কম ওজনের নবজাতকের চিকিৎসায় অনন্য উদ্যোগ

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

চট্টগ্রাম ব্যুরো

সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর ওজন হয় আড়াই থেকে সাড়ে তিন কেজির মতো। কিন্তু সস্প্রতি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এক মা ৯০০ গ্রাম ওজনের এক শিশুর জন্ম দিয়েছেন। মৃতপ্রায় এই শিশুকে বাঁচাতে একাধিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেন দিনমজুর বাবা। জানতে পারেন চিকিৎসা ব্যয় দাঁড়াবে লাখ টাকার বেশি। এ অবস্থায় শিশুকে গ্লোবাল হাটহাজারী হাসপাতালে নিয়ে যান জসিম উদ্দিন। এরপর হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের পরিচালক ডা. শহীদুল্লাহ চৌধুরীর পদক্ষেপে বেঁচে যায় শিশুটি। গত ২৫ জুলাই জন্ম নেওয়া শিশুটি এখন পুরোপুরি সুস্থ।

জন্মের সময় নবজাতকের ওজন দুই হাজার ৫০০ গ্রামের কম হলে তা ‘লো বার্থ ওয়েট’ বা ‘কম ওজন নিয়ে জন্ম বলা হয়।’ কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুরা খুব সহজেই রোগাক্রান্ত হয়। তাই তাদের মৃত্যুঝুঁকি স্বাভাবিক ওজনের শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের গ্রামগুলোতে শতকরা ৩০ ভাগ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়। কিন্তু এসব শিশুর চিকিৎসার জন্য উপজেলা বা গ্রামে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নেই। যার কারণে প্রতিবছর অনেক শিশু কম ওজন জনিত কারনে মারা যায়। এ ছাড়া এ চিকিৎসার ব্যয় ও অনেক। যা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না।

এমন নাজুক পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে নবজাতকের স্বাস্থ্য নিয়ে আশার আলো ছড়াচ্ছেন ডা. শহীদুল্লাহ চৌধুরী। নিজের স্বল্প আয়োজন নিয়ে প্রান্তিক জনসাধারণের মাঝে অকাতরে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। শহরের যে কোনো হাসপাতাল ও ক্লিনিকে লো

বার্থ ওয়েট বেবি বা কম ওজনের শিশুর চিকিৎসা ব্যয় যেখানে লাখ টাকারও বেশি। সেখানে গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য ডা. শহীদুল্লাহ চৌধুরী নেন মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।

গ্লোবাল হাটহাজারী হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। নার্সদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসা নেওয়া তিনটি শিশুই লো বার্থ ওয়েট বেবি।

শিশুদের স্বজনরা জানালেন, তারা নিতান্তই দরিদ্র। শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সময়-সামর্থ্য কোনোটাই তাদের নেই। কিন্তু ডা. শহীদুল্লাহ চৌধুরী নাম মাত্র খরচে এসব শিশুদের চিকিৎসা করতে রাজি হয়েছেন। তাই তারা এখানে এসেছেন। জান্নাতুল নামের এক মা জানালেন, এখানে তার নবজাতকটিকে নিয়ে না আসা হলে হয়তো তাকে বাঁচানোই সম্ভব হতো না। কারণ তার স্বামীর পক্ষে শহরের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।

উপজেলার সরকারহাট থেকে বোনের নবজাতককে নিয়ে এসেছেন আয়েশা আক্তার। বর্তমানে শিশুটিকে ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছে। আয়েশা আক্তার জানালেন, তিনি শিশুটিকে নিয়ে এসেছেন বেশ কয়েকদিন আগে। যখন শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তখন তার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। অনেকেই বলছিল শিশুটিকে বাঁচানো যাবে না। আবার কেউ বলেছেন খরচ অনেক। তবে মিথ্যে বলে লাভ নেই। এখন পর্যন্ত ডাক্তার সাহেব এক পয়সাও নেননি। তিনি বলছেন ‘আগে শিশুটি সুস্থ হোক।’

শহরের হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চাইতে এত কম খরচে কিভাবে এই সেবা দিচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. শহীদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমি শিশুদের নিয়ে ব্যবসা করতে রাজি নই। যা করছি এক মাত্র দরিদ্র মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে। এ চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। তবে আমার ফিসহ কিছু খরচ বাদ দিয়ে ন্যূনতম ওষুধ খরচটাই শুধু রাখি।’

তিনি আরো বলেন, ‘যেসব নবজাতক কম ওজন নিয়ে জন্মায় তাদের প্রয়োজন হয় তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা। নয়তো অধিকাংশ সময় নবজাতককে বাঁচানো সম্ভব হয় না। অথবা বাঁচলেও শিশুটি বিকলাঙ্গ হবার ঝুঁকি থেকে যায়। কিন্তু গ্রামের কোনো হাসপাতালে এই চিকিৎসা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব নবজাতককে শহরের হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু গ্রাম ও শহরের দূরত্ব অনেক। সময় ক্ষেপণের কারণে নবজাতকদের বাঁচানো সম্ভব হয় না।’

‘এ ছাড়া নবজাতকের চিকিৎসার বিষয়টিতে ঝুঁকি থাকায় সহজে কেউ এ পথে এগিয়ে আসে না। যদিও আশপাশের হাসপাতালগুলোতে অনেক শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রয়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা কম ওজনের শিশুদের শহরের হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।’

শিশু স্বাস্থ্যের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এ মানুষটি ২০০১ সালে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৬ সালে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিশু স্বাস্থ্যে বিশেষ সনদও লাভ করেন তিনি।

নবজাতকের চিকিৎসা ব্যয় বহন ও প্রান্তিক জনগণকে এ সেবা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. শহীদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সমাজের সচেতন ও বিত্তশালীদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। কেন না কম ওজনের নবজাতকের চিকিৎসা ব্যয় অনেক। যা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া সময়ও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই অন্তত উপজেলাগুলোতে এই চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

"