করোনায় থমকে গেছে টিকাদান

শিশু স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের শঙ্কা কর্মসূচি জোরদার করার তাগিদ

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনার কারণে প্রায় অর্ধেক শিশুই টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেছে। সংক্রমণের ভয়, লকডাউন, অধিকাংশ অস্থায়ী কেন্দ্র বসতে না পারাসহ নানা কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে নিউমোনিয়া, হুপিং কাশিসহ মারাত্মক সব রোগের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এপ্রিল থেকে মে এই দুই মাসে প্রায় আড়াই লাখ শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি। সারা দেশে নিয়মিত টিকাদানের হার ছিল ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। এখন তা কমে ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর শামসুল হক বলেন, সারা দেশে ১ লাখ ২০ হাজার কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হয়। বহু কেন্দ্রের কার্যক্রম চলে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীর বা কোনো ব্যক্তির বাড়িতে। করোনাকালে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনেকে বাড়িতে ভিড় জমাতে দেননি, তাই টিকার ক্যাম্প করা সম্ভব হয়নি।

তবে ইউনিসেফ বলছে, এপ্রিল মাসে নিয়মিত টিকাদান থেকে প্রায় অর্ধেক শিশু বাদ পড়ে। করোনা প্রতিরোধে দেওয়া লকডাউনের (অবরুদ্ধ অবস্থা) কারণে শিশুরা টিকা পায়নি। অন্যদিকে টিকাদান কেন্দ্র খোলা থাকলেও সংক্রমণের ভয়ে অনেক মা শিশুকে নিয়ে কেন্দ্রে যাননি। ইউনিসেফের হিসাবে এপ্রিল মাসে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার শিশু টিকা পায়নি।

এ বিষয়ে মো. শামসুল হক বলেন, দুই মাসে যেসব শিশু বাদ পড়েছে এবং যারা ঝরে পড়েছে, তাদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা মহামারিকালে টিকাদানের যে নির্দেশিকা তৈরি করেছে, তা অনুসরণ করে টিকাদান অব্যাহত রাখা হবে।

একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, গর্ভকালীন সেবা ও শিশু সেবার বড় অংশটি আসত বেসরকারি খাত থেকে। করোনার কারণে বেসরকারি ছোট-বড় ক্লিনিক ও হাসপাতাল প্রায় সব বন্ধ। মা ও শিশু প্রয়োজনের সময় সেবা নিতে পারছে না।

জন হপকিনস ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষণা বলছে, করোনাকালে অর্ধেক শিশু বিভিন্ন রোগের টিকা নিতে পারেনি। সরেজমিন অভিভাবকরাও জানালেন সেই বাস্তবতার কথা।

মহামারিতে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও অন্য রোগের প্রকোপে আগামী ছয় মাসে ২৮ হাজার শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে ব্লুমবার্গের গবেষণায়। শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমাতে নিকটবর্তী কেন্দ্রের পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে দ্রুততম সময়ে টিকা নিয়ে বাড়ি ফেরার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

এক বিশেষজ্ঞ বলেন, মাকে কিন্তু ভালো মানের মাস্ক পরতেই হবে। শিশুকে মাস্ক না পরানো গেলে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে স্বাস্থ্যকর্মী টিকা দেবেন তার মাস্ক পরা আছে কিনা। অথবা আগের বাচ্চাটিকে টিকা দিয়ে তিনি হাত পরিষ্কার করেছেন কিনা।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাকসুদুর রহমান বলেন, এই সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা, যক্ষ¥া, নিউমোনিয়া, টিটেনাসের মতো রোগগুলো আবার চলে আসতে পারে। শিশুদের বড় একটি অংশ টিকা না নিলেও এখন তা কাটিয়ে ওঠার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান ইপিআই পরিচালক। ইপিআই পরিচালক ডা. শামসুল হক বলেন, আমরা আশা করছি, এক থেকে দুই মাসের মধ্যে যেসব শিশু বাদ পড়েছে এটা পূরণ করে ফেলতে পারব।

শিশুদের জন্য যক্ষ¥া, নিউমোনিয়া, হাম, পোলিও রোগের ভয়াবহতা করোনার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে কোনো উপায়ে কেন্দ্রে এসে টিকা দিতে না পারলে শিশুদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

"