বেতন দিতে পারেনি ৬০৯ কারখানা : বিজিএমইএ

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে ৭৩ শতাংশ পোশাক কারখানা শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করেছে বলে দাবি করেছে মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটি বলেছে, বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ১৬৬৫টি কারখানা মার্চ মাসে বেতন পরিশোধ করেছে, যার ফলে এই খাতের ৮৭ শতাংশ শ্রমিক বেতন পেয়েছেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেষ সময়ে এসে যে ৬০৯টি কারখানা এখনো বেতন দিতে পারেনি। তবে এর মধ্যে ঢাকায় ৯৭টি এবং চট্টগ্রামে আরো ১১৯টি কারখানা বেতন দেওয়ার জন্য প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারিতে বিশ্বের অর্থনীতি স্তব্ধ হয়ে পড়ার পর দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। কিন্তু বেতনের জন্য প্রতিদিন রামপুরা ও মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় পোশাক কারখানাগুলোর সামনে ভিড় করছেন শ্রমিকরা।

এই এলাকার কয়েকজন নারীশ্রমিক বলেছেন, মাসের অর্ধেক চলে গেলেও বেতন না হওয়ায় খাবার জোগাড় করা নিয়েই মুশকিলে পড়েছেন তারা। এদিকে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকার থেকে ত্রাণ দেওয়া হলেও তা তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন এই পোশাকশ্রমিকরা। বেতন পাই না। রিলিফও পাই না। আমরা যেখানে থাকি হেখানে কিছু কিছু লোককে বাইছা বাইছা রিলিফ দিয়া যায়, আমাগো দেয় না, দুঃখ করে বলেন রামপুরার বাসিন্দা কিশোরী আলেয়া। গত বৃহস্পতিবার সকালে রামপুরা ও মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার কাছে কয়েকটি বন্ধ পোশাক কারাখানার সামনে নারী কর্মীদের বেতনের আশায় বসে থাকতে দেখা যায়। এ সময় পাশের পুলিশ ভ্যান থেকে কর্মকর্তারা হ্যান্ডমাইকে ওই শ্রমিকদের বাসায় চলে যাওয়ার অনুরোধ করছিলেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণে এড়াতে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে এভাবে এখানে বসে থাকা যাবে না বলে সতর্কও করছিলেন তারা।

এক পুলিশ পরিদর্শক মাইকে বলছিলেন, বোনেরা আমরা তোমাদের পাশে আছি, তোমাদের সঙ্গে থাকব। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট বুঝি। তোমরা এখন চলে যাও। গার্মেন্ট বন্ধ। এই কারখানার মালিকের সঙ্গে আলাপ করে তোমাদের জানানো হবে। এখন তোমরা বাসায় ফিরে যাও।

মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার কাছে শাফিন গার্মেন্টের সামনে ২০-৩০ জন নারীশ্রমিক দেড় ঘণ্টা বসে থেকে পুলিশ সদস্যদের অনুরোধে চলে যান। কাছাকাছি আরেকটি গার্মেন্ট ‘বারগো’, সেখানে বেলা ১১টায় জড়ো হয়েছিলেন ৫০ জনের মতো নারীশ্রমিক। কারখানা বন্ধ থাকায় এক ঘণ্টা থেকে পুলিশের অনুরোধে চলে যান তারাও।

রামপুরার এই সড়কের পথে পথে পুলিশের পিকআপ ভ্যান দাঁড়ানো দেখা যায়। যেখানে মানুষের জটলা সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজ নিজ বাসায় চলে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন তারা। কারখানার সামনে সমাবেশ থেকে মুখে কাপড়ের মাস্ক পরা পোশাকশ্রমিক লায়লা বলেন, ‘স্যার কাজ করি, বেতন দেয় না। আইজকা মাসের কত তারিখ? এখন আমরা কী করমু কন? আমরা গরিব মানুষ খাইতে পারি না, আমাগোরে রিলিফ দেয় না। কী খামু কন?

কত মাসের বেতন পান না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি দুই বছর ধইরা এই গার্মেন্টে কাজ করি। প্রতি মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা বেতন পাইতাম। দুই মাসের বেতন বাকি। আইজকে মাসের ১৬ তারিখ, এখনো বেতন দেয় না মালিক। কী করতাম? কেমনে চলমু কন?

লায়লার মতো শিউলীর মুখেও ছিল বিষাদের ছায়া। রামপুরায় চার-পাঁচজন একসঙ্গে একটি টিন শেড ঘরে থাকেন শিউলীরা। তারা সবাই মালিবাগের চৌধুরীপাড়ার পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

শিউলী বলেন, গার্মেন্ট বন্ধ ঠিক আছে। আমাগো বেতনটা তো দিয়ে দিব। প্রত্যেক দিন আসি, গেটের দারোয়ান কয়- মালিক নাই, সব কিছু বন্ধ। তাইলে আমরা কী খামু, কেমনে বাসাভাড়া দিমু? কিচ্ছুই ভালা লাগে না। শিউলীর বান্ধবী আলেয়া তাদের ত্রাণ না দেওয়ার অভিযোগ করেন।

ওমর আলী লেনের বাসিন্দা পোশাককর্মী আমেনা এক মেয়ে ও স্বামী নিয়ে থাকেন ছোট্ট একটা ঘরে। তিনি বলেন, আইজকা কত দিন ধইরা গাড়ি বন্ধ, আমার স্বামী অটোরিকশা চালায়। তার কামাই নাই। আমি গার্মেন্টে কাম করি, এখন বন্ধ। গার্মেন্টে বেতনের আশায় তিন দিন গেছি। কইছে ২৬ তারিখের পর জানাইব। তাহলে আমরা কী খামু কন?

বেতন না পেয়ে গত বুধবারও আশুলিয়া, উত্তরা, বাড্ডা, ভাটারা, মিরপুর, ভাষানটেক, শাহআলী, তেজগাঁও, মতিঝিল এলাকায় শত শত শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন।

 

"