তীর্থস্থান অমরনাথ খুঁজে পেয়েছিলেন এক মুসলিম

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

হিন্দু পুরাণে বর্ণিত অমরনাথ গুহা প্রায় ৫০০ বছর আগে খুঁজে বের করেছিলেন এক মুসলমান মেষপালক। শ্রীনগরে বিবিসির সংবাদদাতা মাজিদ জাহাঙ্গীর লিখেছেন, হিন্দুদের কাছে এই পবিত্র তীর্থস্থানের সঙ্গে মুসলমানদের নিবিড় সম্পর্ক বহু শতকের।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থস্থান ভারতশাসিত কাশ্মীরের এই অমরনাথ গুহা। প্রতি বছর লাখো মানুষ দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পেরিয়ে খুব কষ্ট করে পৌঁছান ওই গুহায়।

কিন্তু হিন্দু পুরাণে বর্ণিত অমরনাথ গুহা প্রায় ৫০০ বছর আগে খুঁজে বের করেছিলেন একজন মুসলমান মেষপালক। বুটা মালিক নামের ওই মেষপালকের পরিবার তাই এখনো এই হিন্দু তীর্থযাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকেন প্রতি বছর। তার বংশধরেরা এখনো বাস করেন পহেলগাঁওয়ের কাছে বটকোট নামের একটি গ্রামে।

পরিবারের সপ্তম পুরুষ গুলাম হুসেইন মালিক বলছিলেন যে তারা পারিবারিক ইতিহাস থেকেই জেনেছেন, কিভাবে বুটা মালিক খুঁজে পেয়েছিলেন অমরনাথ গুহা।

‘ঘটনাটা শুনতে একেবারে পৌরাণিক কাহিনির মতো। বুটা মালিক মেষ পালন করতেন। দূরের পাহাড়-পর্বতে ভেড়া-ছাগল চড়াতে যেতেন তিনি। সেই পর্যায়েই এক সাধুর সঙ্গে তার দেখা হয়। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়’-বিবিসিকে বলছিলেন মালিক। তার বংশধরেরা এখনো বাস করেন পহেলগাঁওয়ের কাছে বটকোট নামের একটি গ্রামে।

একবার প্রবল শীতের হাত থেকে বাঁচতে বুটা মালিক একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সঙ্গে ওই সাধুও ছিলেন। ভেতরেও খুব ঠান্ডা লাগছিল বুটা মালিকের। তখন ওই সাধু একটা কাঙ্গরি দিয়েছিলেন বুটা মালিককে। কাশ্মীরে শীতের হাত থেকে রক্ষা পেতে মানুষজন একটা ছোট ঝুড়ির মধ্যে কাঠকয়লার আগুন জ্বালিয়ে ঢোলা পোশাকের ভেতরে রেখে দেন। ওই ঝুড়িকেই কাঙ্গরি বলে। গুলাম হুসেইন মালিক বলছিলেন, ‘সকালবেলায় বুটা দেখেছিলেন যে ওই কাঙ্গরিটা একটা সোনার কাঙ্গরি হয়ে গেছে।’ মালিকের পারিবারিক ইতিহাস বলছে, গুহা থেকে বের হতেই বুটা মালিক দেখেন সামনে অনেক সাধু-সন্তের একটা মিছিল চলছে। তারা ভগবান শিবের খোঁজ করছিলেন ওখানে। ‘বুটা মালিক ওই সাধু-সন্তদের জানান যে ভগবান শিবের সঙ্গে তার একটু আগেই দেখা হয়েছে গুহার ভেতরে। সাধুদের তিনি গুহায় নিয়ে যান। দেখা যায় বরফের তৈরি এক বিশাল শিবলিঙ্গ রয়েছে, সঙ্গে পার্বতী আর গণেশও আছেন’-জানাচ্ছিলেন গুলাম হুসেইন মালিক। ওই ঘটনার কথা জানাজানি হতেই অমরনাথে তীর্থযাত্রা শুরু হয়। তবে একটা সময়ে বেশ কয়েকজন সাধুসন্ত গুহার পাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। তখন সেখানকার মহারাজ রঞ্জিত সিং অমরনাথ যাত্রা বন্ধ করে দেন। অমরনাথ যাত্রার সময়ে ভক্তদের দান করা অর্থের এক-তৃতীয়াংশ বুটা মালিকের পরিবার পেত।

‘আমরা তো মুসলমান। হিন্দুদের পূজা-পাঠের ব্যাপারে আমাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই জানতেন না। যাত্রা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে পাশের গণেশ্বর গ্রাম থেকে কয়েকজন কাশ্মীরী পন্ডিতকে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের পরিবারের সদস্যরা। তারাই অমরনাথে পূজা চালিয়ে যেতে থাকেন’-জানালেন মালিক। এখনো অমরনাথে তিন ধরনের মানুষ বাস করেন-কাশ্মীরি পন্ডিত, মালিক পরিবার আর সাধুসন্তরা। এরাই অমরনাথ যাত্রার সূচনা করেন ‘ছড়ি-মুবারক’ শোভাযাত্রার মাধ্যমে।

যে গ্রামে মালিক পরিবার এখনো থাকেন, পহেলগাঁও এলাকার সেই গ্রামের নামও বুটা মালিকের নাম অনুসারেই - ‘বটকোট’।

‘একসময়ে অমরনাথ তীর্থযাত্রীরা পায়ে হেঁটে আমাদের গ্রামে পৌঁছতেন। গ্রামের মহিলা, পুরুষ, বাচ্চা-সবাই মিলে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। ছড়ি-মুবারক শোভাযাত্রা দেখতে গোটা গ্রাম অপেক্ষা করে থাকত। মেয়েরা কাশ্মীরি গান গাইত। আমরাই হিন্দু তীর্থযাত্রীদের গুহায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতাম। আবার গুহা থেকে নেমে আমাদের গ্রামে এসে অনুমতি নিয়ে ফিরে যেতেন তীর্থযাত্রীরা। হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ কখনোই ছিল না’, বলছিলেন মালিক।

হিন্দু তীর্থযাত্রীরা যেহেতু অমরনাথ যাত্রার সময়ে আমিষ খান না, তাই মালিক পরিবারের সদস্যরা ওই সময়ে মাংস খান না।

সংস্কৃত ভাষায় কবি কল্হনের লেখা কাশ্মীরের ইতিহাস রাজতরঙ্গিনীতেও মালিক পরিবারের যেমন উল্লেখ রয়েছে, তেমনই অমরনাথ যাত্রা নিয়ে জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভায় যে আইন পাস হয়েছে, সেখানেও মালিক পরিবারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

অমরনাথ যাত্রার সময়ে ভক্তদের দান করা অর্থের এক-তৃতীয়াংশ বুটা মালিকের পরিবার পেত। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে অমরনাথ শ্রাইন বোর্ড তৈরি হওয়ার পর থেকে আমাদের পরিবারকে যাত্রার সব রকম কাজ থেকে দূরে রাখা হয়। আমাদের বলা হয়েছিল মুসলমানদের ওয়াক্ফ বোর্ডে তো কোনো হিন্দু নেই, তাই শ্রাইন বোর্ডে মুসলমান কি করে থাকে!’, জানিয়েছেন গুলাম হুসেইন। হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ঘোড়ায় অথবা ডুলিতে করে কঠিন পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে নিয়ে যান যারা, তারাও সবাই স্থানীয় মুসলমান।

"