করোনা : বৈশ্বিক ক্ষমতার ভবিষ্যৎ

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২০, ০০:০০

জোসকা ফিসার

কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগে দীর্ঘদিন থেকেই মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তিব্রতর হয়ে আসছিল। শেষের দিকে দেশ দুটি এমন পর্যায়ে চলে এসেছিল যে তাদের নীতি ছিল ‘এক পক্ষের জিত আর অপরপক্ষের হার’, তবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে কেবল একপক্ষই এটি করে চলেছে।

বার্লিন : একবিংশ শতকে সত্যকার অর্থেই এ-ই প্রথম বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে দেখা দিল কোভিড-১৯। এই অণুবীক্ষণিক ভাইরাসঘটিত রোগে অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে কেবল তুলনা চলে গত শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধোত্তর মন্দার সঙ্গেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯১৪ সালের আগস্টে। শুধু দীর্ঘ শান্তির বার্তা দিয়েই সেই যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং সেটা স্থগিত করে দিয়েছিল আগের সময়ের অর্থনীতির বিশ্বায়নের ও সুসংহতকরণের। ওই যুদ্ধের পর সারা দুনিয়ার সরকারগুলো নতুন সুরক্ষাবাদী এজেন্ডা অনুসরণ করছে আর এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়ছে। তার এক প্রজন্ম পরে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে পৃথিবী, এরপরই শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধের কাল।

১৯১৪ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত, ওই সময়কালের পর বৈশ্বিক রাজনীতির ধরন পাল্টে যায়। এরপরই শুরু হয় ক্ষমতার রাজনীতির নতুন বিন্যাশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠে। অপরদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সেই জায়গাটি দখল করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ^ রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। এখন প্রশ্ন হলো, কোভিড-১৯ দুর্যোগের পর কীভাবে বৈশ্বিক রাজনীতির ক্ষমতার পরিবর্তন সাধিত হবে, যা কিনা একমাত্র বিশ্বযুদ্ধের পরেই

দৃশ্যমান পরিবর্তনের সঙ্গেই তুলনীয় হতে পারে। এটা পরিষ্কার যে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট যে মাত্রায় উঠে এসেছে, সেটা ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবল ঝাঁকুনি দিচ্ছে। আমেরিকা এখন বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি, সে চাইবে তার শীর্ষ অবস্থানটি ধরে রাখতে। কিন্তু অধিকাংশ লক্ষণ জানান দিচ্ছে যে, এই শতাব্দীতে পূর্ব এশিয়া থেকে উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসছে চীন। একবিংশ শতাব্দীতে কোভিড-১৯ সংকটের আগে পর্যন্ত মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার গঠন ছিল কর্তৃত্ববাদী। বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী বছরে সেই প্রতিযোগিতা আরো তীব্রতর হবে। আগামী নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচন ডোনাল্ড ট্রামের জন্য অনেকাংশেই অগ্নিপরীক্ষা। মহামারির অব্যবস্থাপনা এবং দেশীয় অর্থনীতির নজিরবিহীন সংকটের কারণে তার দরকার একটি বলির পাঠা, আর সেক্ষেত্রে চীন তার সুস্পষ্ট পছন্দ।

যেখানে ট্রাম্পের পলিসি হচ্ছে আমেরিকার সমাজকে বিভক্ত করে রাখা। সেখানে চীনের ক্ষেত্রে তার অবস্থান হচ্ছে বড় ধরনের ব্যতিক্রম। চীনের বিরুদ্ধে চলমান আক্রমণাত্মক পদক্ষেপে ট্রাম্প আমেরিকানদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান চান। এজন্য দ্বিদলীয় সমর্থন প্রত্যাশা করছেন তিনি। এমনকি লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও চীনের ব্যাপারে যথেষ্ট তিক্ত মনোভাব গড়ে উঠেছে।

