ছাদবাগানে ঈদ আনন্দ

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনায় মানসিক বিষণ্নতা কাটানোর অন্যতম জায়গা হতে পারে ছাদবাগান। এবারের ঈদ উৎসবে বেড়ানো হয়নি কোনো পার্কে, ঘোরাও হয়নি পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে। তাইতো এই ছাদবাগানÑ ইট-কাঠ ও পাথরে গড়া কঠিন এই নগর ঢাকার পরিবেশ দূষণ রোধ করার পাশাপাশি হয়ে ওঠেছিল মনকে আনন্দিত করার মনোরম স্থান।

রাজধানীর শৌখিন বাগানিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রথম সংগঠন গড়ে তোলেন। এতে যোগ দেন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন বাগানি। সেখানে পরিচয়ের সূত্র ধরে সেখানকার বাগানিরা অনলাইনে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। ২০১৭ সালে তারা শুরু করেন ফেসবুকভিত্তিক নতুন সংগঠন চট্টগ্রাম বাগান পরিবার। বাগান-সংক্রান্ত নানা পরামর্শের জন্য দ্রুতই চট্টগ্রামের ছাদবাগানিরা এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। শুরুর পর ছয় মাসের মাথায় সংগঠনের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০০তে। আর ২ বছর পর বর্তমানে সংগঠনের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২ হাজারে। ছাদবাগানিদের নিয়ে বৃক্ষমেলা, গাছের চারা বিনিময় ও গাছসংক্রান্ত নানা পরামর্শ বিতরণ করে বাগান পরিবার।

কথা হয় সংগঠনটির অন্যতম অ্যাডমিন জিয়াউল বারীর সঙ্গে। পেশায় ব্যবসায়ী জিয়াউল নিজেও বাগান করেন। শহরের ঈদগাঁ বউবাজারে তার ছাদের বাগানে রয়েছে হরেকরকমের দেশি-বিদেশি সবজি, ফল ও ফুল।

জিয়াউল বারী জানালেন, তিনিসহ বর্তমানে সংগঠনের অ্যাডমিন ও মডারেটর আছেন ১৪ জন। তৌহিদা তামান্না, এ আর টি রাহী, সি এম হাসান লাকি, নাসরিন ইকবাল, জামশেদ ইকবালসহ একঝাঁক উদ্যমী বাগানি সংগঠনকে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

কেন এমন একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলেন জানতে চাইলে জিয়াউল বারী বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রামে যারা বাগান করি, তাদের একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার ছিল। যেখানে অভিজ্ঞতা বিনিময় আর পরস্পর থেকে শেখার সুযোগ আছে।’

প্রতি বছর তিন থেকে চারটি অনুষ্ঠানের (ইভেন্ট) আয়োজন করে বাগান পরিবার। ইভেন্টগুলোতে সংগঠনের সদস্যরা এক হন। এসব অনুষ্ঠান আসলে এক ধরনের মিলনমেলা। সেখানে গাছ বিনিময়, চারা ও সার বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া বাগান নিয়ে আলোচনা সভা, সেমিনার তো আছেই। এসবের পাশাপাশি বাগান বিলাস নামের পত্রিকাও প্রকাশ করছেন তারা। এখন পর্যন্ত এর দুটি সংখ্যা বের হয়েছে।

চট্টগ্রামে ছাদবাগান বা ছাদকৃষি সম্পর্কে কৃষি বিভাগের কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। তবে চট্টগ্রাম বাগান পরিবার এখন নিজেরাই এসব তথ্য জোগাড়ের চেষ্টা করছে। সংগঠনের ২২ হাজার সদস্যের মধ্যে ৫ হাজার সদস্য নিজের ছাদে বাগান করেছেন। এই পাঁচ হাজার ছাদবাগানির সবজি ও ফলের বড় একটা চাহিদা মেটান নিজের বাগান থেকে।

ছাদবাগান থেকে একটি পরিবার ঠিক কতটুকু খাবারের জোগান পেতে পারে, জানতে চাইলে জিয়াউল বারী বলেন, মোটামুটি ছোট আকারের একটি ছাদবাগান থেকেও প্রতিদিনকার খাওয়ার মতো শাকসবজি পাওয়া যায়। এ ছাড়া মৌসুমে পাওয়া যায় নানা ধরনের ফল। সারা বছরই ছাদবাগান থেকে কিছু না কিছু প্রাপ্তিযোগ হয় বলে তিনি জানান। জানা গেল, শাকসবজি একেবারেই বাজার থেকে কিনতে হয় না, চট্টগ্রাম বাগান পরিবারে এমন বাগানির সংখ্যা কম করে হলেও ২০০।

