‘সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে’ মডেল কেরালা

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের অন্যান্য রাজ্যে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে দেখা গেলেও দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে এনে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, কার্যকর পদক্ষেপ আর ব্যাপক নজরদারির মাধ্যমে তারা কোভিড-১৯-কে অনেকটাই কব্জা করতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিস্তৃত স্বাস্থ্যসেবাকে কাজে লাগিয়ে ভারতের এ রাজ্যটি পৃথিবীর অনেক অঞ্চলের কাছেই ‘মডেল’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিবিসি বলছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি কেরালায় করোনাভাইরাসে মৃত্যুর হারও তুলনামূলক কম, আক্রান্তদের বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এসব কিছু সম্ভব হয়েছে কেরালার রাজ্য সরকারের আগাম প্রস্তুতির কারণে। যে প্রস্তুতির কারণে বিদেশফেরত আক্রান্তদের শুরুতেই চিহ্নিত করে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা গেছে। কমানো সম্ভব হয়েছে ‘কমিউনিটি পর্যায়ে’ সংক্রমণের ব্যাপকতা।

আগাম প্রস্তুতি : রাজ্যটির কাসারগড় জেলার চেঙ্গালা গ্রামের এক বাসিন্দা ১২ মার্চ দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইটে কেরালায় নামেন। ৩৩ বছর বয়সি এই বিক্রয়কর্মী সেই সময় ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন, ছিল শুকনা কফও। বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা তাকে তৎক্ষণাৎ ত্রিভান্দ্রাম শহরের একটি হাসপাতালে নিয়ে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করান। এরপরই ওই ব্যক্তিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে, ত্রিভান্দ্রাম থেকে যার দূরত্ব ৫৬৪ কিলোমিটার।

চেঙ্গালা মূলত চারটি আলাদা আলাদা এলাকার সমন্বয়ে গঠিত; এখানে ৬৬ হাজার মানুষের বাস, যাদের বেশির ভাগই ধান ও সবজি চাষি। বিমানবন্দরে নামা ওই বিক্রয়কর্মীটির মতো কেরালার ২০ লাখেরও বেশি মানুষ মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে কর্মরত।

অসুস্থ এ ব্যক্তি চেঙ্গালায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় গ্রামের কাউন্সিল সদস্যরা তার কাছে চলে আসেন, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য বিভাগও তার সব বৃত্তান্ত টুকে নেয়। বিদেশফেরত এ ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্ত্রী ও তিন সন্তানের থেকে আলাদা থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। তাই মেনে মূল বাড়ির বাইরে অন্য একটি ঘরে থাকা শুরু করেন অসুস্থ ওই ব্যক্তি।

ছয় দিন পর তার করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে। হাসপাতালে কয়েক দিনের চিকিৎসায় তিনি ভালো হয়ে উঠেন। বাড়ি ফেরার পরও ‘নিরাপত্তার খাতিরে’ তিনি আইসোলেশনেই থাকছেন। আমরা একদম শুরু থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। বুঝেছিলাম যে ঝড় আসছে। যে কারণে প্রতিরক্ষা ব্যুহ নির্মাণ শুরু করি, বলেছেন ২৩ সদস্যবিশিষ্ট গ্রাম কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট শাহিনা সেলিম। ভারতের শাসনব্যবস্থায় এ গ্রাম কাউন্সিলই হচ্ছে সবচেয়ে নিচের ধাপ।

গতমাস পর্যন্ত চেঙ্গালায় ২২ জনের দেহে কোভিড-১৯ ধরা পড়ে, কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে ৪০০-এর বেশি মানুষকে। আক্রান্তদের মধ্যে ২০ জন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। করোনাভাইরাস শনাক্তে গ্রাম থেকে ৮ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে পরীক্ষা করানো হয়েছে ৩৭০ জনের বেশি মানুষের। পরীক্ষার ফল ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পাওয়া যায়।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ : কেবল পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করাই নয়; স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও কমিউনিটি কর্মীদের নিয়ে গ্রাম কাউন্সিল লঙ্গরখানাও খুলেছে; আইসোলেশনে থাকা মানুষের খাবার এ লঙ্গরখানা থেকেই পাঠানো হয়। কাউন্সিল ওই এলাকার দরিদ্র বাসিন্দা ও আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকসহ ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষকে প্রতিদিন বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দিচ্ছে। অসুস্থ গ্রামবাসীরা নিয়মিত ওষুধ সেবন করছেন কিনা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা সেই খোঁজও রাখছেন।