মার্কিনিদের বহু আপত্তি খারিজ করা দুস্কর। কিন্তু চীন রিপাবলিকের বৈশিষ্ট্য একনায়কবাদী ও কতৃত্ববাদী, যেখানে রাষ্ট্রই থাকে একটি লেনিনবাদী পার্টির নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে। দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যাপকহারে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা বৃত্তিতে নিয়োজিত রয়েছে। এভাবে বজায় রাখছে অন্যায্য বাণিজ্য চর্চা এবং জোর করে ঢুকে পড়ছে ভারত তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগরে দাবিকৃত এলাকায়। এভাবে জিনজিয়ান প্রদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর ওপর চলছে নিপীড়ন। উহানে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পর হংকং এর ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

তদুপরি, আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকা ট্রাম্প প্রশাসন অবিরাম প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। আসলে ট্রাম্প প্রশাসন কী চায়? সে কি কোনোরূপ দায়িত্ব না নিয়েই বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকতে চায়? যা কখনোই সম্ভব নয়।

যখন আমেরিকা স্বল্প মেয়াদি চিন্তায় মগ্ন, তখন চীন নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে বিকল্প বৈশ্বিক নেতৃত্বের ও বিনিয়োগের জায়গায়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক যে ভূরাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটা পূরণের জন্য ধৈর্য সহকারে চীন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে ব্যাপৃত।

যদি কোনো কারণে আমেরিকার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়, বিশেষত: কোভিড-১৯ দুর্যোগ মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের নিদারুণ ব্যর্থতার প্রশ্নে, সেক্ষেত্রে ওই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার তার জন্য বড়ই কঠিন কাজ হবে। করোনাভাইরাস মহামারি জনমনে জোরালো ধারণা সৃষ্টি করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি পতনশীল পরাশক্তি, যে পরাশক্তি কৌশলগতভাবে দক্ষ ও অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল চীন কর্তৃক শিগগিরই প্রতিস্থাপিত হবে। একটি বৃহৎ শক্তির উত্থান পতনের গল্প রচিত হচ্ছে একটি অদৃশ্য ভাইরাসের দ্বারা। আমরা শুধু এতটুকুই আশা করতে পারি যে, এই অধ্যায়টি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে। এদিকে আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্বে অস্বস্তিতে পড়েছে ইউরোপ। কারণ চীনের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সত্যকার কী মনোভাব, সে সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছে ইউরোপ। আমেরিকা কী চাইবে? সে সংযতই থাকবে নাকি সংঘাতেই জড়াবে? এমনকি চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে কিংবা তার অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেবে? দ্বিতীয় কৌশল হলো চীনের প্রতি ঊনিশ শতকের শেষের দিকে পাশ্চাত্যের নেওয়া পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি, যা হবে খুবই বিপজ্জনক। পাশ্চাত্যের জন্য বিকল্প হলো, প্রতিদ্বন্দ্বী দুই শক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি আত্ম-সংবরণ। এই মতটি বেছে নেওয়ার জন্য চমৎকার পরামর্শ ইউরোপের। চীনা নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থায়, অতি বিশাল মহাদেশ ইউরোশিয়ার একেবারে পশ্চিমে ইউরোপের অবস্থান, যা হারাতে হতে পারে। একটি কর্তৃত্ববাদী এক পার্টির দেশ হিসেবে চীন কখনো ইউরোপের প্রকৃত আদর্শিক বন্ধু হতে পারে না। এমনকি ট্রাম্পের তিন বছর পরেও আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের যে সম্পর্ক, সেটা চীনের সঙ্গে কাক্সিক্ষত সম্পর্কেরও চেয়েও ঘনিষ্ঠ। চীন এতটাই বৃহৎ, এতটাই সফল এবং এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, অনেক কিছুকে অগ্রাহ্য করতে পারে। বাস্তবতা হলো সহযোগিতার আহ্বান জানানো। মূল কথা হলো, চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন নাকি তার বশ্যতা শিকার। এই গুরুতর পার্থক্যটি বজায় রাখার জন্য ইউরোপকে অর্থনৈতিকভাবে ও প্রযুক্তিগতভাবে পাশ্চাত্যেও ওই প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর নির্ভরতা এড়াতে হবে।

জোসকা ফিসার (Joschka Fischer) : জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক ভাইস চ্যাঞ্চেলর (১৯৯৮-২০০৫)। প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে নেওয়া।

 

"