নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা

ভিড় বেশি কমলাপুর গাবতলীতে

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৭, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরবে অসংখ্য মানুষ। তাই রেল, বাস ও লঞ্চের আগাম টিকিট বিক্রিও শুরু হয়ে গেছে। গতকাল শুক্রবার ছিল ছুটির দিন। তাই আগাম টিকিট কিনতে কেউ ছুটেছেন লঞ্চ টার্মিনালে, কেউ রেলস্টেশনে আবার কেউ বা গিয়েছেন বাস টার্মিনালে। গতকাল টিকিট প্রত্যাশীদের বাড়তি চাপ ছিল কাউন্টারগুলোতে ।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, আগাম টিকিট নিতে রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় থাকলেও টিকিট প্রত্যাশীদের কোনো ভিড়ই ছিল না সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। গত বৃহস্পতিবার থেকে নৌ পথে লঞ্চের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার টিকিট বিক্রির দ্বিতীয় দিন সদরঘাটে গিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের ভিড় দেখা যায়নি। এমনকি বেশিরভাগ টিকিট কাউন্টার বন্ধ ছিল। দু-একজন যারা এসেছেন তারা স্বাচ্ছন্দ্যে টিকিট কেটে বাড়ি ফিরছেন।

অথচ ঠিক উল্টো-চিত্র রাজধানীর কমলপুর রেলওয়ে স্টেশন ও গাবতলী বাস টার্মিনালে। ঈদে বাড়ি যাওয়ার আগাম টিকিট পেতে রীতিমতো ‘যুদ্ধ’ করছেন তারা। দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে কেউ নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার ‘সোনার হরিণ’ খ্যাত সেই প্রত্যাশিত টিকিটটি পেলেও বেশিরভাগ মানুষকেই নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। কেউ কেউ আবার পরিচিত কিংবা কালোবাজারিদের কাছ থেকে বেশি দামে ট্রেন-বাসের টিকিট সংগ্রহ করেছেন। অনেকে গত বছরের মতো এবারও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টিকিট কেটে রেখেছেন। আবার কেউ কেউ নিয়মিত রুটে চলাচল করায় স্টাফদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হওয়ায় তাদের মাধ্যমেও টিকিট ম্যানেজ করেছেন। সব মিলিয়ে আগাম টিকিট বিক্রির সূচি ঘোষণা করলেও কখনোই সরদঘাটে উপচেপড়া ভিড় দেখা যায় না ঘরমুখো মানুষের। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আর এ জন্যই লঞ্চ টার্মিনালের কাউন্টারগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় নেই।

লঞ্চ কাউন্টারগুলোতে দায়িত্বরতরা বলেছেন, শনিবার থেকে ক্রমান্বয়ে কয়েকটি কাউন্টার খোলা হতে পারে। মূলত এই রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোতে আগে থেকেই লঞ্চে উঠার পর টিকিট ক্রয়ের সংস্কৃতি চালু রয়েছে। তাই আগেভাগে টিকিট কাটতে আসেন না বাড়িফেরা মানুষরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লঞ্চের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে অনেকেই টিকিট সংগ্রহ করেন। আর এ সুযোগে মোবাইলে টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে- দাবি করে লঞ্চ ছাড়ার আগ মুহূর্তে চড়া দামে বিক্রি করে কয়েকটি কোম্পানি। তবে গত কয়েক বছর ধরে এ রুটে চলাচলকারীদের টিকিট কালোবাজারির সংখ্যা অনেকটা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সদরঘাট টার্নিমালে মেসার্স পদ্মা ওয়াটার ওয়েজের কাউন্টারে দায়িত্বরত মিন্টু বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৬টি টিকিট বিক্রি করেছি। তবে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অধিকাংশ যাত্রী টিকিট কিনেছেন। তাই যানজটসহ অন্যান্য কারণে অনেকেই কাউন্টারে আসেন না। মেসার্স জাহিদ শিপিং লাইনসের একটি কাউন্টারও খোলা রয়েছে সদরঘাটে। কাউন্টার মাস্টার জানান, দ্বিতীয় দিনে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৮টি টিকিট বিক্রি হয়েছে।

