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন মোহাম্মদ আলা-আল-জালিল। সিরিয়ার আলেপ্পোতে কাফর নাহা অঞ্চলে তিনি তার ক্লিনিকে বেড়ালদের সেবা শুশ্রƒষা করেন। তিনি বলেন, মানুষকে দয়া করতে চাইলে সবকিছুকেই দয়া করতে হয়।

৪৩ বছরের জালিল ‘আর্নেস্টোস ক্যাট স্যাংচুয়ারি’ নামে বেড়ালদের একটি সেবাকেন্দ্র চালান। এখানে অসুস্থ এবং দুর্বল মার্জারদের সেবা করেন তিনি। পাশাপাশি পথে-ঘাটে যাদের দুবেলা খাবার জোটে না, সেসব বেড়ালের সন্ধান এখানেই পাওয়া যাবে।

নেহাত ভালোবাসা থেকেই তিনি এই বিনা লাভে স্বেচ্ছাশ্রম দেন। ছোটবেলা থেকেই বেড়ালের প্রতি তার দুর্বার ভালোবাসা তাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ শুরুর সময় যখন সবাই এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল, তিনি ১৭০টা বেড়ালকে ছেড়ে পালাতে পারেননি। তখন থেকেই সবাই তাকে আলেপ্পোর ‘ক্যাটম্যান’ বলে চেনে। বেড়ালদের বাঁচাতে বদ্ধপরিকর জালিল ওরফে ক্যাটম্যানের অনেক ভক্তও জুটেছে। সোশ্যাল মিডিয়া বেড়েছে প্রচার।

সিরিয়ার যুদ্ধে সাড়ে তিন লাখ মানুষ মারা গেছে এবং তার থেকেও বেশি মানুষ গৃহহারা হয়েছে। একই অবস্থা গৃহপালিত জীবগুলোরও। এদের জন্যই জালিল তার সেবাকেন্দ্রটি খুলেছেন। প্রথমে তিনি একটি অস্থায়ী সেবাকেন্দ্র চালাতেন। পরে বন্ধুরা এবং সোস্যাল মিডিয়ার অনেক শুভানুধ্যায়ী মিলে টাকা জোগাড় করে এই ‘ক্যাট স্যাংচুয়ারি’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। শহরের ২২টি বেড়ালকে তারা রক্ষাও করেছেন। এখানে বেড়ালরা যে শুধু আশ্রয় পায়, তা নয়, বরং তার থেকেও বেশি কিছু পায়। দুবেলা খাবার এবং সঙ্গে চিকিৎসাও। জালিলের ক্লিনিকে বিনামূল্যে অনেক পশুরই চিকিৎসা করা হয়। তার মধ্যে ঘোড়া, গরু এবং মুরগিও আছে। এক বছরে তারা সাত হাজার পশুর চিকিৎসা করেছেন।

জালিলের এই সেবাকেন্দ্রেই নিজের বেড়ালটিকে নিয়ে এসেছিলেন মোহাম্মদ ওয়াতার। তার পোষ্যটির খাদ্যে বিষক্রিয়া হয়েছিল। লোকজন সবাই জালিলের ক্লিনিকের কথা বলে। সেবাকেন্দ্র নিয়ে ওয়াতার বলেন, আমি যেখানে বাস করি, সেখানে কোনো পশু চিকিৎসক নেই। কাজেই লোকজন যখন আমাকে এখানকার ঠিকানা দেয়, আমি বিনা বাক্যব্যয়ে চিকিৎসা করাতে চলে আসি।

এই অঞ্চলে পশুদের জন্য আর তেমন কিছু নেই। এখানে এসে সত্যি খুব অবাক হয়েছি। তিনি খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, এ যুদ্ধের সময়েও এরকমভাবে যে পশুদের চিকিৎসা করা যেতে পারে, ভাবা যায় না।

সিরিয়ায় যুদ্ধের যা অবস্থা, তাতে এখনো জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে ঢের বাকি। জালিলের চিকিৎসালয়টির দেয়ালে রয়েছে গুলির চিহ্ন। এখানে যুদ্ধে পীড়িত পশুদের সেবা করেন পশু চিকিৎসক মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি জানালেন, যেভাবে যুদ্ধে মানুষের ক্ষতি হয়, একই রকমভাবে পশুদেরও ক্ষতি হয়। আমরা একটা লাগাতার যুদ্ধ লেগে থাকা এলাকায় থাকি। তাই আমাদের সব ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই। ফলে সব পশুই এখানে চিকিৎসা পাচ্ছে না। তবে ইচ্ছা এবং চেষ্টায় তারা অনেকটা এগিয়ে বলে জানালেন তিনি।

একটি সন্তানসম্ভবা অসুস্থ বেড়ালিকে জালিল উদ্ধার করে এখানে আনেন। তারপর ক্রমাগত তার আলট্রাসাউন্ড হয়েছে। ইউসুফ জানালেন, সন্তান এবং মা উভয়কেই সুস্থ রাখা আমাদের দায়িত্ব। তাই ভ্রুণও পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হয়।

"