একটি হেল্পলাইন নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপের দুটি গ্রুপের সাহায্যে গ্রাম কাউন্সিল আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তি ও যাদের বাড়িতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার উপায় নেই তাদের থাকার জায়গা দিতে স্থানীয়দের উৎসাহিত করছে। তাদের ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দুই ডজনের বেশি পরিবার এরই মধ্যে বাড়ির অংশবিশেষ কিংবা কেউ কেউ পুরো বাড়িই ছেড়ে দিয়েছেন। আইসোলেশনে থাকা প্রত্যেককে ২৮ দিনের কোয়ারেন্টাইনেও থাকতে হচ্ছে। এভাবেই ভারতে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে জায়গা করে নিয়েছে কেরালা। নিয়ন্ত্রণে এনেছে সংক্রমণ; আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থতার হারও বেশ ভালো। ভারতে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১২ হাজার ৪৫৬ জনের দেহে কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে আর মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে।

অথচ শুরুর দিকে কেরালাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। দক্ষিণাঞ্চলীয় এ রাজ্যে জানুয়ারিতে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হয়; ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যটি ভারতের অন্যতম হটস্পটে পরিণত হয়। আর এখন অনেক রাজ্যেই কেরালার চেয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি; সংক্রমণও যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কেরালার সীমান্তগুলোও নিñিদ্র নয়; প্রবাসীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিকও রাজ্যটিতে আসা-যাওয়া করে। রাজ্যটির অর্থনীতি এদের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা যখন লাগাম ছাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, কেরালাকে তখন মনে হচ্ছে স্বর্গরাজ্য।

এটা সম্ভব হয়েছে রাজ্যটির প্রস্তুতি ও সকর্তার কারণে। দেশব্যাপী লকডাউন দেওয়ার একদিন আগেই ২৫ মার্চ পিনারাই বিজয়নের সরকার রাজ্যেজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করেছিল।

আক্রান্তদের ওপর নজরদারি করতে ও কারা কারা বিদেশ থেকে এসেছে তার বিস্তৃত ম্যাপ প্রস্তুত করে ফেলেছিল তারা। রাজ্যে আটকে পড়াদের রাখতে এবং যাদের আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য প্রত্যেক জেলায় খোলা হয় সেবাকেন্দ্র।

স্বাস্থ্যকর্মীরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও একা বসবাস করা অসুস্থ ব্যক্তিদের সহায়তা দিচ্ছেন। আক্রান্ত এলাকায় কর্মরতদের বিভিন্ন পরামর্শ দিতে কাউন্সিলরা ৩ লাখ ৪০ হাজারের বেশি টেলিফোনই করেছেন।

এমন নয় যে কেরালা আক্রান্ত শনাক্তে বিপুল পরিমাণ পরীক্ষা করেছে। দেশটিতে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মেনে পরীক্ষা করানোর বাধ্যবাধকতা আছে, যে কারণে রাজ্যটির ডজনেরও বেশি ল্যাব প্রতিদিন ৮০০টির মতো পরীক্ষা করতে পারছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত কেরালারা বিস্তৃত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে গ্রাম কাউন্সিলের মাধ্যমে তৃণমূলের যোগাযোগ সাধনের সংস্কৃতিই তাদের কোভিড-১৯ মোকাবিলায় দক্ষ করে তুলেছে। এর মাধ্যমে প্রত্যেক এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা সক্ষম হয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের নজরদারি ও বিপুল পরিমাণ মানুষের কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

