সড়ক অবরোধ বিক্ষোভ

বেতন না পেয়ে রাস্তায় পোশাকশ্রমিকরা

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলেও তা উপেক্ষা করে বেতনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পোশাকশ্রমিকরা। মিরপুরের রূপনগরে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রূপনগরের মনির ফ্যাশন গার্মেন্টের শতাধিক শ্রমিক প্রধান সড়ক অবরোধ করে এ বিক্ষোভ শুরু করেন। আন্দোলনকারী শ্রমিকরা জানান, তিন দফায় সময় নিয়েও মার্চের বেতন পরিশোধ করেনি কর্তৃপক্ষ সেজন্য আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিকরা। বেতন পরিশোধের জন্য তৃতীয় দফায় গতকাল বৃহস্পতিবার সময় নেওয়া হলেও কারখানার ফটকে তালা দিয়েছে মালিকপক্ষ।

তাই শতাধিক গার্মেন্ট শ্রমিক সমবেত হয়ে রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে সরকারের নির্দেশনায় জনচলাচলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হলেও এ আন্দোলনে তার বালাই পর্যন্ত নেই। সারিবদ্ধ হয়ে রূপনগর মোড়ের রাস্তা অবরোধ করে রেখেছেন শ্রমিকরা।

আন্দোলনকারীরা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে গত ২৫ মার্চ কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয় বেতন পরিশোধ না করেই। এরপর মালিক মো. মনির হোসেন মার্চের বেতন পরিশোধে তিন দফায় সময় নিলেও এখন পর্যন্ত তা করেননি। করোনার সংকটময় পরিস্থিতিতে না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে স্বল্প আয়ের শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে। ঘরে খাবার না থাকায় শ্রমিকরা বেতন না পেয়ে রাস্তায় নেমেছেন। বেতন না দেওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

গার্মেন্টটির সুপারভাইজার মো. রাজু বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অফিস বন্ধ করে দিয়ে কয়েক দফায় ছুটি বাড়ানো হলেও আমাদের মার্চের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। তৃতীয় দফায় সময় নিলেও সকালে এসে দেখি গার্মেন্টের ফটকে তালা। এরপর আমরা মালিক মনিরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বৃহস্পতিবার বেতন দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

রাজু বলেন, বেতন না পাওয়ায় আমরা না খেয়ে দিন পার করছি। পেটের ক্ষুধায় আর ঘরে থাকতে না পেরে করোনাভাইরাসের ভয় না করে আন্দোলন শুরু করেছি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ডিএমপির মিরপুর বিভাগের পল্লবী জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, বেতন না পেয়ে গার্মেন্ট শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেছেন। আমরা মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার সুরাহা করার চেষ্টা চালাচ্ছি। এদিকে, সড়কে নেমেছেন উত্তরা দক্ষিণখান এলাকার তিনটি পোশাক কারখানার কর্মীরাও। গতকাল বেলা ১১টার দিকে বকেয়া বেতন-ভাতা ও জরুরি ত্রাণ সহায়তার দাবিতে বিমানবন্দর গোলচত্বর এলাকার সড়ক অবরোধ করেন তারা। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের বোঝানো হলেও সড়ক থেকে সরছেন না পোশাকশ্রমিকরা।

রেদওয়ান, সিএনবি ও স্যার ডেনিম কারখানার মালিকপক্ষও পলাতক। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতিকে (বিজিএমইএ) পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছে পুলিশ।

জানা গেছে, করোনার ভয়াল থাবায় বন্ধ পোশাক কারখানা ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অন্যান্য জেলার সঙ্গে কার্যত বিচ্ছিন্ন ঢাকা। হঠাৎ করে কারখানা বন্ধ হওয়ায় অনেক কর্মীই পাননি বেতন-ভাতা। করোনার জরুরি ত্রাণও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ এসব কর্মীর। বাধ্য হয়ে পেটে ক্ষুধা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন তারা।

সৌরভ নামে এক পোশাকশ্রমিক বলেন, ‘করোনার কারণে গার্মেন্ট বন্ধ করে দিচ্ছে। কিন্তু রেদওয়ান গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষ তিন মাসের বেতন দেয়নি। করোনার লকডাউনে বেতন-ভাতা বকেয়া থাকায় কষ্টে যাচ্ছে দিন। যদি করোনার জরুরি ত্রাণও পেতাম তাহলেও অন্তত খাওয়া-দাওয়াটা চলত। সেটাও পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হয়েছে।’

আফরোজা নামে এক নারী পোশাকশ্রমিক বলেন, ‘কারখানা বন্ধ, বেতনও বন্ধ, পেটে দানাপিনাও প্রায় বন্ধ। বাসায় থাকাও দায়। বাসাভাড়ার জন্য মালিকের তাগাদা শুনতে হচ্ছে। এক রকম নিরুপায় আমরা। কিন্তু মালিকপক্ষ এখনো আসেননি, কিছু বলেননি। তাই আমরাও সড়ক ছাড়ছি না।’

উত্তরার দক্ষিণখান জোনের এডিসি হাফিজুর রহমান রিয়েল বলেন, গার্মেন্ট কর্মীদের সামলানোর দায়িত্ব তো পুলিশের না। কিন্তু সেটাই করতে হচ্ছে। আমরা গার্মেন্ট মালিকদের খোঁজ করেও পাচ্ছি না। বিজিএমইএকে জানানো হয়েছে।

দক্ষিণখান থানার ফাঁড়ির ইনচার্জ সবুজ রহমান বলেন, রেদওয়ান গার্মেন্টের বেতন বকেয়া তিন মাসের, সিএনবি ও স্যার ডেনিম গার্মেন্টের মার্চ মাসের বেতন বকেয়া। আমরা মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাদের একজন হোম কোয়ারেন্টাইনে, একজন পলাতক আর আরেকজন অপারগ। বিজিএমইএকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কারো দেখা মেলেনি। অন্যদিকে কমলাপুরে সর্দার ও বিন্নি নামে দুটি গার্মেন্ট কর্মীরাও বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন।

মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তৈয়ব আলী জানান, আমরা সর্দার গার্মেন্টের মালিককে ডেকে বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করেছি। এখন সর্দার গার্মেন্টের কর্মীরা অবরোধ ছেড়ে বেতন নিয়ে চলে যাচ্ছে। বাকি রয়েছে বিন্নি। মালিকপক্ষকে খুঁজে পাচ্ছি না। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ কাজ করছে। বিজিএমইএকে জানানো হয়েছে।

 

"