এখন পারিবারিক সংক্রমণেও শঙ্কা

প্রশ্নবিদ্ধ হোম কোয়ারেন্টাইন

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

এপ্রিলের শুরু থেকে অসুস্থতা অনুভব করছিলেন রাজধানীর এক গার্মেন্ট শ্রমিক। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মেই তার সেবা-শুশ্রƒষা করেছিলেন স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা। অসচেতনতার কারণে পরিবারের অন্য সদস্যরাও কাছে আসতেন। পরে করোনা শনাক্তের পর থেকে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু সর্বনাশ যা হওয়ার তা আগেই হয়ে গেছে। স্ত্রী, তার দুই ছেলে ও এক মেয়ের নমুনা পরীক্ষায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। শুধু সাড়ে ৩ বছরের ছোট মেয়েটির ফল নেগেটিভ এসেছে।

পরিবারের করোনায় সংক্রমিত হওয়া নিয়ে ওই গার্মেন্ট কর্মী বলেন, অসচেতনতার কারণে পরিবারের অন্য সদস্যরাও কাছে আসত। এতে সবাই আমার কাছ থেকেই করোনা সংক্রমিত হয়েছে।

মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. শফিকুল ইসলাম জানান, জেলার রাজৈর উপজেলার কোদালিয়া বাজিতপুর এলাকায় ১২ এপ্রিল এক ব্যক্তির করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর এবার তার তিন বছরের শিশুসন্তানও আক্রান্ত হয়েছে।

ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিশুটির বাবা করোনা আক্রান্ত হওয়ায় মাদারীপুর স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে আইইডিসিআরে ওই পরিবারের মা ও শিশু দুজনের নমুনা পাঠানো হয়। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) তিন বছর বয়সি ওই শিশুর করোনা পজিটিভ আসে। তিন বছরের শিশুটি করোনা আক্রান্ত হওয়ায় তার মায়ের করোনা আক্রান্তের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ তিনি সার্বক্ষণিক শিশুটির সংস্পর্শে আছেন।’ এর আগে গত রোববার (১২ এপ্রিল) চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো মাত্র আট বছরের এক বাকপ্রতিবন্ধী শিশু করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়। করোনা পজিটিভ হওয়ার খবর পৌঁছাতেই শিশুটিকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। রাত আড়াইটায় ওই শিশুকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়। কিন্তু ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

শিশুটির করোনা আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, শিশুটির খোদ বাবাই ওমানফেরত। সম্প্রতি এক চাচাও ওমান থেকে ফিরেছেন। আরেক চাচা এলাকায় ফিরেছেন করোনার হটস্পট রাজধানী ঢাকা থেকে। সাতকানিয়ায় করোনা আক্রান্তের মৃত্যুর পর আক্রান্ত হয়েছেন তার ছেলে এবং ছেলের চার বন্ধু। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামে শনাক্ত হওয়া একমাত্র রোগী নগরের হালিশহর শাপলা আবাসিক এলাকার গৃহবধূ হলেন এর আগে করোনা শনাক্ত নারীর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী। যিনি তার ভাসুরের স্ত্রীর সঙ্গে হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন।

সম্প্রতি পারিবারিক সংক্রমণের সবচেয়ে বড় উদাহরণটি তৈরি হয়েছে লক্ষ্মীপুরে। জেলার রামগঞ্জের এক পোশাকশ্রমিকের কাছ থেকে সেখানে এখন ১৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮ জনই তার পরিবারের সদস্য, বাকিরাও আত্মীয়স্বজন।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘বিষয়টাকে পারিবারিক সংক্রমণ বলব না, পাশাপাশি থাকার কারণে এমনটা ঘটছে। আসলে চট্টগ্রামে করোনা সামাজিক সংক্রমণ চলছে। আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শিওর হওয়ার জন্য আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশের লোকজনকে বেশি পরীক্ষা করছি তাই তারা শনাক্তও বেশি হচ্ছেন। আমরা যদি পরীক্ষার পরিমাণ আরো বাড়াতে পারতাম তাহলে দেখতেন আরো অনেকে করোনা রোগী হিসেবে শনাক্ত হতো।’

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে করোনাদুর্গত ছয়টি দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিমানবন্দর ব্যবহার করে দেশে প্রবেশ করেছেন ৯৪ হাজার মানুষ। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৪০০ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন দেয়া হয়। এছাড়া দেশে করোনার সামাজিক সংক্রমণ শুরুর পর আরো প্রায় দুই হাজার মানুষকে হোম কোয়ারেন্টাইন দেয়া হয়। কিন্তু দেশে করোনা গতিপ্রকৃতি বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রবাসী দেশে ফিরে মানেননি হোম কোয়ারেন্টাইনের নিয়মকানুন। দেশের নারায়ণগঞ্জসহ সর্বত্রই করোনার প্রাথমিক বীজ তারাই বুনেছেন। পরে অনেককেই প্রাথমিক অসুস্থতার পর হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হলেও পরিবারে মধ্যে তারা মিশেছেন কোনো নিয়মের ধার না ধরেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম ১৪ জনের মধ্যে আটজনই বিদেশফেরত, বাকিরা তাদের সংস্পর্শে আসার পর ভাইরাসে আক্রান্ত হন। এ অবস্থায় দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই হোম কোয়ারেন্টাইনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও ভাইরোলজিস্ট ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বলছিলাম হোম কোয়ারেন্টাইন বাংলাদেশের জন্য একেবারেই অকার্যকর একটি পদ্ধতি। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের বিকল্প নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা। প্রথমে প্রবাসীদের পর সম্ভাব্য রোগীদের হোম কোয়ারেন্টাইনের নামে পরিবারগুলো অরক্ষিত করা হয়েছে। সবার ক্ষেত্রেই প্রথমে তার নিজ পরিবারকে সংক্রমিত করেছেন।’

 

"