রাজ্যটির কমিউনিস্ট সরকারও প্রতিদিন পরিস্থিতি সম্বন্ধে নানা তথ্য দিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও জনসাধারণকে সচেতন করেছে। মূল কাজটি করেছে কেরালার স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ। গ্রাম কাউন্সিলগুলোও জনগণের সমর্থন নিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা ও পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে। লকডাউনও কাজে দিয়েছে, বলেছেন নিউরোসার্জন বি ইকবাল। তার নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল ভাইরাসের সংক্রমণরোধে রাজ্য সরকারকে পরামর্শ দিয়ে চলেছে।

অর্থনীতিবিদ ড. জ্যাকব জনের মতে, কেরালার ক্ষমতাকাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ, যেমন স্থানীয় সরকার, এলাকাভিত্তিক গ্রাম কাউন্সিল ও মিউনিসিপালগুলোর সতর্কতা রাজ্যটিকে গত তিন বছরে দুটি বড়সড় বন্যা ও নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায়ও সহায়তা করেছিল।

কেরালার তিন স্তরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও সরকারি হাসপাতালগুলোর দক্ষতা তৈরি হয়েছে প্রায় পাঁচ দশক ধরে রাজ্যটির সরকারগুলোর স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে। কেরালা স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করেছে, বলেছেন ড. জন।

ফের সংক্রমণের আশঙ্কা : বিভিন্ন গণমাধ্যম দক্ষিণাঞ্চলীয় এ রাজ্যটি ‘সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের’ প্রশংসা করলেও কর্মকর্তারা সতর্কতায় ঢিল দিচ্ছেন না। ভারতের অন্যান্য অংশের মতো কেরালায় এখনো ব্যাপক সংখ্যক পরীক্ষা হয়নি। অ্যান্টিবডি পরীক্ষার জন্য বিপুল সংখ্যাক পরীক্ষা কিট প্রয়োজন। এ জন্য প্রায় এক লাখ কিট কেনা হলেও তা এখনো রাজ্যে পৌঁছায়নি। এখনো প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছে।

কেরালা খানিকটা ভাগ্যবানও। আমাদের এখানে আক্রান্তদের গড় বয়স ৩৭; তার মধ্যে বেশির ভাগই আবার মধ্যপ্রাচ্যফেরত, বলেছেন ড. ইকবাল। রাজ্যটিতে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা মাত্র ১২ শতাংশ।

এসব দিক দিয়ে সুবিধা পেলেও কেরালার জন্য অন্য দুশ্চিন্তাও আছে। কেরালায় সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের হার ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোর তুলনায় বেশি। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ও যকৃতের নানা রোগে ভোগা রোগীর সংখ্যাও কম নয়।

সাধারণত বর্ষাকালেই রাজ্যটিতে ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রমণের হার বেড়ে যায়। এ কারণে জুনের আগেই করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াইয়ে জেতার দিকে নজর দিতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। এটা জটিল হয়ে উঠতে পারে। বর্ষায় যেন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ না দেখা যায় তা নিশ্চিত করতে হবে আমাদের; এ কারণে বর্ষাকালে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে, বলেছেন এক চিকিৎসক।

সন্দেহভাজনদের আইসোলেশনে রাখা এবং সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের মতো সতর্কতামূলক ব্যবস্থার আর্থিক ক্ষতিও গুনতে হচ্ছে কেরালাকে। রাজ্যটির কমিউনিস্ট সরকারকে সে জন্য অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ও সংক্রমণ থামলে কীভাবে রাজ্যকে সচল করতে হবে তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেরালা নিজেদের পরিকল্পনায় অটুট থেকেই সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। সংক্রমণের সংখ্যা কমিয়ে এনেছে, আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার খুবই কম, বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর তুলনায় এর কম জনসংখ্যা ও শিক্ষার হারও সহায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা কোয়ার্টার ফাইনাল জিতেছি। সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাক্কা ছাড়াই যদি বিধিনিষেধ শিথিল করা যায়, সেটি হবে সেমি ফাইনাল। আর ফাইনালে আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব। কেবল তখনই আমরা নিজেদের বিজয়ী বলতে পারব, বলেন ডা. শ্রীজিত এন কুমার।

 

"