পাউবো-ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা

মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ চ্যানেল হুমকির মুখে

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৭, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেল মংলা-ঘষিয়াখালী নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। একদিকে চ্যানেল সংলগ্ন নদী-খালগুলো খনন ও প্রশস্তকরণ, অন্যদিকে স্বল্প প্রশস্ত কালভার্ট নির্মাণের মতো পরস্পরবিরোধী প্রকল্প গ্রহণের ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থও অপচয় হবে। এর জন্য সরকারের দুইটি সংস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতাই দায়ী। এছাড়া নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ড্রেজিং কার্যক্রমের সময় বিপুল পরিমাণ সংরক্ষণ ড্রেজিংয়ের মাটি ফেলায় চ্যানেলটিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।

জানা গেছে, চ্যানেলটি নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখতে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় চ্যানেল সংলগ্ন ৮৩টি খাল ও টাইডাল বেসিন নির্মাণ প্রকল্পে ৭০৬ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বে থাকা ওই প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এর মধ্যেই ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সংশ্লিষ্ট নদী ও খালের ওপর ২৩টি ছোট কালভার্ট ও ব্রিজ নির্মাণের জন্য আরেকটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যাকে পরিবেশ ও পরস্পরবিরোধী উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে দেখছে সচেতন মহল।

চ্যানেল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন শেখ এই পরস্পরবিরোধী উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণে চ্যানেলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করলেও পাউবোর একজন নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে, এমন কোনো অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ করা হবে না বলে জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর এম মোজাম্মেল হক জানান, মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল সচল রাখতে প্রতিনিয়তই ড্রেজিং করা হচ্ছে। কারণ, এই চ্যানেলটি সাধারণ কোনো চ্যানেল নয়। এখানে প্রতি বছর ৪০-৪৫ লাখ টন পলি জমছে। সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যালা নদী দিয়ে নৌ চলাচল বন্ধ থাকার সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও এই চ্যানেল দিয়ে গত এক বছর ধরে নির্বিঘেœ জাহাজ চলাচল করছে।

গত ২৮ মার্চ নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সভাপতিত্বে বিআইডব্লিউটিএর আর্থিক, প্রশাসনিক এবং উন্নয়নমূলক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মংলা-ঘোষিয়াখালী নৌ চ্যানেলটি নানা রকম শঙ্কা ও হুমকির মুখে পড়েছে। পাউবোর ৮৩টি খাল ও টাইডাল বেসিন প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় এই হুমকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকল্পটির কাজে বিলম্ব ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে চ্যানেলের বিপুল পরিমাণ সংরক্ষণ ড্রেজিংয়ের মাটি ফেলায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ চ্যানেলে বর্তমানে ৬টি বেসরকারি ড্রেজার দিয়ে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এবং বিআইডব্লিউটিএর একটি ড্রেজারসহ মোট ৭টি ড্রেজার সংরক্ষণ ড্রেজিং কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। এতে চ্যানেলটির খননকাজসহ নদী সংলগ্ন খালের অবৈধ বাঁধ অপসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপর চ্যানেলটির টেকসই সচলকরণের জন্য গত ১০ জানুয়ারি নদীসহ ৮৩টি খাল খননের জন্য জাতীয় একনেক সভায় ৭০৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বিআইডব্লিউটিএর পর্যালোচনা সভায় পাউবোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দ্রুত কাজ শুরুর করার জন্য প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংযুক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ হওয়া মাত্রই খননকাজ শুরু হবে।

এদিকে, ৮৩টি খাল ও টাইডাল বেসিন প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু না হলেও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৭ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে ওই চ্যানেল সংলগ্ন নদী ও খালে ২৩টি ছোট আকারের কালভার্ট ও ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব কালভার্টের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৬০ ফুট, যা নদী-খাল খনন পরিকল্পনার সর্বনি¤œ প্রশস্ততার চেয়ে অনেক কম। তাই একদিকে নদী-খালগুলো খনন ও প্রশস্তকরণ, অন্যদিকে স্বল্প প্রশস্ত কালভার্ট নির্মাণকে পরস্পরবিরোধী উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে দেখছে সচেতন মহল।

একদিকে চ্যানেলের টেকসই সচলকরণে একনেকে পাসকৃত নদী ও খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন, অপরদিকে সেই সময়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ওই চ্যানেল সংলগ্ন নদী ও খালে ছোট আকারের কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারের এই দুটি সংস্থা সমন্বয় করে কাজ না করায় মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ চ্যানেলটি হুমকির মুখে পড়েছে।

"