ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা

চট্টগ্রাম বন্দর কাস্টমে ৭০ জন করোনা পজিটিভ

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২০, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম

করোনাভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনীতির ক্রান্তিকাল চলছে। দেশের ৯০ শতাংশের রাজস্ব জোগানদাতা চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বিরাজ করছে করোনা আতঙ্ক। একের পর এক করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবরে দেশের চালিকাশক্তি বলে খ্যাত এ দুই প্রতিষ্ঠানে কাজের গতি বাড়ানো যাচ্ছে না। দেশের আমদানি-রফতানি স্বাভাবিক রাখতে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গত দুই দিন ধরে কাজের গতি বাড়লেও বন্দর-কাস্টমসের প্রায় ৭০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর করোনা পজিটিভের খবরে কাজ চালানো নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছেন পাঁচজন। গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে আমদানি-রফতানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। কিন্তু বর্তমানে সব কিছু খোলার কারণে বন্দর-কাস্টমসে ভিড় বেড়েছে। করোনার এ সময়ে ভিড় সামাল দিয়ে বৃহৎ এ দুই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যাবে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে বিগত দুই মাস বন্ধ থাকার পর ব্যবসায়ীরা আবারো কাজে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা পুরোদমে কাজ শুরু করতে গিয়ে প্রথমদিকে বেশ বিপাকে পড়েছেন। গত তিন দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে ৮৭ জনের করোনা পরীক্ষা করার পর দেখা যায় এ পর্যন্ত ৫০ জনের মতো করোনা পজিটিভ এসেছে। কাস্টমসের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এ প্রতিষ্ঠানেও প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর করোনা পজিটিভ। তবে প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ। বন্দর-কাস্টম জুড়ে হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তা, বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কি পরিমাণের করোনাভাইরাস পজিটিভ তা এই হিসাবের বাইরে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্দর-কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনা পজিটিভের বিষয়টি। বন্দরের ৩৩৬ জন বর্তমানে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছে। একের পর এক এভাবে করোনা পজিটিভ হয়ে কোয়ারেন্টাইনে গেলে স্বাভাবিক কাজ কীভাবে চলবে এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য জাফর আলম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বন্দরে পুরোদমে কাজ চলছে। বন্দরের গতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সব রকম চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, বন্দরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রথম দফায় ৮৭ জনের করোনা টেস্ট করানো হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথমে ৩৯ জনের এবং পরবর্তিতে আরো ১১ জনের পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে। তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। জাফর আলম বলেন, বন্দরে বর্তমানে যে লোকবল রয়েছে তাতে কাজ চালানো সমস্যা হচ্ছে না। আমাদের নিজস্ব আইসোলেশন ব্যবস্থা রয়েছে। করোনা পরীক্ষার বুথও পুরোদমে শুরু হচ্ছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার লোক যাতায়াত করে। এদের মধ্যে বড় অংশই বন্দর ব্যবহারকারী। তাছাড়া প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার গাড়ি বন্দরে আসা যাওয়া করে। এ বিপুল পরিমাণ লোকজন কীভাবে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করবে এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। যদিও বন্দর ও কাস্টমসে করোনা থেকে রক্ষার জন্য নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তদুপরি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এখানে যে কাজ করা কঠিন। আর এ বিষয়টি এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট। চট্টগ্রাম কাস্টমসের কর্মকর্তাদের ভাগ ভাগ করে কাজ করানো হচ্ছে। একসঙ্গে অনেকে যাতে আক্রান্ত না হয় তার জন্য কাস্টমস কমিশনারের নির্দেশে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সূত্র জানায়।

এদিকে বন্দরে কাজের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা। তবে গত দুই মাস ধরে বন্দরে হাজার হাজার কনটেইনার আটকে থাকার কারণে ভেতরে কনটেইনার জটের এখনো নিরসন হয়নি। বন্দরের ভেতরে কনটেইনার রাখার স্থান রয়েছে ৪৯ হাজার টিইইউএসের। সেখানে বর্তমানে ৫২ হাজার টিইইউএস কনটেইনার রয়েছে। বন্দরের বাইরে যে ১০টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো রয়েছে সেগুলোও পরিপূর্ণ। কারণ গত দুই মাস বন্দরের কনটেইনার ভর্তি পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে এগুলো নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত দুই দিনে বেশ কিছু কনটেইনার খালাস হলেও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এ অবস্থা অব্যাহত রাখার বিষয়টি। কারণ বন্দরের পণ্য পরিবহন কাজে নিয়োজিত গাড়ির ড্রাইভারদের অনেকের করোনা পজিটিভ। যদি বেশি পরিমাণে ড্রাইভার করোনায় আক্রান্ত হয় তাহলে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ভেতরের জেটি ও বাইরে বহির্নোঙরে বর্তমানে প্রায় ৮০টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায়। পাইপলাইনে রয়েছে আরো জাহাজ। বন্দরে প্রতিদিন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ও শ্রীলংকার কলম্বো বন্দর দিয়ে কনটেইনার পণ্য আসে। বিগত দুই মাসে কনটেইনার পণ্য আসার গতি ধীর হলেও বর্তমানে তা বাড়ছে। যেসব ব্যবসায়ী এতদিন গার্মেন্টস পণ্যের কাঁচামাল আনতে অর্ডার স্থগিত রেখেছিল তারা বর্তমানে লকডাউন খোলার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়েছেন। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বিগত দুই মাস ধরে থাকা অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। তবে করোনার হাত থেকে রক্ষা না পেলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা যেকোনো মূল্যে দেশে পণ্যে সরবরাহ চেইন চালু রাখবে। বন্দর ও কাস্টমস যাতে পুরোদমে চলে তার জন্য সবরকম প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে যাতে দেশের বড় এ দুটি প্রতিষ্ঠান যাতে সক্রিয় থাকে তার জন্য সরকারও নজর রাখছে বলে জানা গেছে।

 

 

"