কমলাপুরে টিকিট প্রত্যাশীদের দীর্ঘলাইন : ঈদে ঘরমুখী মানুষের জন্য আগাম টিকিট দেওয়ার শেষ দিনে ভিড় বেড়েছে আরো বেশি। টিকিট প্রত্যাশীদের লাইন স্টেশন চত্বর ছাড়িয়ে সড়কে গিয়ে ঠেকেছে। গতকাল শুক্রবার দেওয়া হয়েছে ২৫ জুনের আগাম টিকিট। একযোগে ২৩টি কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরু হয় সকাল ৮টায়। এদিন প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার টিকিট বিক্রি হয়েছে। নিয়মিত ট্রেনের পাশাপাশি রাজশাহী, পার্বতীপুর ও দিনাজপুরগামী বিশেষ ট্রেনের টিকিটও দেওয়া হয়েছে। টিকিট কেনার শেষ দিন ছিল গতকাল। তাই টিকিট প্রত্যাশীদের চাপও ছিল বেশি। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইন ছোট হয়ে আসে।

স্টেশনেই কথা হয় টিকিট প্রত্যাশী আল আমিনের সঙ্গে। তিনি আগের দিন সন্ধ্যায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। আল আমিন বলেন, ঈদে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য এত কষ্ট করা। টিকিট পেয়েছি এতেই খুশি। অনেক ভালো লাগছে। রাজশাহীর ধূমকেতুর টিকিট নিতে এসেছেন সামিউল। তিনি বলেন, আমাদের ছুটি পরে হবে, প্রথম দিকে তাই টিকি নিতে পারি নাই। আগের দিন সন্ধ্যায় দাঁড়িয়েও দেখেন কত লোকের পরে সিরিয়াল। তবে কষ্ট যাই হোক, টিকিট পাচ্ছি নিশ্চিত, টিকিট পেলে সব যন্ত্রণা ভুলে যাব।

এদিকে, আগাম টিকিট বিক্রি প্রসঙ্গে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ২৬ জুনকে ঈদ ধরে আজই (গতকাল) শেষ হচ্ছে টিকিট বিক্রি। ৩১টি আন্তনগর ট্রেনের টিকিট সংখ্যা প্রথম দিন ছিল ২২ হাজার ১২২টি। দ্বিতীয় স্পেশাল ট্রেন দুটি যোগ হওয়ায় বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ১০০টি, তৃতীয় দিন আরো একটি স্পেশাল ট্রেন যোগ হওয়ায় তা বেড়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার।

সরকারি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ২৬ জুন ঈদ ধরে তার আগের দিন পর্যন্ত অগ্রিম টিকেট বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২৭ তারিখ ঈদ হলে ২৬ তারিখে যথারীতি ট্রেন চলবে। তবে সেদিনের টিকেট অগ্রিম পাওয়া যাবে না। তাৎক্ষণিকভাবে স্টেশন থেকেই কিনতে হবে। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার সিতাংশু চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, ঈদ ফেরত যাত্রীদের জন্য রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর ও লালমানিরহাট স্টেশন থেকে আগামী ১৯ তারিখ দেওয়া হবে ২৮ জুনের ফিরতি টিকিট, ২০ জুন দেওয়া হবে ২৯ জুনের টিকিট, ২১ জুন দেওয়া হবে ৩০ জুনের টিকিট, ২২ জুন দেওয়া হবে ১ জুলাইয়ের টিকিট এবং ২৩ জুন বিক্রি হবে ২ জুলাই ফিরতি টিকিট। কমলাপুর স্টেশন থেকে দিনে প্রায় ৫১টি ট্রেনের ৫০ হাজার টিকিট বিক্রি হয়, তার মধ্যে ৩১টি আন্তনগর ট্রেনের টিকিটের চাহিদা থাকে বেশি। এবার ঈদে সারাদেশে দুই লাখ ৬৫ হাজার যাত্রীর সেবা দেবে রেলওয়ে। পাশাপাশি চলবে সাত জোড়া স্পেশাল ট্রেন।

এদিকে, গত ১২ জুন থেকে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ৬০টিরও বেশি রুটে দূরপাল্লার বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখনো অনেক টিকিট প্রত্যাশী তা সংগ্রহ করতে পারেননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারণ গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালীর বাস কাউন্টারগুলো টিকিটের জন্য গিয়েও ফিরে আসেন অনেকে। কিন্তু টিকিট বিক্রি শুরুর একদিনের মাথায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, পছন্দের টিকিট না পাওয়া, টিকিট দিতে দেরি করাসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ উঠেছে। আর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন টিকেট কাউন্টারে দায়িত্ব পালনকারীরা। তারা বলেছেন, ঈদ উপলক্ষে টিকিটের দাম বাড়ানো হয়নি। গত ঈদে যে দামে টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল এবারও একই দামে বিক্রি করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করার পরও টিকিট না পেয়ে চলে যান অনেকে। আবার অনেক কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি হয় বলেও জানিয়ে দেওয়া হয় ক্রেতাদের।

"