ঝুঁকি জেনেও মানবিক কাজে ওরা

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে মারাত্মক ছোঁয়াচে নতুন করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন, ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই তাদেও শেষ বিদায়ের সময় থাকতে পারছেন না স্বজনরা। স্বজনদের এই অপারগতায় মৃতদেহ সৎকারে ঝুঁকি নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী।

ঢাকার আল মারকাজুল ইসলামী নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ১৫ জনের একটি দল কোভিড-১৯ মৃতদের সৎকারে কাজ করে যাচ্ছে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া। পুরো দলটি মোহাম্মদপুরে সংগঠনের প্রধান কার্যালয়ে থাকছে এখন।

মৃতদেহ সৎকারে প্রথম দিকে ঢাকার বাইরে কিশোরগঞ্জ এবং মানিকগঞ্জে সংগঠনের দুটি দল থাকলেও যেহেতু ঢাকায় মৃত্যুর হার বেশি, তাই তাদের সবাইকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে সংস্থাটি ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলেই কাজ করছে।

কোভিড-১৯ এ বাংলাদেশে শুক্রবার পর্যন্ত ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতেই ৬০টি মরদেহ দাফন করেছে সংগঠনটি।

ঢাকায় কোভিড-১৯ এ মৃতদের দাফনের জন্য খিলগাঁওয়ের তালতলা কবরস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রথম দিকে মারা যাওয়া কয়েকজনকে আজিমপুর এবং মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রটোকল অনুসরণে বাংলাদেশে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর কোভিড-১৯ এ মৃতদের সৎকারের প্রক্রিয়া ঠিক করেছে, যেখানে সব ধর্মেরই বিধান মানা হচ্ছে। মৃতদেহের গোসল থেকে শুরু করে সৎকার পর্যন্ত পুরো কাজটি করা হচ্ছে কঠোর সাবধানতায়।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে যার অভিজ্ঞতা সরকার কাজে লাগাচ্ছে, আইইডিসিআরের সেই সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন এর আগে জানিয়েছিলেন, মৃত ব্যক্তিকে গোসলের আগে-পওে দেখতে পারবেন স্বজনরা। এমনকি নিরাপদ দূরত্ব মেনে জানাজা, দাফনের সময়ও থাকতে পারবেন। তবে দাফন প্রক্রিয়ায় বেশি লোকজনের জড়ো হওয়াকে নিরুৎসাহিত করেন তারা। সাধারণত মৃত্যুর সময়ে মানুষের কাছের লোকেরা তার সঙ্গে থাকে কিন্তু এই মৃত্যুটা এমনই এক করুণ মৃত্যু, যেই মৃত্যুতে খুব আপন লোকও কাছে আসে না কিংবা আসতে চাইলেও আসতে পারে না, দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে এমনটাই বলেন মারকাজুল ইসলামীর কর্মী জুবায়ের হোসাইন। সংগঠনটির যে কজন কর্মী এই দুঃসময়ে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের একজন জুবায়ের, যিনি তার পরিবার থেকে নিজেকে দূওে রেখেছেন এই সময়ে, স্বেচ্ছায়।

জুবায়ের বলেন, এই ব্যাপারটিই সবচেয়ে খারাপ লাগে ভাবতে, আমরা কত ভালো ভালো পরিবারের মানুষজনের লাশ নিয়ে যাচ্ছি দাফনের কাজে, অথচ তাদেও কেউ ধরতে আসে না, আবার অনেক সময় কেউ কোনো খোঁজও নেয় না। বাসা থেকে লাশ বহনের কাজটি বেশি বেদনাদায়ক বলে জানান তিনি।

ঊাসা থেকে যখন মৃতদেহ নিয়ে আসি, অনেক সময় তাদের আপনজনরা কান্নাকাটি করেন, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তখন মানুষ হিসেবে আমরাও আবেগতাড়িত হয়ে যাই। হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ আনার সময় এই বেদনাদায়ক দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হয় না।

মৃতদেহ বহন থেকে শুরু করে দাফন কিংবা সৎকারের সময়ে তাদের নিজেদের সুরক্ষার ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জুবায়ের বলেন, একজন ডাক্তার যেভাবে রোগীদের চিকিৎসা করার সময়ে সুরক্ষা গ্রহণ করে, আমাদেও ক্ষেত্রেও সেভাবে সুরক্ষিত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা গামবুট, পিপিই, হাতে সার্জিকাল গ্লাভস, মুখে মাস্ক এবং চোখে সার্জিকাল গগলস পরি, এভাবেই যতটুকু সম্ভব নিরাপদে থাকতে চেষ্টা করি। তাদের পিপিইগুলো একবার ব্যবহারের পর আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয় বলে জানান তিনি।

কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দেশের স্বার্থে নিজেদের এই কাজে উৎসর্গ করতে গিয়ে পরিবারের যথেষ্ট সমর্থন পান জুবায়ের।

তিনি বলেন, প্রথমদিকে এই কাজ করার সময় পরিবারকে না জানিয়েই বের হতাম, পরে যখন পরিবারের লোকেরা জানতে পারল, তখন তারা ভয় পেলেও বাস্তবতাকে স্বীকার কওে মেনে নিয়েছে। পরিবারের প্রত্যেকেই বলে এটা পূণ্যের কাজ কিন্তু নিজেদের সুরক্ষার ব্যাপারটাও নিশ্চিত করার পরামর্শ দেয় তারা।

সংগঠনের আরেক কর্মী আবদুল্লাহ সাদেক বলেন, আমরা এই কাজটি মানবিক কর্তব্যবোধ থেকেই করি। অনেক সময় দেখা যায়, মৃত ব্যক্তির আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠরা কাছে আসার চেষ্টা করে, অনেকেই জানাজায় শরিক হতে চায়। কিন্তু আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পিপিই না থাকায় আমরা তাদের এই অনুরোধ রাখতে পারি না। এই ব্যাপারটা খুব দুঃখজনক মনে হয়। অনেকে দূও থেকে বার বার ফোন করে তাদের স্বজনদেও কোথায় দাফন করা হলো, সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে কিনা এসব জানতে চায়, অনেকে কান্নাকাটি করেন। তাদের জায়গায় যখন নিজেদের কল্পনা করি, তখন এই বিষয়গুলো আমাদের মর্মাহত করে।

আল মারকাজুল ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হামজা শহিদুল ইসলাম জানান, করোনায়ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো মৃতদেহ দাফন কিংবা সৎকার কোনো সংস্থা করতে না চাইলে তাদের সংগঠন সরকারের অনুমোদন নিয়ে কাজটি কওে দেয়।

মৃতদেহ বহন এবং সৎকারের প্রক্রিয়া বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের মাধ্যমে আমাদের কাছে খবর পাঠানো হয়। এরপর যেখানে মৃতদেহ রয়েছে সেখানে গাড়িসহ ৫-৬ জনের একটি টিম পাঠানো হয়। এর মধ্যেই ডেথ সার্টিফিকেট থেকে যখন নিশ্চিত হওয়া যায়, মৃত ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত ছিল কিংবা এলাকাবাসীর সন্দেহ থাকে ওই ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত ছিল তখনই সেই লাশ বহন কওে গোসল করানোর পর জানাজা এবং দাফন করা হয়।

 

"