কালের সাক্ষী রাজারামের মন্দির

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০

মোঃ ইব্রাহীম, রাজৈর (মাদারীপুর)

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নে প্রাচীন ভাস্কর্য শিল্পের অনুপম নিদর্শন খালিয়া রাজারাম মন্দির। সপ্তদশ শতাব্দীতে মন্দিরটি নির্মিত হয়। ধারণা করা হয় সপ্তদশ শতাব্দীতেই রাজারাম রায় চৌধুরীর জমিদারির গোড়া পত্তন হয়। পুরোনো মন্দিরটি ছাড়া রাজারাম রায় চৌধুরীর আর কোনো বসতবাড়ির অস্তিত্ব নেই। মন্দিরটি কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে। এটাই মাদারীপুর জেলার একমাত্র প্রাচীন মন্দির। মন্দিরটি দেখতে চৌচালা ঘরের মতো। ২৩ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত ওই মন্দিরের দৈর্ঘ্য ২০ ফুট, প্রস্থ ১৬ ফুট এবং উচ্চতা ৪৭ ফুট। দ্বিতল মন্দিরের গায়ে রয়েছে নানা নকশার টেরাকোটা। সেখানে রামায়ন ও মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্যাবলি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নিপুণ হাতে। রয়েছে বিভিন্ন দেব-দেবী, পশুপাখি ও লতাপাতার অসংখ্য চিত্র। দক্ষ শিল্পীর নিপুণ কারুকাজ ৪০০ বছর পরও মানুষের মন কাড়ে।

মন্দিরের বিভিন্ন স্থানে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। দেয়ালে বটগাছ, শেওলা ও পরগাছা জন্মেছে। মন্দিরের নিচতলায় ৩টি কক্ষ ও ওপরের তলায় ছয়টি কক্ষ রয়েছে। ওপরের তলায় ভেতরের দিকে ফাটল ধরেছে। চুন সুরকি খসে পড়ছে। গাছের ছায়াতে অন্ধকার হয়ে পড়েছে মন্দিরটি। তৎকালে রাজাদের ৩৫০টি পুজা হতো। প্রধান পূজামন্ডপ ছিল রাজারাম মন্দির। মন্দিরটি দক্ষিণ পাশে রয়েছে আরো একটি ভবন। আছে আরো একটি মন্দির। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে শিগগিরই ধ্বংস হতে পারে মন্দিরটি। প্রায় ২৫০ একর জমির ওপর ছিল রাজারামের খালিয়া জমিদার বাড়ি। বাড়িতে ছিল আকর্ষণীয় দোতলা-তিনতলা দালান ও বাগানবাড়ি। এখানকার সারিবদ্ধ দালানের ভগ্নস্তূপ, বাগানবাড়ি, পূজামন্ডপ ও শানবাঁধানো পুকুরঘাট আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে।

কালুর মঠ, জমিদার শিশির গাঙ্গুলীর বাড়ি, মজুমদার বাড়ি, মুখার্জী বাড়ির জমিদাররা ছিল প্রবল প্রতাপশালী। তাদের বাড়ির কাছ ঘেঁষে জনসাধারণ চলাচল করতে ভয় পেতেন।

উজানি জমিদার ছিলেন রায় গোবিন্দ ও সুর নারায়ণ। তাদের মোট সাতটি জমিদারি ছিল। উজানির জমিদার এই সাতটি জমিদারি থেকে একটি জমিদারি অর্থাৎ খালিয়া জমিদারিটি রাজারাম রায় চৌধুরীকে দান করে দেন।

রাজারাম রায় চৌধুরী এই খালিয়া জমিদারি পাওয়া নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। সেই কাহিনী অনুযায়ী জানা যায়, রাজারাম চৌধুরীর বাবা-মা ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। তারা দুজনেই উজানি রাজার বাড়িতে দাস-দাসি হিসেবে কাজ করতেন। উজানির রাজার সাতটি জমিদারি ছিল। রামরায় তখন খুবই ছোট। তাকে উজানি রাজার বাড়ির বারান্দায় রেখে বাবা-মা কাজে চলে যেতেন। এ সময় ফনা তুলে রামরায়কে ছায়া দিত বিষধর সাপ। বিষয়টি উজানির রাজার নজরে আসে। তিনি সহধর্মিণীকে জানান। সহধর্মিণী কোলে তুলে দেখেন রামরায়ের কপালে রাজতিলক। উজানির রাজার এসব দেখে তার সাতটি জমিদারি থেকে খালিয়া জমিদারিটি রামরায়কে দান করে দেন। আর দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন তার মা-বাবাকে। আর সেই থেকেই এই জমিদার বংশের পথচলা শুরু।

জমিদার রাজারাম চৌধুরীর বসতভিটার চিহ্নটুকু বহু আগেই মুছে গেছে। আজও শুধু স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজারাম মন্দির ও খালিয়া রাজারাম ইনস্টিটিউশন। বর্তমানে রাজারাম মন্দিরটি দেখভালের জন্য জাতীয় জাদুঘর ও প্রতœতত্ত্ব বিভাগ সম্প্রতি একজন সাইড পরিচালক নিয়োগ করেছে। তিনি মাঝে মাঝে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়সারার কাজ করেন।

প্রতি বছর দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই দেখতে আসেন ঐতিহ্যবাহী রাজারাম মন্দির। এরই পাশে রয়েছে শান্তিকেন্দ্র নামে ছোট পার্ক। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করলে জায়গাটি একটি নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এখানে যাতায়াতের ভালো রাস্তা নেই। অনেকে দূরে গাড়ি রেখে মন্দিরটি দেখতে আসেন পায়ে হেঁটে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ইউসুব আলী জানান, খালিয়া রাজারাম মন্দিরের পাশে শান্তি কেন্দ্রের সঙ্গে অন্ন পূর্ণার আরো একটি মন্দির আছে। এ মন্দিরে ছিল কষ্টিপাথরের একটি মূর্তি। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে কে বা কারা কষ্টিপাথরের মূর্তিটা চুরি করে নিয়ে গেছে। এ নিয়ে কোর্টে মামলাও হয়েছিল।

 

"