চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর

ভাসমান কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

কেরানীগঞ্জের পানগাঁও বন্দর থেকে ফিরে গাজী শাহনেওয়াজ

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কার্যক্রম গতিশীল করতে বন্দরের বহির্নোঙরে ভাসমান কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আগামী দেড় বছরের মধ্যে এটির কাজ শেষ করে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরুর তাগিদ দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ গ্রহণ করুন, এর জন্য অর্থায়ন করবে সরকার। কারণ এটি হবে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

রাজধানীর উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জে পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল (পিআইসিটি) বন্দরের সর্বোত্তম ব্যবহারের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে গত সোমবার বন্দরের অভ্যন্তরে মতবিনিময় সভায় চবকের পাশাপাশি অন্যান্য বন্দরের কার্যক্রমে গতিশীল করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী এই নির্দেশ দেন। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাজাহান খান ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায়। আর চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান প্রজেকশনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ এই বন্দরের কার্যক্রম তুলে ধরেন। সভায়, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, বিজিএমইএ, বিকেএমইয়ে, বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান, কাস্টম কর্মকর্তাসহ রফতানি-আমদানি করা ব্যবসায়ী নেতা শিল্প মালিকরা অংশ নেন।

পানগাঁও বন্দরে পণ্য পরিবহনে সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে এই সভা হলেও এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী কোনো মন্তব্য না করে চবকের বহির্নোঙরে ভাসমান কনটেইনার (ফ্লটিং টার্মিনাল) স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, আমি এখানে বসে সমস্যাগুলো শুনলাম। আর এখানে একটা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বন্দরের আউটারে একটা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করার। আমার মনে হয়েছে এটাই সবচেয়ে বেশি আদর্শ প্রকল্প। বন্দর কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা এটির কার্যক্রম দ্রুতই গ্রহণ করেন। অর্থায়ন সরকার করবে। বন্দরের বাকি কাজ সম্পন্ন করবেন আপনারা (কর্তৃপক্ষ)।

এমপি লিটন চৌধুরী বলেন, আলোচনা পানগাঁও ও চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে। এই বন্দরে যেসব সমস্যা হচ্ছে সেটা যাতে না হয় সে জন্য পানগাঁও বন্দরকে সচল করতে হবে। চবকের সমস্যা তুলে ধরে এই ব্যবসায়ী এমপি বলেন, এখানের যেসব সমস্যা রয়েছে প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি কেনা হলেও সমস্যার ৫-১০ শতাংশ সমাধান সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের যে সমস্যা তা যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এখনই অন্য বন্দরগুলোর সমস্যা সমাধান করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য পলিসি নির্ধারণ করতে হবে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে বন্দর নির্মাণের প্রস্তাব খুবই ভালো।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দীন) বলেন, চট্টগ্রাম থেকে পানগাঁওয়ে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে খরচ এবং সময় দুটিই বড় সমস্যা। তাই পণ্য পরিবহনে ও খালাসে ব্যয় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য যদি সরকারের ভর্তুকি দিতে হয় তা-ও দিতে হবে।

এদিকে, ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দরের নানা সমস্যা তুলে ধরেন। তারা বলেন, পানগাঁওয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে কোনো ব্যবসায়ীই চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী হতেন না। এ সময় তারা পানগাঁও বন্দরের নানা সমস্যা তুলে ধরেন। কাপড় ব্যবসায়ী বাদশা মিয়া চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যা তুলে ধরে বলেন, রফতানি পণ্য একমাত্র চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হওয়ার কারণে আমরা ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে পড়েছি। যথাসময়ে পণ্যের বাহন বন্দরে পৌঁছাতে না পারলে কোনো ছাড় পাওয়া যায় না। তবে পানগাঁও বন্দরে আমদানি-রফতানির পরিবেশ তৈরি হলে এই বন্দরের কার্যক্রম দ্রুত বৃদ্ধি পেত। কিন্তু অবকাঠামো সুযোগের অভাবের কারণে এখানে পণ্য পরিবহন নিয়ে নানা জটিলতা হচ্ছে। নিজের শিল্প কারখানার উদাহরণ টেনে এই ব্যবসায়ী বলেন, এখানে মাত্র দুটি ফক লিফট রয়েছে যার একটি নষ্ট। ওয়েব্রিজ রয়েছে মাত্র একটি। অথচ তার প্রতিষ্ঠানে ফক লিফট রয়েছে ১৫-২০টি। আর ওয়েব্রিজ রয়েছে ৫টি। তিনি বলেন, এখানে ব্যবসায়ীদের আগ্রহী করতে শুল্ক কমানো হলেও তাদের কোনো লাভ হচ্ছে না। উল্টো চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কন্টেইনারে যেখানে ঢাকা থেকে পণ্য পৌঁছাতে খরচ হচ্ছে এক হাজার টাকা, সেখানে পানগাঁও থেকে অতিরিক্ত ২-৩ হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। এই বন্দর থেকে শুধু আমদানি নয়, রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন করা জাহাজ কর্তৃপক্ষের ব্যয় কমানোর জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে বন্দরের সমীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্দরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এখানে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও বন্দরটিকে সঠিকভাবে মেলে ধরতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। দেখা গেছে, তামাদি কন্টেইনারের ওপর ১০দিন ফ্রি টাইম প্রদানসহ স্টোরেজ চার্জ কমানো, শুল্ক ৫০-৭০ শতাংশ হ্রাস এবং লোডিং ডিসচার্জ চার্জ ৭০ শতাংশ মওকুফ করা হয়েছে। তবু অবকাঠামোসহ নানা জটিলতায় বন্দর ব্যবহারে ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হচ্ছেন না।

"