ছাদবাগান করতে কত বড় ছাদ প্রয়োজন, কীভাবে শুরু করতে পারেন নতুন বাগানিরা? জানতে চাইলে জিয়াউল বারী বলেন, মোটামুটি রোদ পড়ে এমন ৮০০ থেকে ৯০০ বর্গফুটের ছাদ হলেও ভালো বাগান করা সম্ভব।

সরকারের নানা সংস্থা আয়োজিত বৃক্ষমেলায়ও অংশ নেয় চট্টগ্রাম বাগান পরিবার। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে মোট তিনটি বড় মেলায় অংশ নিয়েছে বাগান পরিবার। এসব মেলায় গ্রুপের সদস্যদের হাতে তারা উন্নত জাতের ফল ও ফুলের চারা তুলে দিতে চেষ্টা করেছে। অব্যাহত প্রচারণা ও উৎসাহ দেওয়ার ফলে গ্রুপের সদস্যরা বাগানের পরিসর বাড়াচ্ছেন। সংগ্রহে যোগ করছেন নতুন নতুন প্রজাতির ফল, ফুল ও সবজি।

জিয়াউলের কাছ থেকে জানা গেল, একসময় প্যাশন, ড্রাগন, পারসিমন, পিচ, কমলা, আপেল বা আঙুর ছাদবাগানে দেখা যেত না। এসব বিদেশি ফল এখন দেশি ফলের সঙ্গে ভালোভাবেই ছাদবাগানে ফলছে।

কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় বাগানিদের? জিয়াউল বারী বলেন, চট্টগ্রামে মাতৃগাছের বাগান বা নার্সারি নেই বললেই চলে। এ কারণে ভালো জাতের চারা পাওয়া যায় না। অবশ্য কৃষি বিভাগ আজকাল টবে হয় ও ছাদে চাষের উপযোগী এমন সবজি ও ফলের জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে।

কথা হয় চট্টগ্রাম বাগান পরিবারের সদস্য গৃহিণী আয়শা আক্তারের (৬০) সঙ্গে, ১০ বছর ধরে ছাদবাগান করছেন তিনি। নগরের ফয়’স লেকের লেকভ্যালি আবাসিক এলাকায় প্রায় সাড়ে ৪ গন্ডা জায়গার ওপর করা একতলা বাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন ফুল, ফল ও সবজির বাগান। আয়শা বলেন, তার দিনের শুরু হয় বাগান পরিচর্যার মধ্য দিয়ে। সকাল-বিকেলে দুই বেলা ছাদে গিয়ে গাছের সঙ্গে সময় না কাটালে ভালো লাগে না তার। গাছে নতুন ফুল বা ফল এলে ছবি তুলে তিনি বাগান পরিবারের ফেসবুক পেজে পোস্ট করেন।

আয়শা আক্তার বলেন, এই বয়সে অনেকে রোগে-শোকে কাতর থাকেন। কিন্তু বাগানের পেছনে সময় দেওয়ায় তার শরীর অনেকটাই ভালো।

আয়শা আক্তারের বাড়ির ৫০ গজের মধ্যেই ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান ও আসমা হাবীব ফেরিন দম্পতির চারতলা বাড়ি। দুজনেই বাগান পরিবারের সদস্য। ২০ বছর ধরে তারা বাগান করছেন। আর ছাদবাগানে ফল ও সবজির চাষ অর্থাৎ ছাদকৃষি করছেন পাঁচ বছর ধরে। ছাদবাগানে বেশির ভাগ সময় দেন আসমা হাবীব। মূলত বাগানটি তার নিজের হাতে গড়া। সম্প্রতি তাদের ছাদবাগানে গিয়ে দেখা গেল, লাউ, টমেটো, শাকসহ হরেকরকমের সবজির ছড়াছড়ি। গোলাপ, টগর, স্থল পদ্মসহ জানা-অজানা ফুলের সংখ্যাও কম নয়। আছে মাল্টা, কমলা, পেয়ারা, কলাসহ দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফল।

হাবিবুর রহমান জানালেন, প্রায় ২০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে তাদের ছাদবাগানে। প্রতিদিনের সবজির চাহিদার একটা বড় অংশ আসে নিজেদের বাগান থেকে।

 

"