নতুন ইউনিফর্ম নিয়ে সেবিকাদের অসন্তোষ

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৭, ০০:০০

পাঠান সোহাগ

নতুন ইউনিফর্ম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারি হাসপাতালের সেবিকারা (নার্স)। নতুন পোশাক রুচিবোধ, দেশীয় সংস্কৃতি ও কর্মসহায়ক নয় বলে মনে করছেন তারা। অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সেবিকারা আর বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন তরুণরা। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২৯ অক্টোবর ২০১৫ ড্রেসকোড পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। আগের ব্যবহৃত পোশাকের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্য রেখে পোশাকের রং ও ডিজাইন করা হয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের নিদের্শনা অনুযায়ী, সেবিকাদের পদ ও পদবি অনুসারে চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে এই নতুন ইউনিফর্ম পরতে বলা হয়। পুরোনো সাদা পোশাকের বদলে জলপাই রঙের পাড়বিহীন শাড়ি অথবা শার্ট, একই রঙের ব্লাউজ, কালো প্যান্ট, কালো রঙের জুতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সঙ্গে সাদা অ্যাপ্রোন ও কালো নেমপ্লেট পরতে বলা হয়। জেলা পাবলিক হেলথ নার্সদের জন্য নির্ধারণ করা হয় হালকা বেগুনি রঙের পাড়বিহীন শাড়ি অথবা শার্ট, একই রঙের ব্লাউজ, কালো প্যান্ট, কালো রঙের জুতা, সঙ্গে সাদা অ্যাপ্রোন ও কালো নেমপ্লেট। এ ছাড়া সিনিয়র, জুনিয়র নার্স ও স্টাফ নার্স, সহকারী নার্সরা পরবেন জলপাই রঙের শার্ট ও টুপি, কালো প্যান্ট, কালো রঙের জুতা ও কালো নেমপ্লেট। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যালের নার্সিং ইনচার্জ রোকেয়া বেগম জানান, নতুন এই পোশাক নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সেবিকারা আগের সাদা শাড়িকেই রুচিশীল মনে করছেন। আমরা এই পোশাক এখনো চালু করিনি। নার্সিং পেশার সঙ্গে শত বছরের ঐতিহ্য মিশে আছে। আমাদের নার্সরা প্যান্ট ও শার্ট পরতে মোটেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ নার্সেস অ্যসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. জামাল উদ্দীন বাদশা জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নতুন পোশাক হয়েছে। কারো কাছ থেকে মতমত নেওয়া হয়নি। যাচাই-বাছাই করা হয়নি এমন পোশাকে নার্সদের অনীহা আছে কি না। কিন্তু কেউই প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টা উপস্থাপন করার সাহস পাচ্ছেন না। তিনি আরো জানান, অধিদফতরের কর্মকর্তা কর্মচারীদেরও একই পোশাক পরতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি যেমন পোশাক পরে। কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ঐতিহ্যবাহী সাদা ইউনিফর্ম পুনর্বহালের দাবিতে কয়েকবার মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অনেকেই জলপাই রঙের ইউনিফর্ম নার্সদের জন্য মর্যদা হানিকর বলে জানান।

যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নার্স সালমা আক্তার ওমরা হজে যাওয়ার জন্য অধিদফতরে ছুটির কাগজ স্বাক্ষর করাতে এসেছেন। বর্তমান ইউনিফর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেবিকাদের প্রতি সমাজের সাধারণ মানুষের একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তার ওপর বর্তমানে যে ড্রেস চালু করা হলো তাতে আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো। সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যালের সিনিয়র নার্স জেবুন্নাহার জানান, দীর্ঘদিন এই পেশায় কাজ করছি। সাদা ড্রেসে ময়লা লাগলে সহজেই তা বোঝা যায়। কিন্তু এখন যে পোশাক চালু হচ্ছে তাতে জীবাণু লেগে থাকলেও বোঝার উপায় নেই।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও হাসপাতালের একাধিক নার্স জানান, হঠাৎ করেই শাড়ির বদলে শার্ট-প্যান্ট যেমন সামাজিক জীবনে প্রভাব পড়বে, তেমনি রোগীর সেবাদান কাজে ঘটবে বিঘœ। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানিয়ে বর্তমানের মার্জিত সাদা রঙের পোশাক পরিবর্তনে আপত্তি জানিয়েছেন তারা।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের পরিচালক নাসিমা আকতার বলেন, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইউনিফর্মকে আরো আধুনিক ও রোগীবান্ধব করা হয়েছে। অনেক নার্স শাড়ি পরে ডিউটি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। সরকারি হাসপাতালগুলো শয্যা সংকুলান না হওয়ায় ফ্লোরে ও বারান্দায় হাঁটু গেড়ে বসে রোগীদের ইনজেকশন পুশসহ বিভিন্ন সেবা দিতে হয়। শাড়ি পরে সেবা দিতে নানা সমস্যা হয় বলে প্যান্ট-শার্ট চালু করা হয়েছে।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের মহাপরিচালক তন্দ্রা সিকদার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শন করে লক্ষ করেন সেবা দেওয়ার সময় শাড়ি পরে সেবা দিতে গেলে পোড়া রোগিদের শরীরে লাগে। সে সময় রোগী ও নার্স দুজনই বেশ অস্বস্তিবোধ করেন। তখনই রোগী ও সেবিকাদের সুবিধার জন্য প্রয়োজনে প্যান্ট ও শার্টের জন্য নির্দেশ দেন তিনি। উনার নির্বাহী আদেশে এই ড্রেস পরতে বলা হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, সিনিয়র স্টাফ নার্সদের বাধ্যতামূলক পরতে হবে। অনেক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানেই প্যান্ট-শার্ট পরে মেয়েরা দিব্যি কাজ করছেন। উন্নত দেশগুলো ছাড়াও বর্তমানে প্রাইভেট ও বেসরকারি মেডিক্যাল হাসপাতালসহ মিডফোর্ড, খুলনা, যশোর ও বগুড়া জেলার সকল সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এই ইউনিফর্ম পরে কাজ করছে। সেখানে তো অসুবিধা হচ্ছে না। সবার আগে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নার্সিং সুপারভাইজার অধিদফতরের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা চাইলে জলপাই বা সাদা রঙের পাড়বিহীন শাড়ি পরতে পারবেন।

"