প্রশিক্ষণের নামে শিক্ষা কর্মকর্তাদের অপচয়

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

হাসান শান্তনু

শিক্ষা কর্মকর্তাদের লাগামহীন অনিয়ম চলছে। শিক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকা বাজেটের অপচয় চলছে বিলাসী কায়দায়। কর্মকর্তারা খেয়াল খুশিমতো বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন ‘প্রশিক্ষণের’ নামে। যাদের জন্য এসব প্রশিক্ষণ, সেই শিক্ষকদেরই সেখানে অন্তর্ভুক্তি থাকছে না। একই কর্মকর্তা একাধিকবার বিদেশে যাচ্ছেন প্রশিক্ষণের নামে। দেশেও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আড়ালে কর্মকর্তারাই বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করে চলেছেন। বছরের পর বছর এসব টাকা খরচ হলেও অনেক প্রকল্পই আলোর মুখ দেখছে না। জবাবদিহিতার বালাই নেই, তাই এসব অনিয়ম লাগামহীন হয়ে উঠছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়।

এক শ্রেণির শিক্ষা কর্মকর্তার ‘প্রশিক্ষণের’ নামে বিদেশ ভ্রমণ চলছেই। নামে ‘শিক্ষক প্রশিক্ষণ’ হলেও সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা অংশ নিচ্ছেন নামেমাত্র। শিক্ষাখাতে বিভিন্ন প্রকল্প চলমান থাকায় কোনো না কোনো প্রকল্প থেকে প্রতি মাসে প্রশিক্ষণের নামে আয়োজন করা হচ্ছে বিদেশ ভ্রমণের। কেউ কেউ এক সফর শেষে দেশে নেমে আবার চলে যাচ্ছেন অন্য দেশে। এতে অপচয় হচ্ছে সরকারি টাকা। নিয়ম অনুযায়ী, দেশে ফিরে তাদের মধ্যে অনেকে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন জমা দিচ্ছেন না।

সরকারি কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ গেলে দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কাছে সেই প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু জানাতে হয়। মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ করতে হয়। এমনকি প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে দফতরের অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে কর্মশালা করতে হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও তার অধীন কর্মকর্তাদের সেই ধরনের কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না। এসব ঘটনায় অসন্তোষ বাড়ছে শিক্ষা প্রশাসনে।

সূত্র জানায়, শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে গত রোববার এক দিকনির্দেশনামূলক সভায় শিক্ষামন্ত্রীর সামনে অভিযোগ করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) কর্মকর্তারা। মন্ত্রী এ সময় কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে কথা বলেন। তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু পরিচালকের (পিডি) অদক্ষতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি এ ধরনের কর্মকর্তাদের পরিবর্তনের আভাস দেন। ১৯ জুলাই মাউশির প্রকল্পগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সভাকক্ষে মন্ত্রীর আরেকটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা কাজে আসছে না। বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষকরা, মাঠ পর্যায়ে এই প্রশিক্ষণের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ভ্রমণের নামে ‘অটিস্টিক একাডেমি স্থাপন প্রকল্পের’ বাজেট আত্মসাৎ চলছে সাড়ে গত তিন ধরে। ব্যয় চলতে থাকলেও প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। ৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের ভবন স্থাপনের জন্য সরকার পূর্বাচলে জায়গা বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পটির প্রথম তিন বছর কেটে যায় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ভ্রমণের নামে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পরের ছয় মাসও একইভাবে টাকা খরচ চলতে থাকে।

কর্মপরিকল্পনা, কিছু দিবস পালন ও প্রশিক্ষণেই শেষ হয়ে যায় প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ। এই প্রকল্পে লাখ লাখ টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ জোরালো হওয়ায় মাউশি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি গঠনের দুই বছর পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। ‘থলের বেড়াল বেরিয়ে যাওয়ার’ আশঙ্কায় প্রতিবেদনের খসড়া চূড়ান্ত হলেও তা আলোর মুখ দেখছে না বলে সূত্র জানায়।

তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে বাজেট আত্মসাতের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন হয় ‘সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ (সেসিপ) ও ‘টিচিং কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট-২’ (টিকিউআই-২) শিরোনামের দুটি প্রকল্পে। সৃজনশীল পদ্ধতির পাঠদান ও প্রশ্নপত্র তৈরিতে শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য মাউশি বাস্তবায়ন করছে সেসিপ। শিক্ষাক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ বাজেটের প্রকল্প। সৃজনশীল পদ্ধতি জানার জন্য বিদেশেও ‘প্রশিক্ষণ’ নিয়েছেন অনেক সরকারি কর্মকর্তা। তাদের অভিজ্ঞতাও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছেন না বলে অভিযোগ আছে।

সেসিপ প্রকল্পের বরাদ্দের মোটা অংশ খরচ হয়ে গেলেও এখনো দেশের বেশিরভাগ শিক্ষক রয়ে গেছেন প্রশিক্ষণের বাইরে। শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদানরত মোট শিক্ষক দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৩ জন। এর মধ্যে ৭১ হাজার ৭০২ জন শিক্ষক কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন। এ হিসাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ শিক্ষক এখনো অপ্রশিক্ষিত। প্রশ্ন উঠেছে, প্রশিক্ষণের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও শিক্ষকরা কেন সৃজনশীল বিষয়টি বুঝতে পারছেন না।

জানা যায়, বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার ঋণে পরিচালিত সেসিপ ও টিকিউআই-২ প্রকল্পের প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের জন্য রাখা হয় বড় অঙ্কের সম্মানী। প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিক্ষা কর্মকর্তাদের ও শিক্ষকদের জন্য আয়োজন করা হলেও সেখানে রাখা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। প্রকল্পের অধীনে আয়োজিত কর্মশালা, সভা ও প্রশিক্ষণে চলে অর্থ অপচয়ের মহড়া।

অংশগ্রহণকারীদের গণহারে ‘সম্মানী’ দেওয়া হয়। ফলে এই প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। এমনকি মাউশির কর্মকর্তারাও সাহস পান না মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশ্ন তুলতে। এ প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্বে থাকা মাউশির মহাপরিচালক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান দাবি করেন, ‘শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যারা এখনো প্রশিক্ষণের বাইরে আছেন, তাদেরকে পর্যায়ক্রমে তা দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণে কোনো অনিয়ম হয়নি।’

আইসিটি শিক্ষা প্রকল্পেও প্রশিক্ষণের নামে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ৩০৫ কোটি টাকার সরকারি এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মাধ্যমিক স্তরের ২০ হাজার ৫০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি করে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, স্পিকার ও ইন্টারনেট মডেম (সিমসহ) দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষ করতে মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষককে দুই সপ্তাহ মেয়াদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ১৪ দিনের প্রশিক্ষণের নামে লাখ লাখ টাকা খরচ হলেও অনেক শিক্ষক নিজেই প্রযুক্তি বিষয়ে ভালোমতো আয়ত্ত করতে পারেননি। মানহীন এই প্রশিক্ষণ আয়োজনে শুধু অর্থের অপচয় হয়েছে। কারণ প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে আইসিটি ক্লাস নিতে পারছেন না।

অন্যদিকে, ‘টিচার অ্যাক্রিডিটেশন’ বিষয়ক দুই মাসের এক প্রশিক্ষণে সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডে গিয়েছিলেন ১৪ জন শিক্ষা কর্মকর্তা। অথচ সেখানে তাদের মধ্যে একজন শিক্ষকও ছিলেন না। মাউশির একজন সিনিয়র কম্পিউটার অপারেটরও ছিলেন এই দলে। টিকিআই-২ এর অধীনে মাউশির কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর এক প্রশিক্ষণে ১৩ জন কর্মকর্তা ফিলিপিনসে যান দুই মাস আগে। এর কিছুদিন আগে একই বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে ১৯ কর্মকর্তা অস্ট্রেলিয়ায় যান। একই বিষয়ের প্রশিক্ষণ হলেও একই ব্যক্তিরাও পরপর দুবার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। যারা সুযোগ পায়নি, তাদের কোনো প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়ার প্রশিক্ষণটি মাউশির জন্য হলেও সেখানে বেশি ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা। গত মার্চে টিকিআই-২ এর অধ্যয়নে নিউজিল্যান্ডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন ১৬ জন কর্মকর্তা।

"